
বাংলাদেশের অর্থনীতির দুটি বড় শক্তি তৈরি পোশাকশিল্প ও প্রবাসী আয়। একটি আন্তর্জাতিক বাজারে শ্রম ও উৎপাদনশীলতার বিনিময়ে রপ্তানি আয় এনে দেয়, অন্যটি প্রবাসে কর্মরত মানুষের শ্রমের ফসল হিসেবে বৈদেশিক মুদ্রার জোগান বাড়ায়। কিন্তু বৈশ্বিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা, উৎপাদন ব্যয়ের চাপ, কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের পরিবর্তন আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরছে। অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিকে আরও স্থিতিশীল করতে নতুন কোন খাতকে শক্তিশালী করা যায়? বাংলাদেশের প্রকৃতি, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও মানুষের সেবাদক্ষতার দিকে তাকালে পর্যটনকে সম্ভাবনাময় উত্তর হিসেবে বিবেচনা করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
পর্যটনকে পোশাকশিল্প বা প্রবাসী আয়ের তাৎক্ষণিক বিকল্প ভাবা বাস্তবসম্মত নয়। তৈরি পোশাকশিল্পের প্রতিষ্ঠিত রপ্তানি অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক ক্রেতা নেটওয়ার্ক এবং প্রবাসী আয়ের বিশাল প্রবাহের সমপর্যায়ে যেতে পর্যটনকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে এগোতে হবে। তবে এই খাতকে অর্থনীতির তৃতীয় বড় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী স্তম্ভে পরিণত করার সম্ভাবনা উপেক্ষা করাও হবে দূরদর্শিতার অভাব। কারণ পর্যটন এমন একটি সেবা রপ্তানি, যার উৎপাদন দেশের ভেতরে হয়, কিন্তু ভোক্তা হিসেবে বিদেশি পর্যটক এসে সেই সেবার মূল্য পরিশোধ করেন।
আন্তর্জাতিক পর্যটনে একজন বিদেশি ভ্রমণকারীর হোটেল ভাড়া, খাবার, পরিবহন, গাইড, প্রবেশ টিকিট, সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা ও কেনাকাটার ব্যয় বাংলাদেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস হতে পারে। তৈরি পোশাক রপ্তানিতে পণ্য বিদেশে পাঠানো হয়, আর পর্যটনে দেশের সেবা, সংস্কৃতি ও অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে যায় পর্যটকের আগমনের মাধ্যমে। অর্থনীতির ভাষায়, এটি সেবা রপ্তানির এমন এক মডেল, যেখানে পর্যটকের ব্যয় সরাসরি স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রবেশ করতে পারে।
বিশ্ব পর্যটন অর্থনীতির ব্যাপ্তি এই সম্ভাবনার গুরুত্ব বোঝায়। জাতিসংঘের বিশ্ব পর্যটন সংস্থার হিসাবে, ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক পর্যটন থেকে বৈশ্বিক আয় আনুমানিক ১ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। যাত্রী পরিবহনসহ পর্যটনসংশ্লিষ্ট মোট রপ্তানি আয় প্রায় ২ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ পর্যটন আর কেবল অবকাশযাপনের বিষয় নয়; এটি বৈদেশিক মুদ্রা, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও সেবা বাণিজ্যের বড় অর্থনৈতিক ক্ষেত্র।
বাংলাদেশের রয়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত হিসেবে পরিচিত কক্সবাজার, সুন্দরবনের মতো অনন্য ম্যানগ্রোভ বন, সেন্ট মার্টিন, পার্বত্য অঞ্চলের বৈচিত্র্যময় ভূপ্রকৃতি, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, নদীমাতৃক জনপদ এবং সমৃদ্ধ লোকজ সংস্কৃতি। এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে স্থানীয় খাদ্য, গ্রামীণ জীবন, নৌভ্রমণ, পাখি দেখা, ঐতিহ্যভিত্তিক ভ্রমণ এবং কমিউনিটি পর্যটন। কিন্তু সম্পদ থাকা আর সেই সম্পদ থেকে আয় তৈরি করা এক বিষয় নয়। অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নেয় তখনই, যখন আকর্ষণকে মানসম্মত পণ্য ও সেবায় রূপান্তর করা যায়।
