
ডেস্ক রিপোর্ট: আজ ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী।
দীর্ঘ চার যুগের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠে কখনো শাসক হিসেবে, কখনো রাজপথের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে ভূমিকা রেখেছে দলটি। ১৯৭৮ সালের এই দিনে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যে দলটির বীজ বপন করেছিলেন, কালের পরিক্রমায় তা আজ এক মহীরুহে পরিণত হয়েছে।
১৯৭৫ সালের পর বাংলাদেশে চরম সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করছিল। সেই ক্রান্তিলগ্নে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান। দেশের এই রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণ এবং সার্বভৌমত্ব সুসংহত করার লক্ষ্যে তিনি জাতীয়তাবাদী শক্তির ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।
প্রথমে ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে গঠিত হয় ‘জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল’ (জাগদল)। পরবর্তীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মতাদর্শের সমন্বয়ে গঠিত হয় ‘জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট’। এই ফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবেই জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালের ৩ জুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়লাভ করেন। এরপর জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষ্যে ১ সেপ্টেম্বর ১৯৭৮ সালের বিকেল ৫টায় রমনা গ্রিনে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপি গঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় গণতন্ত্র এবং মুক্তবাজার অর্থনীতিকে মূল ভিত্তি করে যাত্রা শুরু করে দলটি।
প্রতিষ্ঠালগ্নের সেই দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ‘৪৮ বছর আগে যে অঙ্গীকার ও ১৯ দফার প্রত্যয়ে দলটি গঠিত হয়েছিল, বিরোধী পক্ষ তখন তা সহজভাবে নিতে পারেনি। অনেকেই মন্তব্য করেছিল যে, এটি ক্ষমতার মধ্য থেকে তৈরি হওয়া সুবিধাবাদীদের দল। কিন্তু ঘটনা পরিক্রমায় আজ প্রমাণিত হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলই হচ্ছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায়বিচারের গ্যারান্টি।’
জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক ১৯ দফা
বিএনপির রাজনৈতিক ও সামাজিক দর্শনের মূল ভিত্তি ছিল শহীদ জিয়াউর রহমানের ঘোষিত ১৯ দফা কর্মসূচি। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক দলের ইশতেহার ছিল না, বরং তা ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পুনর্গঠনের দিকনির্দেশনা।
এই ১৯ দফার মূল নির্যাস ছিল ‘উৎপাদনমুখী রাজনীতি’। উল্লেখযোগ্য দফাগুলোর মধ্যে ছিল—সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা রক্ষা, শাসনতন্ত্রের চারটি মূলনীতি (সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ বিশ্বাস, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার) প্রতিফলিত করা, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করা এবং বেসরকারি খাতে শিল্পায়ন।
এই ১৯ দফার ওপর ভিত্তি করেই জিয়াউর রহমান ‘খাল কাটা কর্মসূচি’, ‘গণশিক্ষা কার্যক্রম’ এবং ‘পল্লী বিদ্যুতায়ন’-এর মতো যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন।
১৯ দফা থেকে তারেক রহমানের ৩১ দফা
সময়ের চাহিদায় বিএনপি তার রূপরেখা ও নীতিকে যুগোপযোগী করেছে। জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা ছিল সদ্য স্বাধীন দেশকে স্বনির্ভর করার ইশতেহার। পরবর্তীতে ২০১৭ সালে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ঘোষণা করেন ‘ভিশন ২০৩০’। আর বিগত দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনের ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশকে উদ্ধার করে একটি আধুনিক, বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্যে বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ২০২৩ সালে ঘোষণা করেন ‘৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কার রূপরেখা’।
