বাংলাদেশ, বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬
৫ ভাদ্র ১৪৩৩ | সময়:
The Editors
১১ আগস্ট ২০২৫, ১:৩৪ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

কেশবপুরে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা, রাস্তায় আশ্রয় নিয়েছে বহু পরিবার

জি.এম. মিন্টু, কেশবপুর (যশোর): টানা বর্ষণ আর নদ-নদীর পানি উপচে যশোরের কেশবপুরে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। কেশবপুর পৌরসভা ও আশপাশের গ্রামগুলোর ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে গেছে। হরিহর নদের পানি বিপৎসীমার দুই ফুট ওপরে প্রবাহিত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হচ্ছে। এক মাসের বেশি সময় ধরে পানিবন্দী হয়ে থাকা বহু পরিবার শেষমেশ টোঙঘর বেঁধে উঁচু সড়কের পাশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

রাস্তার ধারে নতুন গ্রাম
কেশবপুর পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যকুল আমতলা এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, যশোর-চুকনগর সড়কের ধারে বাঁশ ও ত্রিপল দিয়ে অস্থায়ী ঘর বানিয়ে বসবাস করছে বহু পরিবার। ঘরের ভেতর পানি ঢুুকে পড়ায় এদের অধিকাংশই বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। মধ্যকুল সরদারপাড়ার হামিদা খাতুন (৪০) জানালেন, এক মাস হলো পানি উঠেছে। গত সপ্তাহে টানা বৃষ্টিতে ঘরে হাঁটুসমান পানি ঢুকে যায়। ছোট বাচ্চাদের নিয়ে কাদামাটির ভেতর থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ছিল। তাই বাধ্য হয়ে রাস্তায় উঠে এসেছি। তার পাশেই ভ্যানচালক জিন্নাত আলী পরিবারের জন্য ছোট্ট একটি টোঙঘর তুলছেন। তিনি বললেন, আমরা গরিব মানুষ। ভিটে ছেড়ে কোথায় যাব? তাই রাস্তার ধারে এই অস্থায়ী ঘরই এখন ভরসা।

ঘরবাড়ি ডুবে, যাতায়াত অচল
কেশবপুর পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের সাহাপাড়া খ্রিস্টান মিশনের পাশের সড়কেও পানি উঠে গেছে। যাতায়াতের একমাত্র রাস্তাটি তলিয়ে যাওয়ায় অনেকে বাঁশের সাঁকো বানিয়ে চলাচল করছেন। বয়স্ক ও অসুস্থদের জন্য এই অবস্থা মারাত্মক কষ্টের হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেশবপুর সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রভাষক আলাউদ্দীন জানান, তাঁর ইউনিয়নের ১১টি গ্রামের অধিকাংশই পানিতে তলিয়ে গেছে। জলাবদ্ধ পরিবার এখন ৪০০ ছাড়িয়েছে, বলেন তিনি। আলতাপোল এলাকার ১১টি পরিবার সড়কের পাশের একটি উঁচু ঘরে আশ্রায় নিয়েছে।

জলাবদ্ধতার মূল কারণ
২৭ বিল বাঁচাও আন্দোলন কমিটির আহ্বায়ক বাবর আলী গোলদারের মতে, নদ-নদী পলিতে ভরাট হয়ে যাওয়া এবং অপরিকল্পিত মাছের ঘেরের কারণে পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হচ্ছে। কেশবপুরের বহু গ্রাম বছরের পর বছর জলাবদ্ধ। নদ-নদী খনন ও টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট (টিআরএম) চালু না করলে এই সংকট আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে।

পরিসংখ্যান বলছে ভয়াবহতার কথা
কেশবপুর পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল ফজল মো. এনামুল হক জানান, পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডেই জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। জলাবদ্ধ পরিবারের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিন হাজার ২০০। অতিবৃষ্টি ও নদ-নদীর পানি ঢুকে এলাকা প্লাবিত হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী সুমন শিকদার জানান, হরিহর নদে বর্তমানে পানি রয়েছে ১০ দশমিক ৭৬ ফুট, যেখানে স্বাভাবিক থাকার কথা ৮ দশমিক ৬৯ ফুট। টানা বৃষ্টিতে পানি বেড়েছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে হরিহর, আপারভদ্রা ও হরিনদীসহ ১০টি সংযোগ খাল পুনঃখননের প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। আগামী জানুয়ারিতে কাজ শুরুর সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি আরও জানান, হরিহর নদ থেকে আপারভদ্রা পর্যন্ত ৩ দশমিক ৭ কিলোমিটার এবং আরও ৪ কিলোমিটার খননের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব কাজ শেষ হলে পানি দ্রুত সরে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।

