বাংলাদেশ, সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬
১৮ কার্তিক ১৪৩৩ | সময়:
The Editors
২৫ মার্চ ২০২৬, ১২:৪২ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

গণহত্যার বিভীষিকাময় সেই কালরাত আজ

ডেস্ক রিপোর্ট: গভীর বেদনার স্মৃতিবিজড়িত ২৫ মার্চ আজ। ১৯৭১ সালের এই দিনের শেষে যে রাত নেমে এসেছিল, ইতিহাসে তা এক বর্বর গণহত্যার সাক্ষী হয়ে আছে। এই রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামের এক অভিযানে ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ঘুমন্ত বাঙালির ওপর। উদ্দেশ্য ছিল বাঙালির মুক্তির সংগ্রামকে স্তব্ধ করে দেওয়া।

রাতটি ছিল কৃষ্ণপক্ষের ঘন অন্ধকার। ঢাকা সেনানিবাস থেকে গোপনে শ্বাপদের মতো বেরিয়ে আসে ট্যাংক আর সাঁজোয়া গাড়ির সারি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল আর ইকবাল হলে (বর্তমানে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) সেনারা মেতে ওঠে নির্বিচার গণহত্যায়। গোলা ফেলা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্রাবাসে। পাশের বস্তিবাসীরাও রক্ষা পায়নি গণহত্যা থেকে। আক্রমণ ও হত্যাকাণ্ড চলে রোকেয়া হলেও। যত্রতত্র ধরিয়ে দেওয়া হয় আগুন। হামলা চালানো হয় পুরান ঢাকার হিন্দু-অধ্যুষিত এলাকাতেও। একই সময়ে পাকিস্তানি সেনারা হামলা চালায় রাজারবাগ পুলিশ লাইনস ও পিলখানায় ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের সদর দপ্তরে। বাঙালি পুলিশ ও ইপিআর (পরে বিডিআর, বর্তমানে বিজিবি) সদস্যরা বীরত্বের সঙ্গে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন। তবে ট্যাংক ও ভারী অস্ত্রের মুখে তাঁদের পিছু হটতে হয়।

এক রাতে এত বিপুল গণহত্যার নজির ইতিহাসে বিরল। জাতির ইতিহাসে বেদনাবিধুর এই রাত চিহ্নিত হয়ে আছে ‘কালরাত’ হিসেবে।

এ অভিযানের তাৎক্ষণিক ও মূল সামরিক লক্ষ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানরত ছয়টি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর) এবং পুলিশ বাহিনীকে সম্পূর্ণভাবে নিরস্ত্র করা। তা ছাড়া এই পরিকল্পনায় আওয়ামী লীগের সব শীর্ষ নেতাকে গ্রেপ্তার করা, অত্যন্ত কঠোরভাবে সামরিক আইন জারি করা, সব বিমানবন্দর ও চট্টগ্রাম নৌঘাঁটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া এবং রেডিও ও টেলিভিশন স্টেশনগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনার সুস্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া ছিল।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণহত্যার মাত্রা যে কী ভয়াবহ ছিল, তা বিদেশি সাংবাদিক ও কূটনীতিকদের বয়ানেও জানা যায়। আর্চার কে ব্লাড তখন ঢাকায় মার্কিন কনসাল জেনারেল। তিনি ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ পররাষ্ট্র দপ্তরে পাঠানো বার্তায় লিখেছেন, পাকিস্তানি বাহিনী একটি ভূখণ্ডকে বিভীষিকাময় ও সন্ত্রস্ত জনপদে পরিণত করেছে। সেনাবাহিনীর আক্রমণের মুখে অসংখ্য মানুষ গ্রামে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর এই অভিযানকে তিনি অভিহিত করেছিলেন ‘সিলেকটিভ জেনোসাইড’ বা বাছাই করা গণহত্যা বলে।

গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফ–এর সাংবাদিক সাইমন ড্রিং। ২৫ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনী সব বিদেশি সাংবাদিককে তৎকালীন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল থেকে তুলে নিয়ে করাচিগামী বিমানে পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু সাইমন ড্রিং ও অ্যাসোসিয়েট প্রেসের মাইকেল লরেন্ট পালিয়ে থেকে যান। এরপর ২৭ মার্চ দুই ঘণ্টার জন্য কারফিউ প্রত্যাহার করা হলে তাঁরা শহরে বেরিয়ে পড়েন।

২৭ মার্চ কারফিউ তুলে নেওয়ার পর ঢাকায় ঘুরে ঘুরে ‘ট্যাংকস ক্রাশেস রিভোল্ট ইন পাকিস্তান’ নামে সাইমন ড্রিংয়ের একটি প্রতিবেদন ৩০ মার্চ প্রকাশ করে টেলিগ্রাফ। প্রতিবেদনের উপশিরোনাম ছিল ‘সেভেন থাউজেন্ড স্লটারড’। অর্থাৎ ওই রাতে শুধু ঢাকাতেই মারা গেছেন ৭ হাজার। নানা এলাকার প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ থেকে বোঝা যায়, প্রকৃত সংখ্যা সম্ভবত আরও অনেক বেশি।

