বাংলাদেশ, সোমবার, ০৩ আগস্ট ২০২৬
১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ | সময়:
The Editors
২ আগস্ট ২০২৬, ১০:৩৪ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

মান্দারবাড়িয়া; জেগে ওঠার অপেক্ষায় এক নীরব সৈকত || মো. মামুন হাসান

সব সম্পদের জন্ম মানুষের হাতে হয় না। কিছু সম্পদ প্রকৃতি হাজার বছরের ধৈর্যে গড়ে তোলে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, প্রকৃতি যত উদারই হোক, দূরদর্শী রাষ্ট্র না হলে সেই সম্পদ একদিন নীরবে বিস্মৃতির অন্ধকারে হারিয়ে যায়। আমরা প্রায়ই বলি, বাংলাদেশের পর্যটনের প্রাণ কক্সবাজার। কথাটি ভুল নয়। কিন্তু একটি প্রশ্ন কখনো করি না, একটি দেশের কি মাত্র একটি স্বপ্ন থাকে?

যে রাষ্ট্র একটি সম্পদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, সে রাষ্ট্র ধীরে ধীরে নিজের সম্ভাবনার পরিধি সংকুচিত করে। পর্যটনের ক্ষেত্রেও একই সত্য প্রযোজ্য। কক্সবাজার বাংলাদেশের গর্ব, কিন্তু বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শুধুমাত্র কক্সবাজার হতে পারে না। আমাদের এমন একটি গন্তব্য দরকার, যা বিশ্বের পর্যটন মানচিত্রে নতুন ভাষায় বাংলাদেশের পরিচয় লিখবে।

সেই ভাষার নাম হতে পারে মান্দারবাড়িয়া সমুদ্র সৈকত।পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের পাশেই প্রায় আট কিলোমিটার দীর্ঘ এই সমুদ্র সৈকত আজও দেশের অধিকাংশ মানুষের কাছে অজানা। কোনো কোনো ভূখণ্ড শুধু ভৌগোলিক অবস্থান নয়; একটি জাতির দূরদর্শিতার পরীক্ষাও। মান্দারবাড়িয়া তেমনই একটি ভূখণ্ড। পৃথিবীর মানচিত্রে এমন অনেক দেশ আছে, যারা সম্পদ সৃষ্টি করেছে। আবার কিছু দেশ আছে, যারা সম্পদ আবিষ্কার করেছে। কিন্তু ইতিহাসে সবচেয়ে সফল রাষ্ট্রগুলো সেই রাষ্ট্র, যারা নিজেদের সম্পদের অর্থ নতুন করে লিখতে পেরেছে। বাংলাদেশ এখন সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।

আমরা যদি মান্দারবাড়িয়াকে একটি সমুদ্র সৈকত হিসেবে দেখি, তাহলে আমরা একটি সৈকতই পাব। কিন্তু যদি এটিকে জলবায়ু কূটনীতি, ব্লু ইকোনমি, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, উপকূলীয় উদ্ভাবন এবং টেকসই উন্নয়নের মিলনভূমি হিসেবে দেখি, তাহলে আমরা একটি নতুন অর্থনীতি পাব।

রাষ্ট্রের উন্নয়ন কখনো রাস্তা দিয়ে শুরু হয় না; শুরু হয় কল্পনা দিয়ে। আজ মান্দারবাড়িয়াকে ঘিরেও আমাদের সেই সাহসী কল্পনার প্রয়োজন। কারণ পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন এবং বঙ্গোপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত এই উপকূল শুধু একটি পর্যটন গন্তব্য নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক ল্যান্ডস্কেপ, যার অর্থনৈতিক, পরিবেশগত এবং ভূকৌশলগত গুরুত্ব এখনো পূর্ণভাবে অনুধাবন করা হয়নি। অথচ এর দীর্ঘ নির্জন সৈকত, ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র এবং অনন্য প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ভবিষ্যৎ উন্নয়নের শক্তিশালী ভিত্তি হতে পারে।

