বাংলাদেশ, রবিবার, ১৬ আগস্ট ২০২৬
১ ভাদ্র ১৪৩৩ | সময়:
The Editors
১৪ আগস্ট ২০২৬, ১১:০১ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

বুশরাগ্রুপে নিজের ৪ লাখ টাকা, তবু নিজ সন্তানের হাসপাতালের বিল দিতে ধার!

 

কালিগঞ্জ প্রতিনিধি: কোলে নবজাতক, হাসপাতালের বেডে অস্ত্রোপচারের পর অসুস্থ স্ত্রী। হাতে হাসপাতালের বিল, অথচ হাতে নগদ টাকা নেই। সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতা হলো, এই পরিবারেরই বুশরা গ্রুপে জমা আছে ৪ লাখ টাকা। জীবন-মৃত্যুর এই সংকটে নিজের সেই আমানত থেকে মাত্র ৫০ হাজার টাকা ফেরত চেয়েও পাননি সাতক্ষীরার কালিগঞ্জের আমানতকারী এস এম রেদেওয়ানুল ফেরদাউস। শেষ পর্যন্ত ৮ আগস্ট হাসপাতালে ভর্তি থেকে ১৩ আগস্ট ছাড়পত্র নেওয়া পর্যন্ত চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের কাছ থেকে ১ লাখ টাকা ধার করতে হয়েছে তাকে।
এমন হৃদয়বিদারক ঘটনার শিকার হয়েছেন সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ উপজেলার বুশরা ইসলামী মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের আমানতকারী এস এম রেদেওয়ানুল ফেরদাউস।

রেদেওয়ানুল ফেরদাউস জানান, ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার কথা ভেবে তার বাবার পেনশনের জমানো ৪ লাখ টাকা বুশরা গ্রুপে আমানত হিসেবে রেখেছিলেন। প্রয়োজনের সময় সেই সঞ্চয়ই পরিবারের ভরসা হবে, এমন বিশ্বাসেই টাকা জমা করেছিলেন তিনি। কিন্তু সবচেয়ে প্রয়োজনের মুহূর্তেই সেই টাকা তার কাজে এল না।

হঠাৎ তার স্ত্রীর জরায়ুতে টিউমার ধরা পড়ে। পরিস্থিতি জটিল হওয়ায় জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয় তাকে। গত ৮ আগস্ট স্ত্রীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী সিজারিয়ান অপারেশনের পাশাপাশি অতিরিক্ত অস্ত্রোপচারও করতে হয়। ভূমিষ্ঠ হয় তাদের সন্তান। মা ও নবজাতককে ঘিরে স্বজনদের মধ্যে যখন আনন্দের পাশাপাশি উৎকণ্ঠা, তখন চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ আরও বাড়তে থাকে।

১৩ আগস্ট হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নেওয়ার সময় সামনে আসে বড় অঙ্কের বিল। সবমিলিয়ে চিকিৎসা ব্যয় দাঁড়ায় লক্ষাধিক টাকা। এই কঠিন সময়ে নিজের আমানতের টাকা পাওয়ার আশায় বুশরা গ্রুপের সংশ্লিষ্টদের কাছে ছুটে যান রেদেওয়ানুল।

তিনি বুশরা গ্রুপের চেয়ারম্যান শরিফুল ইসলাম, পরিচালক ইকবাল কবীর পলাশ এবং এরিয়া ম্যানেজার রফিকুল ইসলামের কাছে গিয়ে পরিস্থিতির কথা জানান।

নিজের জমা ৪ লাখ টাকা থেকে অন্তত ৫০ হাজার টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য আকুতি জানান তিনি।

কিন্তু অভিযোগ, বারবার যোগাযোগ করেও তিনি টাকা পাননি। তাকে সময় দেওয়া হয়েছে, আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, কিন্তু হাতে ফেরত দেওয়া হয়নি নিজের জমা টাকার একটি টাকাও।

অসহায় রেদেওয়ানুলের ভাষায়, আমার স্ত্রী হাসপাতালে, সদ্য সন্তান হয়েছে। চিকিৎসার জন্য জরুরি টাকা দরকার ছিল। বুশরায় আমার নিজের টাকা জমা আছে। মাত্র ৫০ হাজার টাকা চেয়েছিলাম। কিন্তু সেই টাকাটাও পেলাম না।

শেষ পর্যন্ত হাসপাতালের বিল পরিশোধ করতে বাধ্য হয়ে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকে ধার করেন তিনি। একদিকে নবজাতকের মুখে নতুন জীবনের আলো, অন্যদিকে নিজের জমানো টাকা থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসার বিল দিতে অন্যের কাছে হাত পাততে হয়েছে তাকে।

