
ডেস্ক রিপোর্ট: এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর তুলনায় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তিযোগ্য আসন রয়েছে অনেক বেশি। দেশের ৫৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং সেগুলোর অধিভুক্ত কলেজ ও ইনস্টিটিউট মিলিয়ে স্নাতক পর্যায়ে আসন রয়েছে ১০ লাখ ৮২ হাজার ২৮৮টি। অথচ এবার পাস করেছেন মাত্র ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। ফলে মোট আসনের বড় একটি অংশ ফাঁকা থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তবে আসন থাকলেই যে সবাই পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাবেন, বিষয়টি এমন নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে ভর্তি যোগ্যতা ও শর্ত পূরণ করতে না পারায় অনেক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষায় ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। এ অবস্থায় ভর্তি শর্ত শিথিল করা হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপরই ছেড়ে দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে উচ্চশিক্ষায় ভর্তির প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে সন্তানদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন অভিভাবকরাও।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আসনের অর্ধেকও পূরণ হবে না, সুযোগ পাবে কি সবাই?
এইচএসসিতে ফেল করা শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার নতুন তারিখ প্রকাশ
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) তথ্যানুযায়ী, দেশে মোট ৬১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ৫৪টিতে একাডেমিক কার্যক্রম চালু রয়েছে। বাকি সাতটিতে এখনো একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয়নি।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আসনের অর্ধেকও পূরণ হবে না, সুযোগ পাবে কি সবাই?
৭ নভেম্বরের সরকারি ছুটি পাচ্ছেন না যারা
চলতি ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে একাডেমিক কার্যক্রম চালু থাকা ৫৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অধিভুক্ত কলেজ ও ইনস্টিটিউটে স্নাতক পর্যায়ে মোট ভর্তিযোগ্য আসন ১০ লাখ ৮২ হাজার ২৮৮টি। এর মধ্যে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আসন ৬৩ হাজার ৬৬৫টি।
বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক আসনসংখ্যার মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬ হাজার ১২৫, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩ হাজার ৯৫৬, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ হাজার ৩৪, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪ হাজার ৩৩, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ হাজার ৮৪৮, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২ হাজার ৫১৫, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ২ হাজার ৯৫৭, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ হাজার ৭০, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ হাজার ১৭৫, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ হাজার ১০৯, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ হাজার ৩৯৫, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ হাজার ৫৭০, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮৫০, নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৯০, কিশোরগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ে ১২৬ এবং নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৬০টি আসন রয়েছে।
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসে (বিইউপি) ১ হাজার ৮০০ এবং চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিমেল সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৭৫টি আসন রয়েছে।
কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫১০, শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭০৫, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪৩১, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৫০, হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯০ এবং কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিযোগ্য ৮৪টি আসন রয়েছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ হাজার ৬৩৬, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২ হাজার ১০০, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮৭৫, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯৫০, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯৩১, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ হাজার ২৩৫, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ হাজার ১০৫, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭৮০, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ হাজার ৬১১, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ হাজার ৩০, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮৩০, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ হাজার ৫৮০, রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯০, জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০৪, চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯০, সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৭২ এবং পিরোজপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৬০টি আসন রয়েছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬৩০, বাংলাদেশ মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০, ইউনিভার্সিটি অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজিতে ২২০ এবং এভিয়েশন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস বিশ্ববিদ্যালয়ে ১২০টি আসন রয়েছে।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আসন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ ও ইনস্টিটিউটে। এসব প্রতিষ্ঠানে আসন রয়েছে ৯ লাখ ৪৬ হাজার ৯৫টি। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ ও ইনস্টিটিউটে ৪২ হাজার ৪৩৪ এবং ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অধিভুক্ত কলেজ ও ইনস্টিটিউটে ১১ হাজার ২৯০টি আসন রয়েছে।
এর বাইরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজ ও ইনস্টিটিউটে ১ হাজার ৫৮৬, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজ ও ইনস্টিটিউটে ১ হাজার ৭৮৪, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজ ও ইনস্টিটিউটে ৪২০, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজ ও ইনস্টিটিউটে ১৮০, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজ ও ইনস্টিটিউটে ১৮৬, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের অধিভুক্ত কলেজ ও ইনস্টিটিউটে ২ হাজার ৯০, বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজ ও ইনস্টিটিউটে ১ হাজার ৪৪০, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজ ও ইনস্টিটিউটে ১১ হাজার ৫৫, চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজ ও ইনস্টিটিউটে ৩ হাজার ৯০৫, রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজ ও ইনস্টিটিউটে ৫ হাজার ৯৭১ এবং খুলনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজ ও ইনস্টিটিউটে ১ হাজার ৪৮৬টি আসন রয়েছে।
আসন বেশি, পাসের সংখ্যা কম
এবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন শিক্ষার্থী। বিপরীতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও অধিভুক্ত কলেজ-ইনস্টিটিউট মিলিয়ে ভর্তিযোগ্য আসন রয়েছে ১০ লাখ ৮২ হাজার ২৮৮টি। অর্থাৎ উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর তুলনায় আসন বেশি থাকায় বিপুলসংখ্যক আসন ফাঁকা থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে জিপিএ-৫সহ সামগ্রিক ফলাফল কমে যাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নির্ধারিত ভর্তি যোগ্যতা পূরণ করতে পারবেন না অনেক শিক্ষার্থী। ফলে আসনসংখ্যা বেশি হলেও সব আসনে শিক্ষার্থী ভর্তি করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ফলাফল প্রকাশের দিন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভর্তি শর্ত শিথিল করবে কি না, সে সিদ্ধান্ত তাদের নিজস্ব। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কোন বিশ্ববিদ্যালয় তাদের কতটুকু কোয়ালিটি কম্প্রোমাইজ করে অ্যাডমিশন করাবে এটা তাদের নিজস্ব বিষয়। তারা সেইভাবে চিন্তাভাবনা করবে। তবে ভর্তি হওয়ার সুযোগ সকলেই পাবে।’
অকৃতকার্যদের জন্য বিশেষ পরীক্ষার সুযোগ
এবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন ৪ লাখ ২২ হাজার ৯০৫ জন শিক্ষার্থী। এসব শিক্ষার্থীকে পুরো এক বছর অপেক্ষায় না রেখে অকৃতকার্য বিষয়গুলোতে পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ফলাফল প্রকাশের এক মাসের মধ্যে বিশেষ এ পরীক্ষা আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
দেশের সবচেয়ে বেশি আসনসংখ্যার উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়টির ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ অকৃতকার্য বিষয়গুলোতে পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে অনেক উন্নত দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হলে পুনরায় পরীক্ষা দিয়ে পরবর্তী ধাপে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। সে ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের পুরো এক বছর অপেক্ষা করতে হয় না।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে এ ধরনের সুযোগ কখনো ছিল না। এ বছর শিক্ষামন্ত্রী এই পদ্ধতি চালু করেছেন, এতে শিক্ষার্থীরা সত্যিকার অর্থে উপকৃত হবে। বিশেষ পরীক্ষার সুযোগ এবং খাতা পুনর্মূল্যায়নের ফলে আরও অনেক শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। এসব প্রক্রিয়া শেষে পাসের হার প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলেও মনে করেন তিনি।
সব মিলিয়ে, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আসনসংখ্যার তুলনায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক ভর্তি যোগ্যতা, বিশেষ পরীক্ষার ফলাফল এবং খাতা পুনর্মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করবে শেষ পর্যন্ত কতজন শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষায় ভর্তির সুযোগ পাবেন।

মন্তব্য করুন