

রিজাউল করিম, স্টাফ রিপোর্টার: সাতক্ষীরা শহরজুড়ে চোখে পড়ে রাজনৈতিক দল, কোচিং সেন্টার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ নানা প্রতিষ্ঠানের প্রচারপত্র। যার অধিকাংশই টানানো হয়েছে গাছে পেরেক ঠুকে বা কাটা তার দিয়ে বেধে। এতে একদিকে যেমন শহরের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে ব্যাহত হচ্ছে গাছগুলোর স্বাভাবিক বৃদ্ধির প্রক্রিয়া। যা পক্ষান্তরে পরিবেশের ক্ষতি করছে।
সাতক্ষীরা শহরের পোস্ট অফিস-সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ-পুরাতন সাতক্ষীরা সড়ক, বকুলতলা হতে যা জিয়া হল, সাতক্ষীরা সরকারি মহিলা কলেজ, সাতক্ষীরা সিটি কলেজসহ শহরের প্রতিটি সড়কেই গাছে গাছে ঝুলছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রচারপত্র- ব্যানার ফেস্টুন সাইনবোর্ড।
সাতক্ষীরার তরুণ জলবায়ু যোদ্ধা ও প্রান্তিক যুব সংঘের সভাপতি হৃদয় মন্ডল বলেন, সাতক্ষীরা শহরের বিভিন্ন জায়গায় গাছে পেরেক ঠুকে কিংবা ধাতব তার দিয়ে ব্যানার, ফেস্টুন লাগানো হয়েছে। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন জায়গায় এগুলো লাগানো হচ্ছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর নেতিবাচক প্রভাব গাছ ও পরিবেশের ওপর পড়তে পারে। গাছে পেরেক বা তার ব্যবহারের ফলে কাণ্ডে ক্ষত তৈরি হয়। এতে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ার শংকা রয়েছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, গাছ শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়। গাছ বায়ু বিশুদ্ধ রাখতে, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে, কার্বন শোষণ করতে এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই একটি গাছকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা মানে আমাদের পরিবেশেরও ক্ষতি করা। আমার মনে হয়, প্রচারণার জন্য গাছ ব্যবহার না করে নির্দিষ্ট ও অনুমোদিত জায়গা ব্যবহার করা উচিত। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
তরুণ পরিবেশ কর্মী ও সাতক্ষীরা সরকারি মহিলা কলেজের দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্রী জ্যোতি সরকার জানান, গাছ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও মানবজীবন সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু গাছে পেরেক ঠুকে বা তার দিয়ে ব্যানার, ফেস্টুন টানানোর ফলে গাছের কাণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে গাছ স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে গাছ দুর্বল হয়ে মারা যেতে পারে। তাই পরিবেশ রক্ষায় গাছের ওপর পেরেক ও তার ব্যবহার বন্ধ করা জরুরি।
পরিবেশ কর্মী ও স্বদেশের নির্বাহী পরিচালক মাধব দত্ত বলেন, গাছেরও প্রাণ আছে, মানুষ সেই অনুভূতিটাকে গুরুত্ব না দিয়ে গাছে ব্যবসায়িক বিজ্ঞাপনের ব্যানার ফেস্টুন প্লাকার্ড ঝুলায় এবং পেরেক দিয়ে সেটে দেওয়া হয়। গাছের প্রতি অবজ্ঞা বা অজ্ঞতার কারণেই এই ক্ষতিগুলো হচ্ছে। আমাদেরকে এই জায়গা থেকে বের হয়ে আসার দরকার। কারণ প্রকৃতি আমাদের প্রাণ, প্রকৃতি না বাঁচলে আমরা বাঁচবো না, একটা গাছ মানুষের বেঁচে থাকার জন্য যে পরিমাণ অক্সিজেন দেয়, তার প্রতিদানকে যদি আমরা স্বীকার না করি, তাহলে প্রকৃতি এবং গাছের প্রতি আমাদের অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ পায়। সেই জায়গা থেকে আমি মনে করি গাছকে বাঁচিয়ে রাখা দরকার, প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রাখা দরকার। অন্যায়ভাবে না জেনে না বুঝে গাছে পেরেক দিয়ে বিভিন্ন প্রচারপত্র ঝুলিয়ে দেওয়া হয় এটি বন্ধ হওয়া উচিত। পরিবেশ আইনেও এটি নিষিদ্ধ। এই জন্য বিশেষ সচেতনতা দরকার।
তিনি বলেন, গাছে যেন কোন প্রকার সাইনবোর্ড টানানো না হয়, গাছে যেন কোন ধরনের আঘাত করা না হয় এবং বিনা প্রয়োজনে কোন গাছ যেন কাটা না হয়।
সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান প্রফেসর ড. নাসরিন আক্তার বলেন, গাছে পেরেক মারার কারণে গাছের ক্ষতি হয়, ওখানে ক্ষত সৃষ্টি হয়, অনুজীবীর আক্রমণ হয়ে রোগে আক্রান্ত হয়। কোষগুলো মরে যায়, গাছের পানি শোষণ ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। এক সময় আস্তে আস্তে গাছগুলো মারা যায় বা যেতে শুরু করে। এগুলো সম্পূর্ণ অন্যায়। একটি উদ্ভিদ, সেও তো একটি জীব। একটি গাছের গায়ে দিনের পর দিন মাসের পরে মাস বছরের পর বছর এভাবে পেরেক পুথে অথবা তার দিয়ে বেঁধে ব্যানার ফেস্টুনগুলো ঝুলিয়ে রাখা পরিবেশের জন্য বড় একটা ক্ষতি। গাছ আমাদের সব থেকে উপকারী বন্ধু। এজন্য জরুরিভাবে মানুষকে সচেতন করতে হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তর সাতক্ষীরা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সৌমেন মৈত্র বলেন, গাছের সঙ্গে পেরেক ঠুকে কিংবা তার দিয়ে ব্যানার-ফেস্টুন টানানো পরিবেশ ও গাছের জন্য ক্ষতিকর। জনসচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে সকলকে এই কাজ থেকে বিরত রাখতে হবে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মন্তব্য করুন