

সুলতান শাহাজান, শ্যামনগর: শীতের শুরুতেই সাতক্ষীরার শ্যামনগরে শিশুদের ঠাণ্ডাজনিত রোগের প্রকোপ দেখা দিয়েছে। এতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চাপ বেড়েছে নিউমোনিয়া, জ্বর, সর্দিসহ শ্বাসতন্ত্রজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত শিশু রোগীদের। সক্ষমতার কয়েকগুণ বেশি রোগীকে চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শিশু ওয়ার্ডে শয্যা সংকটের পাশাপাশি মেঝেতে বিছানা পাতার মতো জায়গাও নেই। হাসপাতালের বহির্বিভাগ ভবনের একতলা থেকে তিন তলা পর্যন্ত সিঁড়িতে রেখেই চলছে অসুস্থ শিশুদের চিকিৎসা।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, শিশু ওয়ার্ডে নির্ধারিত শয্যা মাত্র ৬টি। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সেখানে ভর্তি ছিল ৩২জন শিশু। চাপ সামাল দিতে হাসপাতালের বহির্বিভাগ ভবনের মেঝেতে, করিডরে ও সিঁড়িতে রাখতে হচ্ছে এসব শিশুকে। ফলে অসুস্থ সন্তানদের নিয়ে বিপাকে পড়েছেন অভিভাবকেরা।
শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের পার্শ্বেমারি গ্রামের নাসিমা খাতুনের ৭ মাস বয়সী মেয়ে লামিয়া দুদিন ধরে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় গত সোমবার সকালে তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসেন নাসিমা। চিকিৎসক শিশুটিকে হাসপাতালে রেখে চিকিৎসার পরামর্শ দিয়েছেন। শিশু ওয়ার্ডে জায়গা না হওয়ায় হাসপাতাল ভবনের দোতলার সিঁড়িতে বিছানা (পাটি) বিছিয়ে তাকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
ওই সিঁড়িতেই কয়েক ফুট দূরত্বে আরেকটি বিছানায় চিকিৎসা চলছে এক মাস সাত দিন বয়সী ইনাইয়া সুলতানার।
তার মা বাদঘাটা গ্রামের ময়না খাতুন জানান, তিন দিন ধরে তাঁর সন্তান নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। এক সপ্তাহ আগে সন্ধ্যায় হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা তাকে শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি করেছেন। তবে জায়গার অভাবে হাসপাতালের সিঁড়িতে বিছানা পেতে দিয়েছেন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের লোকজন।
শুধু এই দুই মাই নন, আরও অন্তত ২৫-৩০ জন অভিভাবক তাদের ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন। তারা বলছেন, শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শিশুদের রেখে চিকিৎসা দেওয়ার মতো জায়গা নেই। শয্যা সংকটের পাশাপাশি মেঝেতে বিছানা পাতার মতো জায়গাও নেই। ফলে অসুস্থ সন্তানদের নিয়ে তারা বিপাকে পড়েছেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পুরোনো ভবন ব্যবহার অনুপযোগী হওয়ায় তা পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। আরেকটি দোতলা ভবনের ওপরে তৃতীয় ও চতুর্থ তলা নির্মাণ হলেও তা চালু হয়নি। এ দোতলা ভবনের নিচতলায় রয়েছে বহির্বিভাগ, দ্বিতীয় তলায় প্রসূতি বিভাগ। এ বিভাগের বারান্দায় বোর্ড ও কাচ দিয়ে শিশু ওয়ার্ড বানানো হয়েছে। সেখানে শয্যা মাত্র ৬টি। সেখানে স্থান সংকুলান না হওয়ায় শিশুদের ভবনটির একতলা থেকে তিন তলা পর্যন্ত সিঁড়িতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এমনকি টয়লেটের সামনের ফাঁকা জায়গায় বিছানা পেতে শিশুদের চিকিৎসা চলছে। এ ছাড়া প্রশাসনিক ভবনে থাকা ৪টি কেবিনের দুটিকে পুরুষ এবং দুটিকে নারী ওয়ার্ডে পরিণত করা হয়েছে।
