
নেপালে পাহাড়ের যে পানি নেমে এসেছে, তার ঢেউ হয়তো সরাসরি সাতক্ষীরার নদীতে এসে পড়বে না। কিন্তু সেই বিপর্যয়ের বার্তা আমাদের উপকূল পর্যন্ত পৌঁছেছে। কারণ প্রকৃতি এখন আর আগের নিয়মে চলছে না। কখনো পাহাড়ে অস্বাভাবিক বৃষ্টি, কখনো হিমবাহ ধস, কখনো আকস্মিক বন্যা, আবার কখনো সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাস আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে একটি কঠিন সত্য। জলবায়ু পরিবর্তনের পৃথিবীতে দুর্যোগের চরিত্র বদলে যাচ্ছে।
গত ২৬ আগস্ট নেপালের ভোতে কোশি নদী অববাহিকায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে। এখনো সেখানে উদ্ধার অভিযান চলছে। এই বিপর্যয় শুধু নেপালের জন্য একটি মানবিক ট্র্যাজেডি নয়, দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর জন্যও একটি সতর্ক সংকেত।
সাতক্ষীরার বাস্তবতা অবশ্য ভিন্ন। এখানে হিমবাহ নেই, পাহাড় নেই। আছে সুন্দরবন, অসংখ্য নদী, খাল, বেড়িবাঁধ, লবণাক্ততা, জোয়ারভাটা এবং সমুদ্রের খুব কাছাকাছি বসবাস করা লাখো মানুষ। ফলে সাতক্ষীরার দুর্যোগের ভাষা আলাদা। কিন্তু ঝুঁকির জায়গাটি একই। প্রকৃতি যখন স্বাভাবিক ছন্দ হারায়, তখন দুর্যোগের পুরোনো হিসাব আর কাজে আসে না।সাতক্ষীরার জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই বন্যা হবে কি না, সেটি নয়। প্রশ্ন হলো বন্যা, জলোচ্ছ্বাস কিংবা বাঁধ ভাঙনের ঘটনা ঘটলে আমরা কত দ্রুত প্রস্তুত হতে পারব।
আমাদের উপকূলীয় জীবনে বেড়িবাঁধ শুধু মাটির একটি কাঠামো নয়। এটি মানুষের ঘর, ফসল, মাছের ঘের, গবাদিপশু, জীবিকা এবং ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি জীবনরেখা। কোথাও বাঁধ দুর্বল হয়ে পড়লে সেটি শুধু একটি এলাকার সমস্যা নয়, মুহূর্তের মধ্যে একটি বড় মানবিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
নেপালের বিপর্যয় আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় শুধু উদ্ধারকারী দল প্রস্তুত রাখলেই হয় না, আগে থেকে বিপদের সংকেত বুঝতে হয়। নদীর পানি, বৃষ্টিপাত, বাঁধের অবস্থা, জোয়ারের উচ্চতা, নদীর গতিপথ এবং আবহাওয়ার পরিবর্তনকে একই ব্যবস্থার মধ্যে এনে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করতে হয়। নেপালের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, কার্যকর পূর্ব সতর্কতা ও দ্রুত যোগাযোগ জীবন বাঁচাতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
সাতক্ষীরায় এখন সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন একটি সমন্বিত উপকূলীয় আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা। আবহাওয়া অধিদপ্তরের বার্তা ইউনিয়ন পর্যায়ে পৌঁছালেই দায়িত্ব শেষ হওয়া উচিত নয়। সেই বার্তা পৌঁছাতে হবে গ্রামের মানুষ, জেলে, কৃষক, ঘের মালিক, পর্যটন ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর কাছে, সহজ ভাষায়।
প্রতিটি ইউনিয়নে চিহ্নিত করতে হবে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র। কোথায় মানুষ যাবে, কোন রাস্তা দিয়ে যাবে, কার দায়িত্বে যাবে, শিশু ও বয়স্কদের কীভাবে সরানো হবে, গবাদিপশু কোথায় থাকবে, খাবার পানি কোথা থেকে আসবে এসব প্রশ্নের উত্তর দুর্যোগের আগে প্রস্তুত থাকতে হবে।
বিশেষ করে সাতক্ষীরার নদী ও বাঁধ ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ বাঁধ ও নদীপথে পানি ও মাটির অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য আধুনিক সেন্সর স্থাপন করা যেতে পারে। নদীর পানি দ্রুত বাড়লে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষের কাছে স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা সম্ভব।
সাতক্ষীরার জন্য আরেকটি বড় ঢাল সুন্দরবন। সুন্দরবন শুধু পর্যটনের সম্পদ নয়, এটি উপকূলের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা। তাই সুন্দরবন রক্ষা মানে সাতক্ষীরার ভবিষ্যৎ রক্ষা। বন ধ্বংস, নদী দখল, খাল ভরাট এবং অপরিকল্পিত উন্নয়ন বন্ধ না করলে প্রাকৃতিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা আরও দুর্বল হবে।
আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাতেও একটি মানসিক পরিবর্তন প্রয়োজন। দুর্যোগ আসার পর ত্রাণ বিতরণ নয়, দুর্যোগ আসার আগেই ঝুঁকি কমানোকে প্রধান কাজ হিসেবে নিতে হবে। বাঁধ ভাঙার পর মেরামত করার চেয়ে বাঁধ দুর্বল হওয়ার আগেই মেরামত করা সস্তা এবং কার্যকর। মানুষ ডুবে যাওয়ার পর উদ্ধার করার চেয়ে আগে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া অনেক বেশি মানবিক।
নেপালের ভয়াবহতা আমাদের সামনে একটি আয়না ধরেছে। সেই আয়নায় শুধু নেপালের ধ্বংস দেখলে চলবে না, নিজেদের দুর্বলতাও দেখতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত ভবিষ্যতের কোনো গল্প নয়। এটি এখনকার বাস্তবতা।
সাতক্ষীরার জন্য তাই এখনই সময় একটি উপকূলীয় দুর্যোগ প্রস্তুতি মহাপরিকল্পনা তৈরির। সেখানে থাকতে হবে বাঁধের ডিজিটাল মানচিত্র, ঝুঁকিপূর্ণ গ্রামের তালিকা, নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র, দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার পথ, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দল, জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা এবং দ্রুত যোগাযোগের একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক। কারণ দুর্যোগকে আমরা হয়তো থামাতে পারব না। কিন্তু দুর্যোগ যেন বিপর্যয়ে পরিণত না হয়, সেটি অনেকটাই আমাদের হাতে। নেপালের পাহাড় থেকে তাই সাতক্ষীরার উপকূলে একটি বার্তা এসেছে।বার্তাটি খুব পরিষ্কার। প্রকৃতি যখন সতর্ক করে, তখন অপেক্ষা করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। প্রস্তুত হওয়াই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ।
লেখক : মো: মামুন হাসান,ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান,ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ,সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট
মন্তব্য করুন