কিন্তু বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণে একটি মৌলিক ভুল দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। আমরা পর্যটনকে অবকাঠামো দিয়ে শুরু করি, অথচ বিশ্বের সফল দেশগুলো পর্যটন শুরু করে পরিচয় দিয়ে। দুবাই কখনো শুধু মরুভূমি বিক্রি করেনি; তারা বিক্রি করেছে অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্প। মালদ্বীপ শুধু সমুদ্র বিক্রি করেনি; তারা বিক্রি করেছে নিঃসঙ্গতার বিলাসিতা। আইসল্যান্ড শুধু আগ্নেয়গিরি বিক্রি করেনি; তারা বিক্রি করেছে প্রকৃতির বিস্ময়।

বাংলাদেশ মান্দারবাড়িয়া দিয়ে কী বিক্রি করবে? আমার উত্তর একটাই পৃথিবীর একমাত্র ম্যানগ্রোভ ও সমুদ্রের সহাবস্থানের অভিজ্ঞতা। এখানেই জন্ম নিতে পারে বিশ্বের প্রথম ম্যানগ্রোভ বিচ রিজার্ভ।

ভাবুন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের গবেষক, পরিবেশবিদ, শিক্ষার্থী এবং ভ্রমণকারীরা প্রতি বছর মান্দারবাড়িয়ায় আসছেন শুধু ঘুরতে নয়, শিখতে। এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে গ্লোবাল ম্যানগ্রোভ অ্যান্ড ব্লু ইকোনমি ইনস্টিটিউট। জলবায়ু পরিবর্তন, ব্লু কার্বন, উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য এবং টেকসই পর্যটন নিয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মাঠ পর্যায়ে গবেষণা করছেন। স্থানীয় তরুণরা প্রশিক্ষিত প্রকৃতি ব্যাখ্যাকারী হিসেবে কাজ করছেন। জেলে, নৌকার মাঝি, কারুশিল্পী এবং নারীরা পর্যটনের অংশীদার হয়ে উঠেছেন। উন্নয়নের অর্থ তখন আর কেবল ভবন নির্মাণ নয়; মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি।

আরও এক ধাপ এগিয়ে ভাবা যায়। মান্দারবাড়িয়াকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে পারে বাংলাদেশ কোস্টাল ইনোভেশন ভ্যালি। যেখানে সমুদ্র, জলবায়ু, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, উপকূলীয় কৃষি এবং পর্যটন নিয়ে স্টার্টআপ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাজ করবে। পৃথিবীর বহু দেশ এখন প্রকৃতিনির্ভর উদ্ভাবনে বিনিয়োগ করছে। বাংলাদেশ কেন সেই নেতৃত্ব নেবে না? আমাদের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো, আমরা প্রকৃতিকে ব্যবহার করতে চাই; কিন্তু প্রকৃতির সঙ্গে অংশীদার হতে চাই না। মান্দারবাড়িয়া সেই দর্শন বদলে দিতে পারে। এখানে কোনো বিশাল কংক্রিটের শহর গড়ার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন এমন একটি উন্নয়ন মডেল, যেখানে প্রতিটি স্থাপনা হবে পরিবেশবান্ধব, প্রতিটি নৌযান হবে নবায়নযোগ্য জ্বালানিচালিত, প্রতিটি পর্যটক একটি গাছের রক্ষণাবেক্ষণে অবদান রাখবেন এবং প্রতিটি গ্রামের মানুষ পর্যটন আয়ের অংশীদার হবেন। এই মডেল সফল হলে বিশ্ব এটিকে মান্দারবাড়িয়া মডেল নামে চিনবে।

আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের পরবর্তী বড় জাতীয় প্রকল্প কোনো কংক্রিটের শহর হওয়া উচিত নয়; হওয়া উচিত মান্দারবাড়িয়া ন্যাশনাল নেচার অ্যান্ড ইনোভেশন রিজিয়ন। এটি হবে এমন একটি অঞ্চল, যেখানে উন্নয়নের প্রথম শর্ত হবে প্রকৃতি সংরক্ষণ। দ্বিতীয় শর্ত হবে স্থানীয় মানুষের মালিকানা। তৃতীয় শর্ত হবে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি।

