
বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। ভৌগোলিক অবস্থান ও আমদানি রপ্তানির সম্ভাবনা বিবেচনায় এ বন্দরের গুরুত্ব অনেক বেশি। বিশেষ করে কাস্টমস হাউস প্রতিষ্ঠা ও কাস্টমস কমিশনার পদায়নের মধ্য দিয়ে বন্দরের বাণিজ্যিক সম্ভাবনায় নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। নিষিদ্ধ পণ্য ছাড়া অন্যান্য পণ্য আমদানির সুযোগ সম্প্রসারিত হওয়ায় ব্যবসায়ীদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে নতুন প্রত্যাশা। কিন্তু প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে সেই সম্ভাবনার পূর্ণ সুফল পাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা।
একটি স্থলবন্দরের কার্যকারিতা শুধু আমদানি রপ্তানির সুযোগ কিংবা কাস্টমস হাউস প্রতিষ্ঠার ওপর নির্ভর করে না। এর জন্য প্রয়োজন আধুনিক স্ক্যানার, পর্যাপ্ত ওয়্যারহাউস, ডিজিটাল ওজনযন্ত্র, পণ্য ওঠানামার আধুনিক ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় জনবল। এসব সুবিধার অভাবে ভোমরা বন্দরের কার্যক্রমে কাঙ্ক্ষিত গতি আসছে না।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, পণ্যবাহী ট্রাক বন্দরে প্রবেশের পর খালাস হতে কখনো এক থেকে দুই দিন পর্যন্ত সময় লাগছে। অথচ প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে একই দিনে পণ্য খালাস ও সরবরাহ সম্ভব। দীর্ঘ সময় ট্রাক আটকে থাকায় পরিবহন ও শ্রমিক খরচসহ আনুষঙ্গিক ব্যয় বাড়ছে। এতে লোকসানের মুখে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা। প্রতিযোগিতামূলক বাণিজ্যের যুগে একটি বন্দরে পণ্য খালাসের জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা করা অর্থনীতির জন্যও ইতিবাচক নয়।
ভোমরা বন্দরের সমস্যা শুধু ব্যবসায়ীদের লোকসানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজস্ব আয় ও স্থানীয় কর্মসংস্থানের প্রশ্ন। বন্দরের কার্যক্রম গতিশীল হলে আমদানি-রপ্তানি বাড়বে, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি পাবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। অন্যদিকে অবকাঠামোগত দুর্বলতা দীর্ঘস্থায়ী হলে ব্যবসায়ীরা বিকল্প বন্দর ব্যবহারে আগ্রহী হতে পারেন। এতে ভোমরা তার বাণিজ্যিক সম্ভাবনা হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শ্রমজীবী মানুষের ওপরও। আমদানি ও পণ্যবাহী ট্রাকের সংখ্যা কমে গেলে হ্যান্ডলিং শ্রমিকদের কাজের সুযোগ সংকুচিত হয়। দিনমজুরির ওপর নির্ভরশীল এসব মানুষের আয় কমে যাওয়ায় পরিবার পরিজন নিয়ে জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়ছে। অর্থাৎ বন্দরের সীমাবদ্ধতা ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে শ্রমিক ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট বহু মানুষের জীবন জীবিকাকে প্রভাবিত করছে।
অন্যদিকে কাস্টমস হাউস প্রতিষ্ঠা ও কমিশনার পদায়নের ফলে আমদানির সুযোগ সম্প্রসারিত হয়েছে এবং রাজস্ব আদায়েও ইতিবাচক অগ্রগতির কথা জানিয়েছে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো।
সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের নেতাদের প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন করা গেলে ভোমরা দেশের অন্যতম শীর্ষ রাজস্ব আদায়কারী স্থলবন্দরে পরিণত হতে পারে। এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন দৃশ্যমান ও সময়বদ্ধ উন্নয়ন কার্যক্রম। বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে কয়েকটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।
প্রথমত, পণ্য দ্রুত পরীক্ষার জন্য আধুনিক স্ক্যানার স্থাপন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পণ্য সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত ওয়্যারহাউস নির্মাণ করতে হবে। পাশাপাশি ডিজিটাল ওজনযন্ত্র, পণ্য ওঠানামার আধুনিক সরঞ্জাম, কাস্টমস কার্যক্রমে ডিজিটাল পদ্ধতির সম্প্রসারণ এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করতে হবে। বন্দরের অভ্যন্তরীণ সড়ক ও ট্রাক রাখার স্থানও উন্নত করা প্রয়োজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উন্নয়ন কার্যক্রমের জন্য বাস্তবসম্মত সময়সীমা নির্ধারণ করা। কোন কাজ কত দিনের মধ্যে সম্পন্ন হবে এবং কোন কর্তৃপক্ষ তার দায়িত্বে থাকবে, সে বিষয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকা জরুরি।
শুধু সভা, আশ্বাস কিংবা পরিকল্পনায় সীমাবদ্ধ থাকলে ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের দুর্ভোগের অবসান হবে না। ভোমরা স্থলবন্দর শুধু সাতক্ষীরার সম্পদ নয়, এটি দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং জাতীয় রাজস্ব বৃদ্ধিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক অবকাঠামো ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে এ বন্দর ভারত বাংলাদেশ বাণিজ্যে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
প্রশ্ন হলো, কাস্টমস হাউস প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যে সম্ভাবনার সূচনা হয়েছে, তার বাস্তব সুফল ব্যবসায়ীরা কবে পাবেন? পণ্য খালাসের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসানই বা কবে হবে? ভোমরা কি শুধু সম্ভাবনার বন্দরের পরিচয়ে আটকে থাকবে, নাকি আধুনিক অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হবে? এখন আর শুধু সম্ভাবনার কথা বলার সময় নয়, প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ, দৃশ্যমান উন্নয়ন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি।
ভোমরা স্থলবন্দরের উন্নয়ন মানে সাতক্ষীরার অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা, শ্রমজীবী মানুষের কর্মসংস্থান এবং জাতীয় অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন। এই সুযোগ অবহেলায় হারিয়ে যেতে দেওয়া উচিত নয়।
(মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন)

মন্তব্য করুন