
ডেস্ক রিপোর্ট: শিরোনাম দেখে হয়তো কিছুটা অবাক হতে পারেন। তবে অবাক হওয়ার মতো বাড়তি কিছু নেই এখানে! বাঘের থাবায় আসলেই ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়েছে ক্যাঙ্গারু! ডারউইনে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়াকেই ৯ উইকেটে হারিয়ে সিরিজে লিড (১-০) নিয়েছে বাংলাদেশ।
অস্ট্রেলিয়া সফরে টেস্ট সিরিজে লিড নেবে টাইগাররা, টেস্ট শুরুর দিন সকাল পর্যন্ত কতজন এমনটা ভেবেছিলেন? বাংলাদেশ যে অজিদের হারাবে টেস্টে, সেটাও আবার তাদের মাটিতে, এটা নেহাতই আকাশ কুসুম কল্পনা ছিল। সেই কল্পনাকে যেন বাস্তবে রূপ দিলেন লাল-সবুজের ক্রিকেটাররা।
টেস্ট খেলতে দেশ ছাড়ার আগে দলের কোনো ক্রিকেটার কিংবা টিম ম্যানেজমেন্টের কোনো সদস্য সিরিজ জেতার লক্ষ্যের কথা সরাসরি বলেননি। ভালো খেলাটাই তখন লক্ষ্য ছিল তাদের। এবার শুধু ভালো খেলা নয়, জয় নিয়েই মাঠ ছেড়েছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল।
এমন জয়ের দিনে উচ্ছ্বসিত বাংলাদেশের সাবেক প্রধান কোচ এবং অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ক্রিকেটার স্টুয়ার্ট ল। বাংলাদেশের ঐতিহাসিক এই জয়ের পর ঢাকা পোস্টের সঙ্গে আলাপ করেছেন বর্তমান নেপালের প্রধান কোচ। শুরুতে ল বলছিলেন, ‘অসাধারণ একটি টেস্ট জয়, চমৎকার।’ পরে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বর্তমান বাংলাদেশ কোচ ফিল সিমন্সকেও কৃতিত্ব দিয়েছেন, ‘আমি যাদের সাথে খুব কাছ থেকে কাজ করেছি, এমন কিছু খেলোয়াড়কে এই বিশাল অর্জনে অবদান রাখতে এবং এত সুন্দর পারফর্ম করতে দেখে দারুণ লাগছে।’
‘এমন জয়ের একটা বড় কৃতিত্ব ফিল সিমন্সেরও প্রাপ্য। তিনি দুর্দান্ত কিছু পরিকল্পনা সাজিয়েছিলেন এবং খেলোয়াড়রা সেগুলো গ্রহণ করে মাঠে তার সফল বাস্তবায়ন করেছে। যে কারণে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এমন বড় জয়। ক্রিকেটের জন্য এটা সত্যিই চমৎকার একটা ব্যাপার।’-যোগ করেন তিনি।
এটা কি বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে সেরা জয়? এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিবেদককে পাল্টা প্রশ্ন করলেন, ‘আপনার মতামত কী?’ পরে অবশ্য নিজেই জবাব দেন, ‘এক নম্বর তালিকায় থাকা দলের জন্য এমন একটা দলের কাছে হেরে যাওয়া। যাদের জেতার কোনো সম্ভাবনাই ধরা হয়নি—অস্ট্রেলিয়ার জন্য এটি একটি বিশাল পরাজয়। বাংলাদেশের জন্য তো অবশ্যই সেরা জয়। বাংলাদেশ তাদের এই প্রচেষ্টার জন্য অত্যন্ত গর্বিত হওয়া উচিত এবং নিশ্চিতভাবেই এটি তাদের টেস্ট ইতিহাসের সেরা ফলাফল।’
অস্টেলিয়ার সাবেক ক্রিকেটার হয়েও বাংলাদেশের এই জয়ে দারুণ খুশি ল, ‘একেবারে সত্যি। বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশের সাথে আমার দারুণ পথচলা ছিল এবং এই খেলোয়াড়দের এভাবে পারফর্ম করতে দেখে আমার মুখে হাসি চলে আসে। যাই হোক তবে এমনটা হওয়াই উচিত।’
