
ডেস্ক রিপোর্ট: মসজিদ, মন্দির, বৌদ্ধবিহার ও গির্জায় প্রার্থনা পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মাসিক সম্মানি দিতে নীতিমালা করেছে সরকার। এ অনুযায়ী সম্মানি পেতে ভুয়া তথ্য বা জাল সনদ ব্যবহার করলে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। একই সঙ্গে জালিয়াতির মাধ্যমে নেওয়া অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দিতে হবে।
বিএনপি সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম ও অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিদের জন্য এ মাসিক সম্মানি ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পরীক্ষামূলকভাবে চালুর পর চলতি অর্থবছরে তা আরও বিস্তৃত হয়। এখন নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে কর্মসূচিটি একটি আইনগত কাঠামো পেলো।
মিথ্যা তথ্য বা জালিয়াতির শাস্তি
নীতিমালায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি ভুয়া তথ্য বা জাল সনদ ব্যবহার করে সম্মানি নিলে তার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮ ও ৪৭১ ধারায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এসব ধারার মধ্যে সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
দণ্ডবিধির ৪২০ ধারা অনুযায়ী প্রতারণা করে সম্পত্তি হস্তান্তরে প্ররোচিত করার অপরাধে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হতে পারে। ৪৬৭ ধারায় গুরুত্বপূর্ণ দলিল বা মূল্যবান জামানত জাল করার অপরাধে যাবজ্জীবন অথবা ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান আছে। ৪৬৮ ধারায় প্রতারণার উদ্দেশ্যে দলিল জাল করলে সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হতে পারে। আর ৪৭১ ধারায় জাল দলিলকে আসল হিসেবে ব্যবহার করলে সংশ্লিষ্ট জালিয়াতির জন্য নির্ধারিত একই শাস্তি পেতে হবে।
অর্থাৎ, জালিয়াতির ধরন অনুযায়ী এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। একই সঙ্গে জালিয়াতির মাধ্যমে নেওয়া সম্মানীর অর্থও ফেরত দিতে হবে। আত্মসাৎ করা অর্থ ‘সরকারি পাওনা আদায় আইন, ১৯১৩ (পিডিআর অ্যাক্ট)’ অনুযায়ী সরকারি কোষাগারে ফেরত নেওয়া হবে বলেও নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চলতি বছরের ১৪ মার্চ রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন
কার্যক্রম বাস্তবায়নে সেল গঠন
সম্মানি কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব বা যুগ্ম সচিবের নেতৃত্বে একটি সেল গঠন করা হবে জানিয়ে নীতিমালায় বলা হয়, প্রথম পর্যায়ে দেশের মসজিদ, মন্দির, বৌদ্ধবিহার ও গির্জায় কর্মরত ব্যক্তিদের ডাটাবেজ তৈরি করা হবে। এ তথ্য আইবাস প্লাস প্লাসের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে এবং নির্বাচিত প্রতিটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি ইউনিক আইডি সংরক্ষণ করা হবে।
সম্মানি পাওয়ার জন্য আবেদনকারীকে বাংলাদেশের স্থায়ী নাগরিক হতে হবে। তাকে উপজেলা কমিটি বা সিটি করপোরেশনের জোন কমিটি নির্বাচিত কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এবং নিয়োগপত্র থাকতে হবে।
কে কত টাকা করে পাবেন
মসজিদের ইমাম মাসে পাঁচ হাজার টাকা, মুয়াজ্জিন তিন হাজার টাকা ও খাদেম দুই হাজার টাকা সম্মানি পাবেন। অর্থাৎ একটি নির্বাচিত মসজিদে মোট ১০ হাজার টাকা মাসিক সম্মানি দেওয়া হবে।
মন্দিরের পুরোহিত পাঁচ হাজার ও সেবাইত তিন হাজার টাকা, বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ পাঁচ হাজার ও উপাধ্যক্ষ তিন হাজার টাকা এবং গির্জার পুরোহিত পাঁচ হাজার ও সহকারী পুরোহিত তিন হাজার টাকা মাসিক সম্মানি পাবেন।
একই পদে একাধিক ব্যক্তি থাকলে সংশ্লিষ্ট কমিটি তাদের মধ্যে একজনকে সম্মানি পাওয়ার জন্য নির্বাচন করবে বলে নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে।
মসজিদের সম্মানি প্রাপকদের ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায় এক হাজার টাকা করে উৎসব ভাতা দেওয়া হবে। অন্যদিকে মন্দির, বৌদ্ধবিহার ও গির্জার সম্মানী প্রাপকরা যথাক্রমে দুর্গাপূজা, বুদ্ধ পূর্ণিমা ও বড়দিনে এককালীন দুই হাজার টাকা করে উৎসব ভাতা পাবেন।
মসজিদের সম্মানি প্রাপকদের ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায় এক হাজার টাকা করে উৎসব ভাতা দেওয়া হবে। অন্যদিকে মন্দির, বৌদ্ধবিহার ও গির্জার সম্মানী প্রাপকরা যথাক্রমে দুর্গাপূজা, বুদ্ধ পূর্ণিমা ও বড়দিনে এককালীন দুই হাজার টাকা করে উৎসব ভাতা পাবেন।
নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক অবস্থা বা বাজেট পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার যে কোনো সময় সম্মানির হার পুনর্নির্ধারণ করতে পারবে।
সম্মানির অর্থ আইবাস প্লাস প্লাসের মাধ্যমে জিটুপি বা ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার পদ্ধতিতে সরাসরি প্রাপকের ব্যাংক হিসাব বা নিজ জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে খোলা ব্যক্তিগত মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবে পাঠানো হবে। পরবর্তী মাসের ১০ তারিখের মধ্যে অর্থ পরিশোধের কথা বলা হয়েছে।
সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং উপজেলা ও পৌরসভা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সম্মানি দেওয়ার কার্যক্রম তদারকি করবেন বলে নীতিমালায় জানানো হয়।
যেসব কারণে সম্মানি বাতিল হবে