মানবিক বিপর্যয় ও জীবনের লড়াই
পানিবন্দী মানুষের অনেকেই পেশা হারিয়েছেন। কেউ ধান রোপণ করতে পারছেন না, কেউবা মাছের ঘেরের ক্ষতিতে ঋণের বোঝা বইছেন। পানিতে ডুবে গেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও, ফলে শিশুদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে।
রাস্তায় টোঙঘরে থাকা পরিবারগুলো ন্যূনতম স্বাস্থ্যসুবিধা থেকেও বঞ্চিত। ত্রিপল বা প্লাস্টিকের ঘরের ভেতর গরমে হাঁসফাঁস করছে শিশুরা, বৃষ্টির রাতে ভিজে যাচ্ছে বিছানা। খাবারের অভাব তো আছেই, সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পানিবাহিত রোগ।

মানুষ সাহায্য নয়, সমাধান চান
এলাকার সাবেক পৌর কাউন্সিলর আয়ুব খান মনে করেন, মানুষ শুধু ত্রাণ চায় না তারা জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান চায়। বছরের পর বছর ধরে এ সমস্যায় কৃষি ও মৎস্য খাতের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে, বলেন তিনি। এই ক্ষতি পুষিয়ে ওঠা অনেকের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
স্থানীয় উন্নয়নকর্মী ও পরিবেশবিদরা বলছেন, জলাবদ্ধতার সমস্যা সমাধানে স্বল্পমেয়াদি ত্রাণের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামোগত পদক্ষেপ দরকার। এর মধ্যে রয়েছে নদ-নদী ও খাল খনন, টিআরএম কার্যক্রম চালু, অপরিকল্পিত মাছের ঘের উচ্ছেদ, প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ পুনঃস্থাপন, উঁচু আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ।

 

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সাতক্ষীরায় বস্তিবাসীদের আবাসন সংকট সমাধানে সংলাপ, ৮ দফা সুপারিশ

কালিগঞ্জে নিজের ঘেরে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৎস্য চাষীর মৃত্যু

কেশবপুরে বসতবাড়িতে ঢুকে পড়লো গ্যাসবাহী ট্যাংকার, অল্পের জন্য রক্ষা পেল ঘুমন্ত পরিবার

দুই পেসারের ৫ উইকেট: বল কেটে ভাগ করে নিলেন রবিনসন-টাং

কলকাতায় নিহত কালিগঞ্জের দু’জনই ভারতে গিয়েছিলেন চিকিৎসার জন্য

কলকাতায় অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের মধ্যে দুজন কালিগঞ্জের

খোলপেটুয়া নদীর দখল দূষণ ও নাব্যতা পরিদর্শনে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান

গ্রামীণ ব্যাংকের চন্দনপুর-কলারোয়া শাখার চার কর্মকর্তার ৩০ বছরের সাজা

সাংবাদিক লিটুর স্ত্রীর সুস্থতা কামনা

কালিগঞ্জে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার ১

১০

শ্যামনগরে উপকূলীয় সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও অভিযোজন পরিকল্পনা বিষয়ক কর্মশালা

১১

দেবহাটায় শিশুশ্রম প্রতিরোধে শেয়ারিং মিটিং

১২

বিদায়ী বক্তব্যে কাঁদলেন মির্জা ফখরুল, চাইলেন দলীয় এমপিদের ভোট

১৩

কালিগঞ্জ প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যক্ষ তমিজউদ্দীনের মৃত্যুবার্ষিকী পালন

১৪

ভাইয়ের হাসপাতালে ভর্তির সংবাদ শুনে বড় বোনের মৃত্যু

১৫

জনপ্রিয় টিকটকারকে গুলি করে হত্যা

১৬

নলতায় ক্যাশলেস লেনদেনে পূবালী ব্যাংকের প্রচারাভিযান

১৭

ঈদে মিলাদুন্নবীর কর্মসূচি ঘোষণা: জেলা-উপজেলা ও সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যে আয়োজন

১৮

৪শ বছরের প্রাচীন সোনাবাড়িয়া মঠ রক্ষায় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের উদ্যোগ

১৯

জেলা প্রশাসক কাপ ফুটবল টুর্নামেন্টে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার দাপুটে জয়

২০
error: Content is protected !!