নিজ দেশ অস্ট্রেলিয়ার এমন হার নিয়ে তিনি বলেন, ‘তারা (অস্ট্রেলিয়া) এই হারে নিশ্চিতভাবেই বেশ বিব্রত বোধ করবে।’ লম্বা সময় পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে খেলার সুযোগ পেয়েছে বাংলাদেশ। দেশটিতে দ্বিপাক্ষিত সিরিজ খেলার খুব একটা সুযোগ পায় না টাইগাররা। ল মনে করেন সামনে সেই সুযোগ আরো বাড়বে, ‘আশা করি তারা এখন থেকে ভাববে। তবে তারা বাংলাদেশকে কোনো রকম অসম্মান করে না।’
বাংলাদেশের জয়ে বেশ খুশি আরেক সাবেক কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহেও। ঢাকা পোস্টকে হাথুরু বলেন, ‘দলের প্রত্যেক সদস্যেকে অভিনন্দন। এটি অনেক বড় অর্জন। তাদের এমন অর্জনে সত্যিই গর্বিত আমি, আশা করি এটা ধরে রাখবে তারা।’
শুরু থেকেই আমার মনে হয়েছে বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে ভালো খেলেছে এবং প্রথম দিন থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে ছিল।
অ্যালান ডোনাল্ড
অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের এই জয়ে সবচেয়ে বেশি অবদান পেসারদের। হাসান-তাসকিনদের আজকের পারফরমার হয়ে ওঠার পেছনের অন্যতম কারিগর অ্যালান ডোনাল্ড। তার সময়েই টাইগার পেস আক্রমণের সবচেয়ে বেশি উন্নতি হয়েছে। অজিদের বিপক্ষে সাবেক শিষ্যদের এমন পারফরম্যান্সে তাই খুশি ডোনাল্ড।
ঢাকা পোস্টকে ডোনাল্ড বলেন, ‘সত্যি বলতে, আজ সকালে আমি খুব একটা ভালো বোধ করছিলাম না। সময়ের ব্যবধানও অনেক বেশি, তাই পুরো ম্যাচ না দেখে শুধু কিছু হাইলাইটস, উইকেট এসবই দেখেছি। তবে শুরু থেকেই আমার মনে হয়েছে বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে ভালো খেলেছে এবং প্রথম দিন থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে ছিল।’
‘বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণের পারফরম্যান্স ছিল দুর্দান্ত। হাসান মাহমুদ এই মুহূর্তে দারুণ ফর্মে আছে এবং অসাধারণ বোলিং করছে। কেন্টের হয়ে খেলার মাধ্যমে যে আত্মবিশ্বাস সে পেয়েছে, তা এখানে তাকে নিঃসন্দেহে অনেক সাহায্য করেছে। প্রথম ইনিংসে এমন একটি উইকেটে সে দারুণ বোলিং করেছে, যেখানে বোলারদের জন্য কিছুটা সহায়তা ছিল।’-যোগ করেন তিনি।
পরে দলের বাকি পেসারদের নিয়ে ডোনাল্ড বলেন, ‘আবারও বলছি, পুরো বোলিং আক্রমণই নিজেদের দায়িত্ব দারুণভাবে পালন করেছে—হাসান, তাসকিন, এবাদত এবং স্পিনাররা সবাই। সব মিলিয়ে এটি ছিল দুর্দান্ত একটি দলীয় পারফরম্যান্স। এরপর অবশ্যই সেই ছেলেটির কথা বলতে হয়—এই মুহূর্তে তার নামটা মনে পড়ছে না (তানজিদ তামিম)—যে সেঞ্চুরি করেছে। সে অসাধারণ ব্যাটিং করেছে।’
‘আমার মনে হয়েছে, বাংলাদেশ বিপক্ষ স্পিনারদের খুব ভালোভাবে সামলেছে। খুব একটা বল ঘুরেনি মনে হয়েছে, আর তারা অস্ট্রেলিয়ার স্পিনারদের ওপর দারুণভাবে চড়াও হয়েছে। তাই এটি ছিল সত্যিই চমৎকার একটি দলীয় পারফরম্যান্স। তবে শেষ পর্যন্ত ২০টি উইকেট নিতে হয়, আর সেই জায়গায় বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণ আবারও নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে।’-যোগ করেন তিনি।