সাড়ে ৪ লাখ জনসংখ্যার শ্যামনগরের এ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স মূলত ৫০ শয্যার। তৃতীয় ও চতুর্থ তলা চালু হলে তা ১০০ শয্যায় উন্নীত হতো। হাসপাতালে বতর্মানে দিনে ৮০ থেকে ১০০ জন রোগী ভর্তি থাকেন।
উপজেলার হরিনগরের ছোট ভেটখালী গ্রামের খাদিজাতুল কোবরা জানান, তার ৬ মাস বয়সী সন্তান ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার পর গত রোববার সকালে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। অবস্থা বেশি খারাপ হওয়ায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে বলেন কর্তব্যরত চিকিৎসক। কিন্তু শিশুদের ওয়ার্ডে জায়গা মেলেনি। পরে প্রসূতি বিভাগ এবং শিশু ওয়ার্ডের মাঝের একটি খালি স্থানে জায়গা করে দেওয়া হয়েছে।
উপজেলার হেঞ্চি গ্রামের জোছনা রানী গায়েন বলেন, তাঁর তিন মাস বয়সী শিশু রুদ্র বৃহস্পতিবার থেকে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। এক সপ্তাহ ধরে হাসপাতালে ভর্তি থাকলেও শিশু ওয়ার্ডে জায়গা মেলেনি। তাকে একই ওয়ার্ডের একমাত্র টয়লেটটির পাশে একটি বিছানা করে জায়গা দেওয়া হয়েছে। অর্ধশতাধিক রোগীর স্বজনদের অনবরত ওই টয়লেটে যাতায়াতের কারণে শিশুটি আরও অসুস্থ হয়ে পড়ছে বলে দাবি জোছনা রানীর। সরকারি হাসপাতাল হওয়া সত্ত্বেও চিকিৎসা নেওয়ার মতো জায়গা না থাকায় তিনি হতাশা প্রকাশ করেন।
এ অবস্থায় হাসপাতালজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে এক ধরনের সংকট। চিকিৎসক, নার্স ও সহায়ক কর্মীদের ওপর চাপ বেড়েছে কয়েক গুণ। সেবার পাশাপাশি ওয়ার্ডে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়ে উঠেছে চ্যালেঞ্জ। অতিরিক্ত চাপ মোকাবিলায় অস্থায়ী বেড বৃদ্ধি, অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ এবং পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন রোগীর স্বজনরা।
হাসপাতালের শিশু চিকিৎসক ডা. নাজমুল হুদা জানান, ঋতু পরিবর্তনের এ সময়টিতে শিশুদের বিশেষ যত্ন নেওয়া জরুরি। বাড়িতে পর্যাপ্ত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, ঠাণ্ডা-ধুলাবালি এড়িয়ে চলা এবং ঠাণ্ডা-জ্বরের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
স্থান সংকুলান না হওয়ার কথা স্বীকার করে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. জিয়াউর রহমান বলেন, প্রায় চার বছর ধরে এমন অবস্থা চলছে। চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের জায়গার সংকটে ভুগতে হচ্ছে। পুরোনো ভবন ইতোমধ্যে পরিত্যক্ত হয়েছে। বিপরীতে নতুন ভবনের কাজ সম্পন্ন হলেও বরাদ্দ শেষ হওয়ায় স্যানিটেশন, লাইট স্থাপন এবং আরও কিছু কাজ বন্ধ প্রায় দুই বছর ধরে। বাধ্য হয়ে স্বল্প জায়গায় প্রতিদিন শতাধিক রোগীর চিকিৎসা দিতে ব্যাপক অসুবিধায় পড়তে হচ্ছে।
মন্তব্য করুন