বাংলাদেশ, শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬
১ কার্তিক ১৪৩৩ | সময়:
The Editors
২৯ আগস্ট ২০২৬, ৩:৫৬ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার সাতক্ষীরা, কিন্তু পর্যটনের দরজা কোথায়? || মো. মামুন হাসান

সুন্দরবন ছুঁয়ে থাকা বিশাল দক্ষিণ-পশ্চিম ভূখণ্ডের প্রাণকেন্দ্র সাতক্ষীরা কেবল মানচিত্রের এক সীমান্তঘেঁষা জেলা নয়, প্রকৃতির সবচেয়ে রহস্যময় ও সমৃদ্ধ দরজার নাম। বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে জেগে ওঠা এই জনপদকে দীর্ঘকাল ধরে বলা হয়ে আসছে ‘সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার’। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় হলো, প্রবেশদ্বার হিসেবে খ্যাতি পেলেও আজও জেলাটিতে পর্যটনের কাঙ্ক্ষিত দরজাটি খোলেনি। পর্যটন বলতে আমরা যে সাজানো পরিকাঠামো, মসৃণ যোগাযোগ ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক মানের আতিথেয়তার কথা ভাবি, সাতক্ষীরায় তা এখনো এক অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির নাম।

মানচিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, সুন্দরবনের সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় এবং নিকটবর্তী রূপটি সাতক্ষীরার শ্যামনগর অংশেই বিস্তৃত। কলাগাছিয়া, মুন্সীগঞ্জ বা বুড়িগোয়ালিনীর দিকে তাকালে বোঝাই যায় না সুন্দরবন অন্য কোনো জেলায় হতে পারে। অথচ পর্যটনের ব্র্যান্ডিং ও অর্থনীতির ম্যাপে সাতক্ষীরা বরাবরই উপেক্ষিত।

পর্যটকদের সিংহভাগ এখনো সুন্দরবন ভ্রমণের জন্য বেছে নেন খুলনা কিংবা মোংলা রুট। এতে করে সাতক্ষীরার সম্ভাবনাটুকু বছরের পর বছর কেবল স্থানীয় উপকথার মতো আটকে আছে চার দেয়ালের মধ্যে। অথচ ভৌগোলিক নৈকট্য ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের বিচারে সাতক্ষীরা হতে পারতো পরিবেশবান্ধব বা ইকো ট্যুরিজমের এশীয় রাজধানী।

প্রবেশদ্বার থাকার পরও পর্যটনের দরজা কেন বন্ধ, সেই প্রশ্ন তুলতে গেলে বেশ কিছু কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। প্রথমত, অবকাঠামোগত ঘাটতি। যেকোনো অঞ্চলের পর্যটন বেঁচে থাকে যোগাযোগ ও আবাসনের নির্ভরযোগ্যতার ওপর। রাজধানী বা দূরদূরান্ত থেকে আসা পর্যটকদের জন্য সাতক্ষীরার মুন্সীগঞ্জ পর্যন্ত যাত্রা এখনো বেশ ক্লান্তিকর। মানসম্মত হোটেল, নিরাপদ পরিবহন এবং ইকো ফ্রেন্ডলি রিসোর্টের যে সংকট এখানে বিদ্যমান, তা ভ্রমণপিপাসুদের বারবার নিরুৎসাহিত করে। কেবল নদীর সৌন্দর্য দেখে মানুষ দিনের পর দিন থাকতে চায় না; মানুষের প্রয়োজন নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা ও স্বাচ্ছন্দ্য।

দ্বিতীয়ত, সুপরিকল্পিত মার্কেটিং ও ব্র্যান্ডিংয়ের সম্পূর্ণ অভাব। আমরা বছরের পর বছর কেবল রূপক বাক্যে সাতক্ষীরাকে ‘সুন্দরবনের দরজা’ বলে এসেছি, কিন্তু বিশ্বমঞ্চে বা জাতীয় পর্যটন নীতিতে এই দরজাকে আকর্ষণীয় করে তোলার কোনো সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। নীলডুমুর কিংবা গাবুরা হতে পারতো ভাসমান পর্যটন কেন্দ্র, রিভার ক্রুজ কিংবা কমিউনিটি বেসড ট্যুরিজমের অনন্য মডেল। স্থানীয় গোলপাতা, ম্যানগ্রোভ মধু আর জলবায়ুসংগ্রামী মানুষের গল্পগুলোকে যুক্ত করে একটি বিশেষ ট্যুরিজম সার্কিট গড়ে তোলা যেতো, যা দেশের অন্য কোথাও সম্ভব নয়।