২০১২ সালের ২৩ মার্চ ঢাকায় এক সাক্ষাৎকারে সায়মন ড্রিং বলেন, ২৭ মার্চ ঘুরতে ঘুরতে তিনি ইকবাল হলেও ঢুকেছিলেন। তিনি সেখানে নিজে ৩০টি লাশ গুনে দেখেছেন। ড্রিং জানান, সেদিন মর্টারের শেল আর মেশিনগানের অবিরাম গুলিতে শুধু ইকবাল হলেই নিহত হয়েছিলেন ২০০ নিরপরাধ ছাত্র। হামলার দুই দিন পরও দেখা যাচ্ছিল পুড়ে যাওয়া রুমের মধ্যে পড়ে থাকা লাশ আর লাশ। পাকিস্তানি বাহিনী আরও বহু লাশ সরিয়ে ফেলেছিল আগেই।

এই ভয়াবহ সামরিক অভিযান এবং সংঘটিত গণহত্যার পেছনে মূলত পাকিস্তানের সামরিক জান্তার শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন কর্মকর্তা সরাসরি যুক্ত ছিলেন। এঁদের মধ্যে সর্বাধিনায়ক হিসেবে প্রেসিডেন্ট জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান এবং সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ জেনারেল আবদুল হামিদ খানের প্রত্যক্ষ নির্দেশ ও সম্মতি ছিল। এই অভিযানের মাঠপর্যায়ের প্রধান নেতৃত্ব দেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান, যিনি তাঁর ঊর্ধ্বতনদের নির্দেশ পালনে ছিলেন অন্ধ ও অবিচল। পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা, মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী এবং ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব আরবাব। এ ছাড়া কট্টরপন্থী সামরিক কর্মকর্তা যেমন জেনারেল উমর, জেনারেল মিঠা ও জেনারেল আকবর এই অভিযানের প্রবল সমর্থক ছিলেন।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলের কমান্ডার লে. জেনারেল এ কে নিয়াজি তাঁর দ্য বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান বইয়ে লিখেছেন, ‘অভিযানটি ছিল নিষ্ঠুরতার চরম নিদর্শন।’

তবে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর এই চরম নৃশংসতা ও বর্বরতা বাঙালিদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে এবং স্বাধীনভাবে বাঁচার আকাঙ্ক্ষাকে একটুও অবদমিত করতে পারেনি; বরং এই অভিযানের ফলে পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থানরত বাঙালি সামরিক কর্মকর্তা, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের সদস্যরা ব্যাপকভাবে বিদ্রোহ করেন এবং তাঁরা দ্রুত প্রতিরোধ গড়ে তুলে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখসমরে অবতীর্ণ হন।

 

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

গার্মেন্টস শ্রমিকদের নতুন মজুরি নির্ধারণে বোর্ড গঠন, গেজেট প্রকাশ

১

খুলনায় তাঁতী দলের নেতাকে কুপিয়ে হত্যা

২

উপকূলের সংকট সমাধানে সর্বদলীয় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের আহ্বান

৩

সাতক্ষীরা জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দিলেন ৪৪ প্রার্থী

৪

বাংলা কিউআরে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি লেনদেন শুরু

৫

৭ নভেম্বর জাতীয় পতাকা উত্তোলনের নির্দেশনা

৬

সুন্দরবনে দস্যুতা দমনের দাবিতে আন্দোলনে স্বামী-সন্তান, ঘরে নারীদের বুকজোড়া ভয়

৭

‎জলবায়ু পরিবর্তন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: প্রতিশ্রুতির আলোয় শঙ্কার ছায়া || ‎তারিক ইসলাম

৮

কালিগঞ্জে জাতীয় যুব দিবস উদ্‌যাপন

৯

উদ্যোক্তা হতে ২০ লাখ টাকা দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক, ৫৬ জেলায় আবেদন শুরু

১০

তালায় কিস্তি না দিয়ে এনজিও কর্মীকে মারধর

১১

এপিএল ড্রাফটে দুই ক্যাটাগরিতে ১০ বাংলাদেশি

১২

কালিগঞ্জে বাস টার্মিনাল পুনর্বহালের দাবিতে মানববন্ধন

১৩

ভারতের মণিপুরে ভয়াবহ সংঘাত, নিহত ৫

১৪

আশাশুনি থানাকে দালাল ও হয়রানিমুক্ত করার প্রত্যয় ওসি শাহিদুর রহমানের

১৫

২০০ কোটি আত্মসাতের মামলায় আদালতের সমন নোরা ফাতেহিকে

১৬

সুন্দরবন সেবা কল্যাণ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা ক্যাম্প

১৭

সেরা ফুটবলার নির্বাচনে দুই মুসলিম খেলোয়াড়কে ভোট দিয়েছেন মেসি

১৮

পাইকগাছায় নানা আয়োজনে জাতীয় যুব দিবস পালিত

১৯

ডেঙ্গুতে আরও ৮ জনের মৃত্যু

২০