রেদেওয়ানুলের এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত দুর্ভোগ নয়, বুশরার টাকা আটকে থাকা গ্রাহকদের সংকটের একটি চিত্র বলে মনে করছেন।

গ্রাহকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বুশরা গ্রুপে টাকা জমা রাখলেও প্রয়োজনের সময় তারা নিজেদের আমানতের মূল টাকাই ফেরত পাচ্ছেন না। কারও মেয়ের চিকিৎসা, কারও সন্তানের পড়াশোনা, কারও পারিবারিক সংকট, আবার কারও জরুরি চিকিৎসা ব্যয় মেটানোর প্রয়োজন হলেও টাকা তুলতে গিয়ে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটির কাছে বছরের পর বছর টাকা জমা রাখার পরও এখন তাদের সেই অর্থের জন্য বারবার ঘুরতে হচ্ছে।

বুশরা গ্রুপের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ করছেন আরও অনেক আমানতকারী। তাদের দাবি, বছরের পর বছর ধরে তারা নিয়মিত সঞ্চয় ও আমানত করেছেন। কিন্তু এখন টাকা ফেরত চাইলে কখনও তারল্য সংকট, কখনও সময়ের প্রয়োজন, আবার কখনও নানা প্রশাসনিক জটিলতার কথা বলা হচ্ছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কালিগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় বুশরার কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্প থাকলেও সাধারণ আমানতকারীরা তাদের জমা টাকা ফেরত পাচ্ছেন না। এদিকে সম্প্রতি বুশরার বিভিন্ন অফিস বন্ধ থাকা এবং গ্রাহকদের টাকা ফেরত না পাওয়ার ঘটনায় স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষোভ আরও বাড়ছে বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।
ভুক্তভোগী আমানতকারীরা তাদের আমানতের টাকা ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক কার্যক্রম, সম্পদ, আমানত সংগ্রহ ও অর্থের ব্যবহার তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

স্থানীয় সচেতন মহলেরও দাবি, সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ নিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়ম বা প্রতারণার অভিযোগ উঠলে তা দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করা প্রয়োজন। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা করতে হবে।

তবে বুশরা গ্রুপের চেয়ারম্যান শরিফুল ইসলাম বলেন, তারল্য সংকটের কারণে আমরা গ্রাহকদের টাকা দিতে পারছিনা। কবে দিবেন এমন প্রশ্নের সঠিক জবাব না দিয়ে তিনি ফোন কেটে দেন।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জামায়াত-গণঅধিকার পরিষদ সংঘর্ষ, এমপি আমির হামজাসহ আহত ১০

নলতায় আহছানিয়া পাবলিক লাইব্রেরির পাঠ প্রতিযোগিতা

কালিগঞ্জে কৃষকদলের দোয়া মাহফিল

সাতক্ষীরা জেলা আ’লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী আখতারসহ গ্রেপ্তার ৩

ব্রহ্মরাজপুরে প্রিমিয়ার সিমেন্ট প্রীতি ফুটবল ম্যাচে ইমারত শ্রমিকদের জয়

সুন্দরবন প্রেসক্লাবে কালিগঞ্জ মালিক-শ্রমিক ইউনিয়ন নেতৃবৃন্দের সৌজন্য সাক্ষাৎ

শ্যামনগর উপজেলা প্রেসক্লাবের নির্বাচন ৫ সেপ্টেম্বর, ১৩ পদে ১৯ প্রার্থী

চলে গেলেন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মোশারাফ হোসেন মশু

গাবুরায় বিদ্যুৎ সেবা নিয়ে মতবিনিময়

রাজধানীতে অভিনেত্রীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার

১০

অবসর ও কল্যাণ ভাতা পাচ্ছেন ৭০ হাজার শিক্ষক: শিক্ষামন্ত্রী

১১

কয়রায় যুব দিবসে তরুণদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে ইতিবাচক পরিবর্তনের আহ্বান

১২

ইন্দোনেশিয়ায় ফের শক্তিশালী ভূমিকম্প

১৩

পাইকগাছায় খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে দোয়া মাহফিল

১৪

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় স্থানীয় উদ্যোগ জোরদারের আহ্বান

১৫

পাইকগাছার নবারুণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্তে নানা অনিয়মের প্রমাণ

১৬

কয়রায় মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সভা

১৭

ভারী বৃষ্টিপাতসহ আগামী ৫ দিনের আবহাওয়ার পূর্বাভাস

১৮

ডারউইন টেস্টে বাংলাদেশের যত রেকর্ড

১৯

আবারো মা হলেন পূজা

২০
error: Content is protected !!