
ডেস্ক রিপোর্ট: দীর্ঘদিনের কারাবাস, পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ নিয়ে অভিযোগ এবং স্বাস্থ্যগত উদ্বেগের মধ্যে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ও তাঁর স্ত্রী বুশরা বিবির জন্য বড় স্বস্তির খবর এসেছে। তাঁদের আর কোনো ধরনের নির্জন কারাবাসে রাখার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ইসলামাবাদ হাইকোর্ট (আইএইচসি)। একই সঙ্গে কারাগারের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী ইমরান খান ও বুশরা বিবির মধ্যে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করতে আদিয়ালা কারাগার কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
রায় ঘোষণার সময় ইসলামাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতি খাদিম হুসেন সুমরো কারাগার কর্তৃপক্ষকে ইমরান খানের পরিবারের সদস্যদের তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি তাঁর দুই ছেলের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার ব্যবস্থাও করতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ, কারাবন্দি থাকার কারণে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ থেকে তাঁকে বিচ্ছিন্ন রাখা যাবে না—আদালতের নির্দেশে এমন বিষয়টিই স্পষ্ট হয়েছে।
ইমরান খান ও বুশরা বিবি বর্তমানে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে দুর্নীতি ও সংশ্লিষ্ট মামলায় দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড ভোগ করছেন। পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খান ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে কারাগারে রয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে আনা বিভিন্ন অভিযোগকে তিনি ও তাঁর দল দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছেন।
ইমরান খানের কথিত নির্জন কারাবাসের বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হন তাঁর বোন আলিমা খান। অন্যদিকে, বুশরা বিবির মেয়ে মুবাশারা খাওয়ার মানেকা তাঁর মায়ের বিষয়ে পৃথক একটি পিটিশন দাখিল করেন। এসব আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই আদালত কারাগারে তাঁদের অবস্থান ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি নিয়ে নির্দেশনা দেয়।
আদালত শুধু সাক্ষাতের বিষয়েই নির্দেশ দেয়নি। ইমরান খান যাতে কারাগারে নিয়মিত সংবাদপত্র ও বই পান, সেটিও নিশ্চিত করতে আদিয়ালা কারাগার কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কারাগারের নিয়ম অনুযায়ী তাঁর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।
আদিয়ালা কারাগারের সুপারিনটেনডেন্টকে আদালতের নির্দেশনাগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নের বিষয়ে একটি সম্মতি প্রতিবেদন ১৫ দিনের মধ্যে জমা দিতে বলা হয়েছে।
ইমরান খান ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে কারাগারে রয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা বিভিন্ন মামলা এবং সেসব মামলায় সাজাকে ইমরান খান ও তাঁর রাজনৈতিক দল পিটিআই রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ফল হিসেবে বর্ণনা করে আসছে। তাঁর সমর্থক ও পরিবারের সদস্যরাও বিভিন্ন সময় অভিযোগ করেছেন, তাঁকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে পর্যাপ্ত সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধা নিয়েও সমস্যা রয়েছে।
তবে পাকিস্তান সরকার এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে ইমরান খানের কারাবাস, সাক্ষাৎ এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে কারাগারের নিয়ম ও নিরাপত্তাজনিত বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
বুশরা বিবিকে দুর্নীতি-সংক্রান্ত একটি মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর ২০২৪ সালের ৩১ জানুয়ারি প্রথমবার কারাগারে পাঠানো হয়। প্রায় নয় মাস কারাগারে থাকার পর একই বছরের ২৪ অক্টোবর তিনি জামিনে মুক্তি পান।
কিন্তু সেই মুক্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। দুর্নীতি-সংক্রান্ত আরেকটি মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর ২০২৫ সালের ১৭ জানুয়ারি তাঁকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তী সময়ে দুর্নীতি-সংক্রান্ত মামলায় অতিরিক্ত সাজা পাওয়ায় তিনি বর্তমানে ইমরান খানের সঙ্গে আদিয়ালা কারাগারেই আটক রয়েছেন।
কারাবন্দি ইমরান খানের স্বাস্থ্য নিয়েও তাঁর পরিবার ও সমর্থকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে চলতি বছরের শুরুতে তাঁর চোখের সমস্যা শনাক্ত হওয়ার পর তাঁকে উন্নত চিকিৎসা দেওয়ার দাবি জোরালো হয়।
গত মাসে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট ইমরান খানের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে সরকারকে তাঁকে বেসরকারি শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ দেয়। তাঁর পরিবার ও সমর্থকদের পক্ষ থেকে কয়েক মাস ধরেই তাঁর চিকিৎসা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছিল।
তবে ২০ থেকে ২১ আগস্টের মধ্যবর্তী রাতে ইমরান খানকে শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নেওয়ার পরিবর্তে রাষ্ট্রায়ত্ত পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেস (পিআইএমএস)-এ ভর্তি করা হয়। সেখানে তাঁর একটি চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পন্ন করার পাশাপাশি বিভিন্ন রোগ নির্ণয় পরীক্ষা করা হয়। চিকিৎসা ও পরীক্ষার পর তাঁকে আবার আদিয়ালা কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
ইমরান খানকে পিআইএমএসে নেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁর পরিবার আবারও আদালতের দ্বারস্থ হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়, তাঁকে শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালের পরিবর্তে পিআইএমএসে নেওয়ার সিদ্ধান্ত সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
পরিবারের দাবি, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ ছিল—আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর পরবর্তী শুনানি পর্যন্ত ইমরান খানকে ইসলামাবাদের একটি হাসপাতালে ভর্তি থাকতে হবে। সেই নির্দেশের পরও তাঁকে পিআইএমএসে নিয়ে যাওয়া এবং পরে আবার আদিয়ালা কারাগারে ফেরত পাঠানো আদালতের নির্দেশ লঙ্ঘনের শামিল।
অন্যদিকে পাকিস্তান সরকার ইমরান খানকে পিআইএমএসে নেওয়ার সিদ্ধান্তের পক্ষে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কথা তুলে ধরেছে। সরকারের বক্তব্য, তাঁর চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি বিবেচনা করেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ইমরান খানের স্বাস্থ্য ও আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন নিয়ে চলমান আইনি লড়াই এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। আদালত অবমাননার মামলার পরবর্তী শুনানি আগামী ১৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
বিচারপতি শহীদ ওয়াহিদ, নাঈম আখতার আফগান এবং ইশতিয়াক ইব্রাহিমকে নিয়ে গঠিত তিন সদস্যের বেঞ্চে এই মামলার শুনানি হবে। একই বেঞ্চে ইমরান খানের স্বাস্থ্য এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ সংক্রান্ত বিচারাধীন মামলাগুলোরও শুনানি নির্ধারিত রয়েছে।
এর আগে কারাগারে ইমরান খান ও বুশরা বিবির অবস্থান, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং চিকিৎসা নিয়ে যেসব অভিযোগ ও আইনি বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, আদালতের সর্বশেষ নির্দেশে সেগুলোর কয়েকটি বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান পাওয়া গেল। বিশেষ করে নির্জন কারাবাসে নিষেধাজ্ঞা, পরিবারের সদস্যদের সাক্ষাতের সুযোগ, ছেলেদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার ব্যবস্থা এবং নিয়ম অনুযায়ী চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করার নির্দেশ ইমরান খান ও তাঁর পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আইনি স্বস্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এনডিটিভি
মন্তব্য করুন