নীতিমালায় সম্মানি বাতিলের কয়েকটি কারণও নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- নৈতিক স্খলন বা ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত হওয়া, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান থেকে বরখাস্ত বা পদত্যাগ করা, তথ্যের ক্ষেত্রে প্রতারণা প্রমাণিত হওয়া, রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকা ও মৃত্যু।
সেই সঙ্গে আছে- সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে কর্মরত না থাকা সত্ত্বেও সম্মানি প্রাপক হিসেবে নির্বাচিত হওয়া, সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন সংস্থা বা প্রকল্প থেকে বেতন-ভাতা পাওয়া, অসামাজিক বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকা এবং কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হওয়া।
সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত বা ট্রাস্ট পরিচালিত এবং স্থায়ী অনুদানপ্রাপ্ত ও কর্মরত ব্যক্তিদের বেতন দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো বাদ থাকবে/ছবি: ইনস্টাগ্রাম
আবেদনে যেসব কাগজ লাগবে
সম্মানি পাওয়ার জন্য নির্ধারিত ফরমে আবেদন করতে হবে। আবেদনের সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি, দুই কপি রঙিন পাসপোর্ট আকারের ছবি, ব্যাংক হিসাব বা নিজের নামে খোলা মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবের তথ্য এবং নিয়োগপত্রের কপি দিতে হবে।
যেসব প্রতিষ্ঠান অগ্রাধিকার পাবে
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্বাচনের ক্ষেত্রে সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, রাষ্ট্রায়ত্ত বা ট্রাস্ট পরিচালিত প্রতিষ্ঠান এবং স্থায়ী অনুদানপ্রাপ্ত ও কর্মরত ব্যক্তিদের বেতন দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো বাদ থাকবে। নিম্ন আয়ের ও দুর্গম এবং দুর্যোগপ্রবণ এলাকার প্রতিষ্ঠানগুলো অগ্রাধিকার পাবে।
নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, কোনো সম্মানি প্রার্থী বা প্রাপক সিদ্ধান্তে সংক্ষুব্ধ হলে ৩০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পুনর্বিবেচনার আবেদন করতে পারবেন। কমিটিকে সর্বোচ্চ ১৫ দিনের মধ্যে সেই আবেদন নিষ্পত্তি করতে হবে।
সরকারি চাকরির দাবি করা যাবে না
এই টাকা কোনো সরকারি বেতন বা ভাতা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সম্মানি হিসেবে বিবেচিত হবে। ফলে সম্মানি পাওয়া ব্যক্তিরা এ কারণে সরকারি চাকরিতে স্থায়ী নিয়োগের দাবি করতে পারবেন না। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ ও অপসারণের ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছেই থাকবে।
এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন ও তদারকিতে জেলা পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন কমিটি, স্টিয়ারিং কমিটি ও জাতীয় কমিটি কাজ করবে বলে নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়।
ইমাম, মুয়াজ্জিন, সেবায়েত ও যাজকদের সম্মানি ভাতা দেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা এতদিন এই নীতিমালাই অনুসরণ করেছি। নীতিমালাটি আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত না হলেও এর ভিত্তিতেই ভাতা দেওয়া হয়েছে। এখন সেটিই আনুষ্ঠানিকভাবে একটি কাঠামোর মধ্যে এসেছে।- ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এ এইচ এম কামরুজ্জামান
কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী
সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পাইলট প্রকল্পের আওতায় দেশের ছয় হাজার ১৭টি নির্বাচিত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মোট ১৩ হাজার ৯৪৯ জনকে প্রথমবারের মতো সম্মানি দেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকার গঠনের একমাস না পেরোতেই চলতি বছরের ১৪ মার্চ রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। সেই সঙ্গে এই মাসিক সম্মানি ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণব্যবস্থা চালু করার লক্ষ্য একটি সেল গঠন করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদা) মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ এ সেলের সভাপতি।
গত ১০ আগস্ট সেলের এক সভায় নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে রাষ্ট্রীয় সম্মানি ভাতার আওতায় আসছে আরও ৮৬ হাজার ৭০৯টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ৮২ হাজার ৬৫৬টি মসজিদ, তিন হাজারটি মন্দির, ৭৫২টি বৌদ্ধবিহার ও ৩০১টি গির্জা রয়েছে।
এসব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দুই লাখ ৫৬ হাজার ৭৪ জন ইমাম, মুয়াজ্জিন, সেবায়েত ও যাজক রাষ্ট্রীয় এ সুবিধার আওতায় আসবেন। গত ১৬ আগস্ট কিশোরগঞ্জে দ্বিতীয় পর্যায়ের এ কর্মসূচি উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।
নীতিমালা নিয়ে কর্তৃপক্ষ যা বলছে
এ বিষয়ে কথা হলে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এ এইচ এম কামরুজ্জামান বলেন, ‘ইমাম, মুয়াজ্জিন, সেবায়েত ও যাজকদের সম্মানি ভাতা দেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা এতদিন এই নীতিমালাই অনুসরণ করেছি। নীতিমালাটি আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত না হলেও এর ভিত্তিতেই ভাতা দেওয়া হয়েছে। এখন সেটিই আনুষ্ঠানিকভাবে একটি কাঠামোর মধ্যে এসেছে।’
ভুয়া তথ্য দিয়ে ভাতা নেওয়া বন্ধে নীতিমালায় কঠোর শাস্তির বিধান রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আশা করা যায় নীতিমালা বাস্তবায়ন হলে কর্মসূচির অনিয়ম দূর হবে।’
মন্তব্য করুন