
জি. এম. মিন্টু, কেশবপুর (যশোর): যশোরের কেশবপুরে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে অসংখ্য মৎস্য ঘের। ঘেরের প্রয়োজনে প্রতিনিয়ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে যে হারে মৎস্য ঘের করা হচ্ছে, তাতে এ অঞ্চলের জলজ পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট হওয়ার আশংকা দেখা দিয়েছে।
সরজমিনে উপজেলার আলতাপোল, পাঁজিয়া, সুফলাকাটি, গৌরিঘোনা, মঙ্গলকোট, বিদ্যানন্দকাটি ও কেশবপুর সদর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ঘের মালিকরা আগে ভাগেই ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে ঘের ভরে নিচ্ছেন। এ কারণে বর্ষা মৌসুমে এবারও বন্যার আশংকা করছেন এলাকাবাসী। গত বছর প্রায় ৬ মাস জলাবদ্ধতা ছিল।
বিভিন্ন সূত্রে জানাগেছে, বর্তমানে কেশবপুরে ৪ হাজার ৬শ ৫৮টি ছোট-বড় মাছের ঘের ও ৬ হাজার ৬ শত ৪০টি পুকুর রয়েছে। তবে এসব ঘের নির্মাণের সময় যথাযথ পরিবেশগত মূল্যায়ন ও অনুমোদন নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে পানি সংকট ও কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় উপজেলায় অনেক স্থানে টিউবওয়েল ও সেচ পাম্পে পানি উঠছে না।
মৎস্য কর্মকর্তা সন্দীপ বিশ্বাস বলেন, মৎস্য খাত আমাদের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে যেভাবে পরিকল্পনাহীনভাবে ঘের গড়ে তোলা হচ্ছে, তা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। মৎস্য চাষে পরিবেশগত ও নীতিগত দিকগুলো মানা অত্যন্ত জরুরি।
২৭ বিল বাঁচাও আন্দোলন কমিটির সভাপতি বলেন, নদী-নালা ও প্রাকৃতিক খালের ওপর বাঁধ দেওয়া এবং অপরিকল্পিত ভাবে বিভিন্ন স্থানে ঘের নির্মাণের ফলে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। এ কারণে গত বছর ১৪৪টি গ্রামের মধ্যে ১০৪টি গ্রাম সম্পূর্ণ পানির নিচে তলিয়ে যায়। তিনি আরও বলেন, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হলে অবিলম্বে এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
গত বছর অতিবৃষ্টি ও নদ-নদীর উপচে পড়া পানিতে কেশবপুরে জলাবদ্ধতা দেখা দেয় এবং এতে প্রায় ১২০ কোটি টাকার ক্ষতি হয় বলে উপজেলা প্রশাসনের এক জরিপে বলা হয়েছে। অনেক কৃষক তাদের বীজ বপন করতে পারেননি, ফলে খাদ্য উৎপাদনেও প্রভাব পড়েছে।
২০১৯ সালে প্রণীত মোর্শক (মৎস্য ও খামার ব্যবস্থাপনা) নীতিমালা অনুযায়ী, ঘের তৈরির জন্য নির্দিষ্ট নিয়মাবলী অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। তবে স্থানীয়ভাবে সেই নীতিমালার প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রেই এ নীতিমালাকে পাশ কাটিয়ে চলছে অবৈধ ঘের নির্মাণ।
স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশবাদী সংগঠন এবং কৃষকদের অভিন্ন মত, কেশবপুরে টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে মৎস্য খাতকে পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে এবং ভূগর্ভস্থ পানির যথেচ্ছ ব্যবহার রোধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
ইউপি চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন আলা বলেন, আমরা চাই উন্নয়ন হোক, কিন্তু তা হতে হবে পরিকল্পিত ও টেকসই। ঘের ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের নীতিমালা মেনে চলা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
গত বছর বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত বৃষ্টি ও নদ-নদীর উপচে পড়া পানিতে তার ইউনিয়নের ১১টি গ্রাম পানিতে তলিয়ে যায়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেকসোনা খাতুন জানান, ভূগর্ভ থেকে মাছের ঘের মালিকরা ঘেরে পানি উত্তোলন করলে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের অনুমতি ছাড়া গভীর নলকূপ বসানো হয়েছে। এ বিষয়ে আমরা আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছি। ইতোমধ্যে কিছু মামলাও আদালতে চলমান রয়েছে।
মন্তব্য করুন