
শ্যামনগর প্রতিনিধি: সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে এক পক্ষের জমিতে জোর করে ধান রোপণ এবং পরে ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) শালিসি সিদ্ধান্ত অমান্য করে ইউপি চেয়ারম্যানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে দেওয়ানি আদালতে মামলা করার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯ আগস্ট গাবুরা ইউনিয়নের সোরা গ্রামের বাসিন্দা আবু মুছা সানার জমিতে একই এলাকার বাসিন্দা মো. আবুল বাসার ওরফে বাদশা ধান রোপণ করেন। আবুল বাসার বর্তমানে খুলনায় বসবাস করেন। এ ঘটনায় প্রতিকার চেয়ে আবু মুছা সানা গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদে লিখিত অভিযোগ দেন।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২২ আগস্ট ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে উভয়পক্ষের উপস্থিতিতে শালিসি বৈঠক হয়। সেখানে জমি নিয়ে বিরোধের কারণে যাতে কোনো সংঘাত বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি না ঘটে, সে জন্য রোপণ করা ধান কাটার উপযুক্ত হলে ইউনিয়ন পরিষদের তত্ত্বাবধানে তা কেটে নিরপেক্ষ স্থানে সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান।
পরে জমির জরিপ, দলিলসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করে প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণের পর সংরক্ষিত ধান সংশ্লিষ্ট মালিকের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত হয় বলেও জানা গেছে।
শালিসে উপস্থিত কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দার দাবি, বৈঠকে আবুল বাসার ওই সিদ্ধান্ত মেনে নেননি। একপর্যায়ে তিনি বাদীপক্ষ ও উপস্থিত ব্যক্তিদের সঙ্গে অশালীন আচরণ করেন এবং উচ্চস্বরে কথা বলে বৈঠক ভণ্ডুল করে দেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আবুল বাসারের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
এরপর ইউনিয়ন পরিষদের শালিসি বৈঠকের সিদ্ধান্ত ও বিরোধের প্রেক্ষাপট যথাযথভাবে উপস্থাপন না করে সাতক্ষীরা দেওয়ানি আদালতে ইউপি চেয়ারম্যান জি এম মাছুদুল আলমসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন আবু মুছা সানা ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জি.এম মাছুদুল আলম বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ সব সময় আইন মেনে স্থানীয় বিরোধ নিষ্পত্তিতে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে। জমি নিয়ে বিরোধের কারণে যাতে কোনো ধরনের রক্তক্ষয় বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি না ঘটে, সে কারণেই ধান কাটার পর পরিষদের জিম্মায় রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, একটি পক্ষ গ্রাম আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটিয়ে উল্টো আমাদের বিরুদ্ধে আদালতে মিথ্যা তথ্য দিয়ে মামলা করেছে। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা এ হয়রানিমূলক মামলার প্রতিবাদ জানাই এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের দাবি জানাচ্ছি।
আবু মুছা সানা ও স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ বিরোধটি শান্তিপূর্ণভাবে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু সেই উদ্যোগের পর আদালতে মামলা করায় তাঁরা বিস্মিত। তাঁদের দাবি, প্রকৃত ঘটনা তদন্ত করে দেখা হোক এবং হয়রানিমূলক মামলা হয়ে থাকলে তা প্রত্যাহারের ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
মামলার বাদী হাফেজ আবুল বাশার দাবি করেন, ইউনিয়ন পরিষদে শালিসের নামে চেয়ারম্যান এক পক্ষের হয়ে অবস্থান নিয়ে তাঁকে ও তাঁর ছেলে সাব্বির আহমেদকে মারধর ও লাঞ্ছিত করেছেন। তাঁর ভাষ্য, তাঁর নামে রেকর্ডভুক্ত জমিতে ধান রোপণ করতে গেলে গত ২১ আগস্ট চেয়ারম্যান লোক পাঠিয়ে তা বন্ধ করে দেন। পরে ২২ আগস্ট তাঁকে ইউনিয়ন পরিষদে যেতে বলা হয়।
হাফেজ আবুল বাশার বলেন, পরিষদে যাওয়ার পর চেয়ারম্যান বিবাদী পক্ষের কথা শুনে আমাদের ওপর চড়াও হন। একপর্যায়ে আমাকে ও আমার ছেলেকে মারধর ও লাঞ্ছিত করা হয়। এ ঘটনায় বাধ্য হয়ে আমরা আদালতের আশ্রয় নিয়েছি।
জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের বিষয়ে তিনি বলেন, বিরোধপূর্ণ ৫৩৪ নম্বর দাগে মোট এক একর নয় শতক জমি রয়েছে। এর মধ্যে তাঁর নামে রেকর্ডভুক্ত ১৬ শতক জমিও রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, ইউনিয়ন পরিষদ পুরো জমিকে বিরোধপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা না করে শুধু তাঁর রেকর্ডভুক্ত ১৬ শতক জমি পরিষদের তত্ত্বাবধানে রাখতে চেয়েছে।
তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, যদি পুরো জমিই বিরোধপূর্ণ হয়, তাহলে এক একর নয় শতক জমিই পরিষদের তত্ত্বাবধানে থাকার কথা। শুধু আমার ১৬ শতক জমি পরিষদের অধীনে রেখে অন্য পক্ষকে তাদের জমি ভোগদখলের সুযোগ দেওয়া হলে সেটি কীভাবে ন্যায়সংগত হয়?
তবে হাফেজ আবুল বাশারের মারধর ও লাঞ্ছিত করার অভিযোগের বিষয়ে ইউপি চেয়ারম্যান জি এম মাছুদুল আলমের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি অস্বীকার করেন। তাঁর দাবি, জমি নিয়ে বিরোধের কারণে সংঘাত এড়াতেই ইউনিয়ন পরিষদ উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে ধান কেটে নিরাপদ স্থানে সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। চেয়ারম্যানের ভাষ্য, পরিষদ কোনো পক্ষের হয়ে নয়, আইন মেনেই বিরোধটি শান্তিপূর্ণভাবে নিষ্পত্তির চেষ্টা করেছে।
মন্তব্য করুন