৩১ দফার উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো: প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতার ভারসাম্য আনতে সংবিধান সংশোধন এবং পর পর দুই মেয়াদের বেশি কারও প্রধানমন্ত্রী না থাকা। সংসদে উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষ প্রতিষ্ঠা করা। গুম, খুন বন্ধ করা, বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনকে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা।
বিএনপির ৪৮ বছরের পথচলা
বিএনপির ৪৮ বছরের পথচলা কখনোই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। এর মধ্যে ছিল এরশাদের ৯ বছরের স্বৈরশাসন (১৯৮২-১৯৯০)। সামরিক স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি এক ইঞ্চিও আপস করেনি। বারবার গৃহবন্দি হওয়া এবং নানা লোভনীয় প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। শত শত নেতাকর্মীর রক্তের বিনিময়ে ১৯৯০ সালে এরশাদের পতন ঘটে।
আওয়ামী লীগের সবশেষ শাসনামলে (২০০৯-২০২৪) বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ও অন্ধকারতম ফ্যাসিবাদী অধ্যায়ের মুখোমুখি হয় বিএনপি। দলটির প্রায় ৬০ লাখ নেতাকর্মীর নামে দেড় লাখেরও বেশি ‘গায়েবি’ ও মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়। ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলমসহ শত শত নেতাকর্মীকে গুম করে ‘আয়নাঘর’-এর মতো গোপন বন্দিশালায় রাখা হয়। হাজারো নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়। দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে মিথ্যা মামলায় বছরের পর বছর কারাবন্দি করে রাখা হয়। তারেক রহমানকে মিথ্যা মামলায় সাজা দিয়ে নির্বাসনে থাকতে বাধ্য করা হয়।
এত নির্যাতন, জেল-জুলুমের পরও দলটি ভেঙে যায়নি। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পেছনে বিএনপির দীর্ঘ ১৫ বছরের অদম্য লড়াই সবচেয়ে বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে।
এ প্রসঙ্গে শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ‘এই দলটাই একমাত্র দল, যারা ক্ষমতায় যেমন গেছে তেমনি ক্ষমতার বাইরে এসে নিগৃহীত হয়েছে, হামলা-মামলা-গুমের শিকার হয়েছে। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া মিথ্যা মামলায় জেল খেটেছেন। শহীদ জিয়াউর রহমান গণতন্ত্রকে বিকশিত করেছিলেন, যা বাকশালের নামে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। এত চড়াই-উতরাইয়ের পরেও ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর প্রমাণিত হয়েছে, এ দেশের মানুষ বিএনপির প্রতিই সবচেয়ে বেশি আস্থা রাখে।’
১৯৭৮ থেকে ২০২৬: কতটা এগোল বিএনপি?
১৯৭৮ সালে যে দলকে ‘সেনানিবাসে জন্ম নেওয়া ক্ষমতার উচ্ছিষ্টভোগীদের দল’ বলা হতো, ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আজ প্রমাণিত যে বিএনপি বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের দল। মোট ২৬ বছরের বেশি সময় দলটি ক্ষমতার বাইরে থেকে রাজপথে সংগ্রাম করেছে। প্রতিটি আঘাতের পর ফিনিক্স পাখির মতো ভস্ম থেকে আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে এসেছে বিএনপি।
আগামী দিনের রাষ্ট্র পরিচালনার চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ‘বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। কারণ এখানে গণতন্ত্রবিরোধী শক্তি উৎখাত হলেও একটি পার্শ্ববর্তী দেশ, যারা গণতন্ত্রের কথা বলে কিন্তু ফ্যাসিজমকে বছরের পর বছর সমর্থন দিয়েছে এবং টিকিয়ে রেখেছিল, তারা এখনো সক্রিয়। তবে বাংলাদেশে গণতন্ত্র যতই চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হোক না কেন এ দেশের জনগণ তা রক্ষা করবে। আইনশৃঙ্খলা ও অর্থনৈতিক মুক্তির চ্যালেঞ্জ জনগণের সমর্থন নিয়েই বিএনপি এগিয়ে নেবে।’
ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল হক বলেছেন, শহীদ জিয়ার ১৯ দফার উৎপাদনমুখী দর্শন, বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন গণতান্ত্রিক সংগ্রাম এবং তারেক রহমানের ৩১ দফার রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা, এই তিনের সমন্বয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি আগামী দিনের সুখী, সমৃদ্ধ, বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করবে।
মন্তব্য করুন