
শ্যামনগর প্রতিনিধি: সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের বিভিন্ন পয়েন্টে জাইকার অর্থায়নে চলমান বেড়িবাঁধ সংস্কার প্রকল্প ঘিরে অনিয়ম ও পরিবেশ ধ্বংসের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের ব্লক তৈরির জন্য জায়গা সম্প্রসারণ করতে গিয়ে খোলপেটুয়া নদীর চরের পূর্ব দুর্গাবাটি হুলা এলাকায় প্রায় তিন শতাধিক গাছ কেটে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আর রাজ কর্পোরেশন নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ওই এলাকায় বেড়িবাঁধ সংস্কারের জন্য ব্লক তৈরির কাজ পরিচালনা করছে। ওই ব্লক তৈরির কাজের জায়গার পরিধি বাড়ানোর লক্ষ্যে বালি ভরাটের জন্য চরের প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেওয়া কেওড়া ও গেওয়াসহ অন্যান্য গাছ নির্বিচারে কেটে ফেলা হচ্ছে। স্কেভেটর (ভেকু) ব্যবহার করে গাছ কেটে তাৎক্ষণিক মাটিচাপা দেওয়ার দৃশ্যও দেখা গেছে। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভ বিরাজ করছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এই গাছগুলো দীর্ঘদিন ধরে উপকূলীয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক সুরক্ষা বলয় হিসেবে কাজ করে আসছে, যা এখন ধ্বংস করে ফেলা হচ্ছে।
পূর্ব দুর্গাবাটি এলাকার বাসিন্দা অজয় মন্ডল বলেন, ঝড়ের সময় চরের বড় বড় গাছ অনেকটা ঢাল হিসেবে আমাদের রক্ষা করে। গাছগুলো এভাবে কাটা ঠিক হলো না। এ ছাড়া বাঁধ টিকিয়ে রাখতে গাছের প্রয়োজন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা অভিযোগ করেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সঙ্গে আর রাজ কর্পোরেশন নামীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক সবুজ খানের গোপন যোগসূত্র রয়েছে। সেই প্রভাবেই দিনের পর দিন এ ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতি চললেও কেউ এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
আরেকজন বলেন, বিগত সরকারের আমল থেকে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার করে উপকূলীয় এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করেছেন তিনি। এখনো একইভাবে বিভিন্ন মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা দেখিয়ে নিজের অবস্থান শক্ত রাখার চেষ্টা করছে এই প্রভাবশালী ঠিকাদার।
পরিবেশ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নদীর চরের এই গাছগুলো উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো মাটি দৃঢ় রাখে, নদীভাঙন প্রতিরোধ করে এবং ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সময় ঢেউয়ের আঘাত কমাতে সাহায্য করে। এই গাছগুলো কেটে ফেলার ফলে শুধু জীববৈচিত্র্যই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, বরং ভবিষ্যতে বেড়িবাঁধের স্থায়িত্ব নিয়েও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পরিবেশ কর্মী শাহীন আলম এ বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনীর পূর্ব দুর্গাবাটি হুলায় নদীর চরে যেভাবে নির্বিচারে গাছ কাটা হচ্ছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং অমানবিক। এই গাছগুলো শুধু গাছ নয়, এগুলো আমাদের উপকূলের প্রাকৃতিক ঢাল, যা নদীভাঙন রোধ করে, ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের ক্ষতি কমায় এবং অসংখ্য প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে কাজ করে।
তিনি আরও বলেন, বাঁধ উন্নয়নের নামে যদি এইভাবে প্রাকৃতিক বন উজাড় করা হয়, তাহলে সেই উন্নয়ন কখনোই টেকসই হবে না। বরং এতে করে পুরো উপকূলীয় অঞ্চল আরও বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। প্রকৃতিকে ধ্বংস করে কোনো উন্নয়ন গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, অবিলম্বে এই গাছ নিধন বন্ধ করতে হবে, বিষয়টি তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি যেখানে গাছ কাটা হয়েছে সেখানে দ্রুত পুনর্বনায়নের উদ্যোগ নিতে হবে, নাহলে ভবিষ্যতে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয় মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে থাকলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে করে অভিযুক্তরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। তাই এলাকাবাসী দ্রুত তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি অবৈধভাবে গাছ নিধন বন্ধ এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পুনর্বনায়নের উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আর রাদ কর্পোরেশনের মালিক সবুজ খাঁন তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, জাইকার অর্থায়নে প্রায় ৯৭ কোটি টাকার এই বেড়িবাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে, যার মেয়াদ ২০২৭ সাল পর্যন্ত। তবে মন্ত্রণালয় থেকে আমাদেরকে আগাম সতর্ক করে দ্রুত কাজ শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়, কারণ সামনে বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা রয়েছে। সেই বিবেচনায় ২০২৬ সালের মধ্যেই কাজ সম্পন্ন করার লক্ষ্যে আমরা কাজের গতি বাড়িয়েছি।
তিনি আরও বলেন, ব্লক তৈরির কাজ দ্রুত শেষ করতে হলে নির্দিষ্ট পয়েন্টে জায়গা সম্প্রসারণ প্রয়োজন ছিল। সেই কারণে পাশের চরের কিছু অংশে কাজ শুরু করা হয়েছে, যা ২০২৩ সালে জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে অনুমোদিত ছিল।
গাছ কাটার অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, বড় কোনো গাছ কাটা হয়নি। কিছু ছোট গাছ কাটা পড়েছে এটা আমি স্বীকার করছি। তবে সেটি পুরোপুরি এলাকার স্বার্থে এবং প্রকল্পের প্রয়োজনে করা হয়েছে। আমরা কোনোভাবেই পরিবেশের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে কাজ করছি না।
সবুজ খাঁন দাবি করেন, উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য এবং সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে তিনি দ্রুত কাজ সম্পন্ন করতে চেষ্টা করছেন।
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, আমি ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্বে থাকলেও নদীর চরের গাছ কেটে ভরাট করার বিষয়ে আমরা কিছু জানি না। কে বা কারা অনুমতি দিয়েছে এটা প্রশাসনের কাছে আমার প্রশ্ন। অবিলম্বে এই গাছ কাটা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।
তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, নদীর চরে যেন আর একটি গাছও কাটা না হয়, সে বিষয়ে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড-১-এর পানি উপ-সহকারী প্রকৌশলী ফরিদুল ইসলাম জানান, বিষয়টি জানার পর আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি এবং আপাতত কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মন্তব্য করুন