
কোথা থেকে শুরু করব, বুঝতে পারছি না। হতবিহবল মানুষের কাছ থেকে স্বভাবজাত লেখা বা বক্তব্য আশা করাটা দুষ্কর। বৃহস্পতিবার দুপুরে দৃষ্টিপাত সম্পাদক জিএম নূর ইসলামের মৃত্যু সংবাদ পাই। মুহূর্তেই স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ি। সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাঁর শারীরিক অবস্থা দেখে আগেই শঙ্কিত হয়েছিলাম।
জিএম নূর ইসলাম। সাতক্ষীরায় পত্রিকাজগতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। ব্যক্তিজগতে তিনি ছিলেন একজন সফল মানুষ। তবে তাঁর এই সফলতার পেছনে ছিল নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের ইতিহাস। প্রায় ৪০ বছর আগে যশোরের নাভারণ থেকে আব্দুল খালেক তার মেজ ভাই গোলাম মোস্তফা ও ছোট ভাই নূর ইসলামসহ তাদের সন্তানদের নিয়ে সাতক্ষীরার সুলতানপুরে বসতি গড়েন। সেনাবাহিনীতে কর্মরত আব্দুল খালেকের সহায়তায় জিএম নূর ইসলাম সঙ্গীতা মোড় এলাকায় একটি মনোহরী দোকান করেন। মেয়েদের আলতা, স্নো, পাউডার আর রঙ-বে-রঙের ভিউকার্ড বিক্রির মাধ্যমে তিনি কিছুটা স্বচ্ছল হলেন। কিন্তু প্রকৃতি যাকে ডাকে আরও বৃহ সরোবরে ঝাপ দেওয়ার জন্য, তিনি কি কুয়োর মধ্যে সাতার কাটতে পছন্দ করবেন? মনোহরী ব্যবসাটা ঠিক মনোপুত হলো না তাঁর। বাস টার্মিনাল এলাকায় দোকান নিয়ে পত্রিকা বেঁচা শুরু করলেন তিনি। আজকের সোশ্যাল মিডিয়ায় ডিজিটাল প্লাটফর্মের তরুণ-তরুণীরা ভাবতেই পারবেন না, ২ দশক আগে প্রিন্ট পত্রিকার দাপটের কথা। দেশের যত নামী-দামি পত্রিকা রয়েছে, সাতক্ষীরায় তার প্রধান এজেন্ট জিএম নূর ইসলাম। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই, তিনি ব্যবসাসহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কঠোর নিয়মানুবর্তিতা দেখিয়েছেন। পত্রিকার হকাররাও তাঁর বেঁধে দেওয়া শৃঙ্খলার বাইরে যেতে পারতেন না। পুরো সাতক্ষীরা জেলায় তিনি হয়ে উঠলেন পত্রিকার এজেন্সির ক্ষেত্রে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী নাম। ঢাকা থেকে কোনো পত্রিকা বের হলে সার্কুলেশন ম্যানেজারদের মনে যার নামটাই প্রথমে আসত, তিনি হলেন জিএম নূর ইসলাম।
দৈনিক দৃষ্টিপাত। নূর ইসলামকে সুপরিচিত করেছে এই পত্রিকাটি। ২০০১ সালের শেষের দিকে এই পত্রিকাটি তাঁর সম্পাদনায় বের হয়। সার্কুলেশন ক্যাপাসিটির কারণে পত্রিকাটির প্রচার সংখ্যা ছিল ব্যাপক। জানা যায়, সারা রাত প্রেসে কাজ করার পর পত্রিকা ব্যান্ডেল করে গাড়িতে তুলে দিয়ে তিনি যখন বাসায় যেতেন, তখন পূব আকাশে সূর্যের লাল আভা ফুটে উঠত। একদিন-দুইদিন নয়, বছরের পর বছর তিনি পত্রিকাটিকে এভাবে সন্তানসম লালন-পালন করে হৃষ্টপুষ্ট করে তারুণ্যে পৌঁছে দিয়েছেন। পত্রিকার নামে নামকরণকৃত তাঁর কাশেমপুরস্থ (মেহেদীবাগ) বাড়িতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে প্রস্তুতকৃত দৃষ্টি পিউর ড্রিংকিং ওয়াটারও বেশ সফলতা দেখিয়েছিল।
মাসজিদে কুবা। মেহেদীবাগে অবস্থিত এই মসজিদটি শুধু জেলার মধ্যে নয়, সারা দেশের মধ্যে অনন্য একটি মসজিদ। যথার্থই এর নাম-ইসলামিক সংস্কৃতি ও সেবা কেন্দ্র। ইসলামিক বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিযোগিতা, মেডিকেল ও চক্ষু চিকিৎসা ক্যাম্পসহ বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে মসজিদটি। এ প্রসঙ্গে বলে রাখা দরকার- মসজিদ শুধু নামাজ পড়ার জন্য নয়, সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হওয়াও দরকার এখান থেকে।
সাবেক ফিফা এলিট রেফারি তৈয়ব হাসান বাবুর সঞ্চয়কৃত অর্থ দিয়ে মেহেদীবাগে মসজিদটির জায়গা কেনা হয়। পরে মসজিদটি প্রতিষ্ঠায় যাদের অবদান অনস্বীকার্য, জিএম নূর ইসলাম তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি আমৃত্যু মসজিদটির সভাপতি ছিলেন। এছাড়া জেলা নাগরিক অধিকার ও উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির মাধ্যমে তিনি বিশিষ্ট নাগরিকদের একই প্লাটফর্মে এনে সাতক্ষীরার উন্নয়নে সচেষ্ট ছিলেন।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবে সৃষ্ট অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার আগে-পরে ইসলাম ভাই আমাদের সাথে ছিলেন। এর আগে তাঁর সাথে অতটা নিবিড় সম্পর্ক আমার ছিল না। মাত্র ২ বছরে আমি তাঁর দৃঢ়তা দেখেছি। কথা ও কাজে তিনি এক কথার লোক- এমন নমুনা বহুবার দেখেছি। সাংবাদিকতার নামে অসদুপায় অবলম্বন- এমন নজির ইসলাম ভাইয়ের মধ্যে কখনো কেউ দেখে নি। অনেকে বলতেন- ইসলাম ভাই একগুয়ে মানুষ। আমার মনে হয়েছে-একগুয়েমিতার মধ্যে যদি সততা ও আদর্শ থাকে, তবে তা বহুরূপী মানুষের চেয়ে হাজারগুণ ভালো।
স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তাঁর মধ্যে খুবই অসহায়ত্ব দেখা যেত। মানসিক ও শারীরিকভাবে তিনি ভেঙে পড়েছিলেন। স্ত্রী সম্পর্কে তিনি প্রায়ই বলতেন- জীবিত থাকাকালে তাঁদের মধ্যে কোনোদিন মনোমালিন্য হয়নি।
বেঁচে থাকলে তিনি হয়ত সাতক্ষীরার উন্নয়নে আরও অবদান রাখতে পারতেন। কিন্তু সেটা আর হলো না। নিজ বাসভবনে প্রিয়তমা স্ত্রীর পাশে চিরদিনের জন্য সমাহিত হলেন তিনি।
আবুল কাসেম, গণমাধ্যম কর্মী
মন্তব্য করুন