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত সাতক্ষীরার পর্যটন অর্থনীতিকে আরও বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। বারবার ঘটে যাওয়া সিডর, আইলা বা আম্পানের মতো ঘূর্ণিঝড় এই অঞ্চলের অর্থনীতি ও অবকাঠামোকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। অথচ এই দুর্যোগ সহনশীল টেকসই অবকাঠামো গড়ে তোলাই হতে পারতো সমাধানের পথ। প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকা সাতক্ষীরার স্থানীয় মানুষদের পর্যটন প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে পারলে তা হতো এক বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। কমিউনিটি ট্যুরিজমের মাধ্যমে স্থানীয় তরুণরা হতে পারতেন পর্যটন গাইড, হস্তশিল্পের কারিগর কিংবা ম্যানগ্রোভ সংস্কৃতির ধারক।

সাতক্ষীরায় পর্যটনের বন্ধ দরজাটি খুলতে হলে ঐতিহ্যগত চিন্তাভাবনা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সুন্দরবন কেবল গাছপালা আর বাঘের জঙ্গল নয়; এটি একটি সম্পূর্ণ বিশ্ব ঐতিহ্য। সাতক্ষীরার অংশে যে নিরিবিলি সুন্দরবন দাঁড়িয়ে আছে, তা বিশ্বের যেকোনো প্রকৃতিপ্রেমীকে মুগ্ধ করার ক্ষমতা রাখে। প্রয়োজন শুধু সমন্বিত পরিকল্পনা। আধুনিক মানের পরিবেশবান্ধব রিসোর্ট তৈরি, সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষা করে পরিবেশ বান্ধব ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ, নৌপথের আধুনিকায়ন এবং সবচেয়ে বড় কথা একটি শক্তিশালী ‘সাতক্ষীরা ব্র্যান্ডিং’ গড়ে তোলা। সাতক্ষীরার শ্যামনগর অঞ্চলকে আন্তর্জাতিক পরিবেশবান্ধব পর্যটন অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা এখন সময়ের দাবি।

দরজা তখনই খোলে যখন সেটির সঠিক চাবি সঠিক জায়গায় ব্যবহার করা হয়। সাতক্ষীরাকে কেবল কাগজে কলমে সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার বানিয়ে রাখার দিন শেষ। প্রাকৃতিকভাবে অর্জিত এই পরিচিতিকে বাস্তবে পর্যটন শিল্পে রূপান্তর করতে হবে। সুন্দরবনের এই অপার সম্ভাবনাকে সঠিক নীতি ও বিনিয়োগের মাধ্যমে মুক্ত করতে পারলে, সাতক্ষীরা কেবল সুন্দরবনের প্রবেশদ্বারই থাকবে না, হয়ে উঠবে পুরো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও প্রাকৃতিক পর্যটনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।

লেখক: ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, সাতক্ষীরা

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সাতক্ষীরায় সাংবাদিকতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে অভিজ্ঞতা বিনিময় অধিবেশন

১

হাজার বছরের পথ বেয়ে পর্যটনের বাংলাদেশ || মো: মামুন হাসান

২

সাতক্ষীরায় দুর্গাপূজার নিরাপত্তায় ৩১ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন

৩

সাতক্ষীরায় আর্ন্তজাতিক গ্রামীণ নারী দিবস পালিত

৪

শ্যামনগরে গ্রামীণ নারী কৃষি মেলা

৫

সাতক্ষীরায় মাসব্যাপী সাঁতার প্রশিক্ষণ উদ্বোধন

৬

হাম-রুবেলা প্রতিরোধে ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করার আহ্বান

৭

পাইকগাছায় ১৫১ পূজামণ্ডপে সরকারি সহায়তা প্রদান

৮

প্রান্তিক মানুষের অভিজ্ঞতা, সফলতা ও প্রত্যাশা নিয়ে সাতক্ষীরায় সহযোগিতা সভা

৯

সাতক্ষীরায় দুর্গোৎসবে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিতের আশ্বাস রেঞ্জ ডিআইজির

১০

তথ্য অধিকার দিবস উদযাপনে আলোচনা

১১

পূজো আসে, আনন্দ আসে না বাঘ বিধবাদের ঘরে

১২

ধর্ষণ মামলায় মোশাররফকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ

১৩

সুন্দরবনের অভয়ারণ্যে কাকড়া শিকার, নৌকাসহ ৩ জেলে আটক

১৪

মাদকের টাকা না পেয়ে মাকে দা দিয়ে কোপ, ঠেকাতে গিয়ে কাকী নিহত

১৫

কপ ৩১: যাদের জন্য জলবায়ু সম্মেলন, তাদের জায়গা কোথায়? || এস এম জান্নাতুল নাঈম

১৬

জবি ক্যাম্পাসে পশু জবাই নিষিদ্ধ করল প্রশাসন

১৭

কয়রায় ইকোসিস্টেম পুনরুদ্ধারে যুবকদের উদ্যোগ, খাল-পুকুরে পরিচ্ছন্নতা অভিযান

১৮

দেবহাটায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ক্লাবে ক্রীড়া সামগ্রী বিতরণ

১৯

কালিগঞ্জে যুবলীগ সদস্য মহব্বত গ্রেপ্তার

২০