এখানে একটি ম্যানগ্রোভ ক্লাইমেট অবজারভেটরি প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে, যেখানে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, কার্বন সঞ্চয়, জীববৈচিত্র্য এবং জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা হবে। একই অঞ্চলে গড়ে উঠতে পারে ব্লু ইকোনমি ইনোভেশন ল্যাব, যেখানে তরুণ উদ্যোক্তারা উপকূলীয় প্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব নৌপরিবহন, সামুদ্রিক পর্যটন এবং জলবায়ু অভিযোজনভিত্তিক নতুন উদ্যোগ তৈরি করবেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এখানে ফিল্ড ল্যাব হিসেবে কাজ করবেন। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান যৌথ গবেষণা করবে। স্থানীয় জেলে, মৌয়াল, বনজীবী এবং নারীরা শুধু পর্যটনের কর্মী হবেন না; তাঁরা হবেন জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সহশিক্ষক।

এটাই হবে বাংলাদেশের নতুন উন্নয়ন দর্শন যেখানে প্রকৃতিকে শোষণ করা হবে না, প্রকৃতির সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তোলা হবে। মান্দারবাড়িয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি তার নীরবতা। সেই নীরবতাকে কংক্রিটের শব্দে ভরিয়ে তোলা উন্নয়ন নয়; বরং সেই নীরবতাকে বিশ্বের কাছে মূল্যবান অভিজ্ঞতায় রূপান্তর করাই হবে প্রকৃত রাষ্ট্রবুদ্ধি।

একটি রাষ্ট্রের প্রজ্ঞা বোঝা যায়, সে তার সবচেয়ে দুর্বল মানুষকে কীভাবে দেখে। আর একটি রাষ্ট্রের দূরদর্শিতা বোঝা যায়, সে তার সবচেয়ে নীরব ভূখণ্ডকে কীভাবে পড়ে।মান্দারবাড়িয়া আজও নীরব। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি সেই নীরবতার ভাষা পড়তে শিখবে?

ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন একটি সিদ্ধান্ত শুধু একটি অঞ্চলকে বদলে দেয় না; বদলে দেয় একটি জাতির ভবিষ্যৎ। আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশের জন্য সেই মুহূর্তটির নাম হতে পারে মান্দারবাড়িয়া।

লেখক: ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

শুভেচ্ছা জানাতে দ্রুততম মানব জাকিরের বাড়িতে কালিগঞ্জের ইউএনও

শাকবাড়িয়া নদীর তীর থেকে ৭০ কেজি হরিণের মাংস উদ্ধার

কালিগঞ্জে দেশসেরা অ্যাথলেট জাকিরকে সংবর্ধনা

সুন্দরবনে কাঁকড়া শিকারে ৩ জেলে কারাগারে

পাইকগাছায় বিজ্ঞানী স্যার পিসি রায়ের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী উদযাপিত

কয়রার বড়বাড়ি ও কপোতাক্ষ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নতুন সভাপতি আবুল কালাম আজাদ

সাতক্ষীরায় ক্লাইমেট জাস্টিস ফোরাম গঠন: ঝুমুর আহবায়ক, সুমন সদস্য সচিব

ডিএনসিসি প্রশাসক শফিকুল ও এমপি জাহাঙ্গীরের ওপর হামলা

৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আয়কর রিটার্ন দাখিলে ৫% পর্যন্ত কর প্রণোদনা

এলপি গ্যাসের দাম বাড়লো, সন্ধ্যা থেকেই কার্যকর

১০

দুবাইয়ে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন বেনজীর

১১

সাতক্ষীরায় ১০ দিনব্যাপী বৃক্ষ মেলা শুরু

১২

মান্দারবাড়িয়া; জেগে ওঠার অপেক্ষায় এক নীরব সৈকত || মো. মামুন হাসান

১৩

সারা দেশে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি পুলিশের

১৪

শর্ত সাপেক্ষে ইরানে হামলা বাতিল ঘোষণা ট্রাম্পের

১৫

রাষ্ট্রপতি প্রার্থী চূড়ান্ত করার দায়িত্ব পেলেন তারেক রহমান

১৬

ঢাকাস্থ দেবহাটা উপজেলা সমিতির নেতৃত্বে খাইরুল-হিরু-সুমন

১৭

সাতক্ষীরায় জলাবদ্ধতা নিরসনে নদী-খাল পুনরুদ্ধারের দাবি

১৮

টানা পঞ্চমবারের মতো সাফের সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন

১৯

প্রাথমিকে ১৪ হাজার ৩৮৪ শিক্ষকের যোগদান শুরু অক্টোবরে

২০
error: Content is protected !!