নিজের হাতে গড়ে তোলা টাইগার পেসারদের সঙ্গে এখনও নিয়মিত যোগাযোগ হয় ডোনাল্ডের, ‘এটা দেখতে এবং উপভোগ করতে সত্যিই দারুণ লাগছে। পাঁচ-ছয় বছর আগে যখন প্রথম এই ছেলেদের সঙ্গে দেখা হয়েছিল, তখন তারা খেলাটাকে নিজেদের মতো করে গ্রহণ করতে কিছুটা দ্বিধায় থাকত। এখন সেই জায়গা থেকে তারা অনেক দূর এগিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশ যেভাবে খেলেছে, তাতে তাদের মানসিকতাটা পরিষ্কার—‘আমরা এক পা-ও পিঁছিয়ে যাব না।’ পুরো ম্যাচে বাংলাদেশ ঠিক সেটাই করেছে। তারা ছিল অসাধারণ, এবং খেলার প্রতিটি বিভাগেই ছিল অত্যন্ত নিখুঁত ও কার্যকর।’
‘সব মিলিয়ে এটা ছিল অসাধারণ। আমি দলের প্রত্যেক খেলোয়াড়ের জন্য ভীষণ গর্বিত। এখনো আমি বোলিংয়ের যে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ আছে সেখানে তাদের মেসেজ পাঠাই। তাই তাদের এমন একটি মুহূর্তে সফল হতে দেখা আমার জন্য সত্যিই খুব গর্বের বিষয়।’-যোগ করেন তিনি।
এই টেস্টের আগে অজিদের মাটিতে বাংলাদেশি ব্যাটারদের মধ্যে সর্বোচ্চ রানের ইনিংস ছিল হান্নান সরকারের। তবে সেটিকে এবার টপকে গেলেন তানজিদ তামিম। এক সময় তামিমকে কোচিং করানো এই কোচ শিষ্যের এমন অর্জনে খুশি। ঢাকা পোস্টকে হান্নান বলেন, ‘এটা বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য অনেক বড় একটা পাওয়া। আমাদের শুধু ন্যাশনাল টিমের পাওয়া না, এটা পুরো ক্রিকেট সিস্টেমকে একটা আলাদা বুস্টআপ করে, উৎসাহ দেয়।’
‘অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে গিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে হারানো পুরোটা স্বপ্ন! সেই স্বপ্ন পূরণ করার পরে স্বাভাবিকভাবে আমাদের পুরো ক্রিকেট জগতের সাথে যারা রিলেটেড সবাই আনন্দের পাশাপাশি একটা দায়িত্ববোধ বেড়ে যায় যে আমাদেরও ভালো করতে হবে। এটা হলো অনুপ্রেরণা। এই জয়টা ক্রিকেটে একটা আলাদা অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।’-যোগ করেন তিনি।
বাংলাদেশ টেস্ট ক্রিকেটে গত কয়েক বছর ধরেই ধারাবাহিকভাবে ভালো খেলছে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এভাবে জিতবে, শুরুর আগে কি এরকম ভেবেছিলেন হান্নান? উত্তরে তিনি বলেন, ‘এরকম ভাবিনি আসলে। আমি নিশ্চিত যে যারা ক্রিকেট ফলো করে তারাও হয়তো এভাবে চিন্তা করেনি। এটা আমাদের ক্রিকেট জগতের সবার জন্যই একটা স্বপ্নের মতো বা বিস্ময়ের ব্যাপার ছিল যে আমাদের টিম এভাবে উইন করছে।’
‘ম্যাচের আগে কেউ এভাবে চিন্তা করেনি, বাট যখনই ম্যাচটা শুরু হলো এবং মোমেন্টামগুলো আমাদের দিকে আসা শুরু করল, সেটাকে আমাদের প্লেয়াররা যেভাবে ধরেছে, সেখান থেকে আর ওদের বের হওয়ার সুযোগ দেয়নি। ক্রেডিট অবশ্যই বাংলাদেশ টিম, প্লেয়ার থেকে ম্যানেজমেন্ট এবং ক্রিকেট বোর্ডের। এই রেজাল্টটা সবার কাছে স্বপ্নের মতো।’
শেষ টেস্টে অস্ট্রেলিয়া সিরিজ বাঁচানোর জন্য খেলবে। এ প্রসঙ্গে হান্নান বলেন, ‘আমি এখন ওইভাবে চিন্তাই করতে চাচ্ছি না, এখনো এই ম্যাচের মধ্যেই আছি। পরের ম্যাচের চিন্তাটা মাথায় এখন কাজ করছে না। আমরা এখনো এই ম্যাচের আনন্দ বা আবেগের মধ্যে আছি, সময় আছে নতুনভাবে চিন্তা করার। একটা দিন বোনাসও পাওয়া গেছে যেহেতু ৫ দিনের খেলা ৪ দিনেই শেষ হয়ে গেছে। একটা দিন বেশি আছে চিন্তা-ভাবনা করার জন্য।’
মন্তব্য করুন