এখানে বাংলাদেশের বড় দুর্বলতা পর্যটনসম্পদের অভাব নয়, বরং পর্যটন অর্থনীতির অসম্পূর্ণ মূল্যশৃঙ্খল। অনেক গন্তব্যে নিরাপদ পরিবহন, পরিচ্ছন্ন শৌচাগার, মানসম্মত আবাসন, নির্ভরযোগ্য তথ্য, প্রশিক্ষিত গাইড, ডিজিটাল বুকিং ও জরুরি সহায়তার ঘাটতি রয়েছে। পর্যটক হয়রানি, অতিরিক্ত মূল্য আদায়, প্রতারণা কিংবা নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কাও ভ্রমণের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। এসব সমস্যা শুধু পর্যটকের অসুবিধা নয়; এগুলো বিনিয়োগের ঝুঁকি বাড়ায়, ব্যবসার আয় কমায় এবং দেশের গন্তব্য ভাবমূর্তিকে দুর্বল করে। নিরাপত্তা তাই পর্যটনের অতিরিক্ত সুবিধা নয়, অর্থনৈতিক অবকাঠামোর অপরিহার্য অংশ।
বাংলাদেশে বিদেশি দর্শনার্থীর আগমনের সাম্প্রতিক প্রবণতাও সতর্ক হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিদেশি দর্শনার্থীর সংখ্যা ছিল ৬ লাখ ৩৩ হাজার ৯৪ জন, যা ২০২৫ সালে কমে ৫ লাখ ৮৫ হাজার ১৪৫ জনে দাঁড়ায়। তবে এ ধরনের পরিসংখ্যানে অবকাশযাপনকারী পর্যটকের পাশাপাশি ব্যবসা ও অন্যান্য প্রয়োজনে আসা দর্শনার্থীও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারেন। তাই পর্যটনের প্রকৃত অর্থনৈতিক অবদান বুঝতে শুধু আগমনের সংখ্যা নয়, পর্যটকের গড় ব্যয়, অবস্থানকাল, স্থানীয় কেনাকাটা এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নির্ভরযোগ্য হিসাব প্রয়োজন।
পর্যটনকে অর্থনীতির শক্তিতে পরিণত করতে প্রথমেই প্রয়োজন নিরাপত্তা ও আস্থার অর্থনীতি গড়ে তোলা। প্রতিটি প্রধান গন্তব্যে যাচাইকৃত গাইড ও পরিবহনসেবার তালিকা, প্রকাশ্য মূল্যতালিকা, জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা এবং ডিজিটাল অভিযোগ নিষ্পত্তি চালু করা যেতে পারে। একটি কিউআর কোড স্ক্যান করে পর্যটক সেবাদাতার পরিচয়, নির্ধারিত ভাড়া ও জরুরি সহায়তার তথ্য জানতে পারবেন। এর ফলে প্রতারণার সুযোগ কমবে, সেবার মান সম্পর্কে জবাবদিহি বাড়বে এবং বৈধ ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় সুবিধা পাবেন। পর্যটকের আস্থা বাড়লে বেসরকারি বিনিয়োগের ঝুঁকিও কমতে পারে।
দ্বিতীয়ত, পর্যটনের আয় স্থানীয় অর্থনীতিতে ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। একজন পর্যটক হোটেলে অর্থ ব্যয় করলেন, কিন্তু হোটেল যদি স্থানীয় কৃষক, মৎস্যজীবী, খাদ্য উৎপাদক ও কারুশিল্পীদের কাছ থেকে পণ্য না কেনে, তাহলে সেই ব্যয়ের বড় অংশ স্থানীয় মানুষের কাছে পৌঁছাবে না। তাই হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁর সঙ্গে স্থানীয় উৎপাদকদের ডিজিটাল সরবরাহ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা যেতে পারে। সুন্দরবনসংলগ্ন জনপদ, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, কক্সবাজার ও অন্যান্য পর্যটন এলাকায় স্থানীয় খাবার, হস্তশিল্প, নৌভ্রমণ, গ্রামীণ আবাসন এবং সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতাকে বাজারজাত করলে পর্যটকের ব্যয় থেকে স্থানীয় মূল্য সংযোজন বাড়বে। অর্থনীতিতে এর অর্থ হলো একই ব্যয়ের মাধ্যমে একাধিক পর্যায়ে আয় ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
তৃতীয়ত, ক্ষুদ্র পর্যটন উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের নতুন পথ প্রয়োজন। গ্রামীণ হোমস্টে, পরিবেশবান্ধব নৌযান, স্থানীয় গাইড সেবা কিংবা নারী উদ্যোক্তার খাদ্য ব্যবসার সম্ভাবনা থাকলেও অনেকের পর্যাপ্ত জামানত নেই। তাঁদের জন্য বুকিং, ডিজিটাল লেনদেন ও নগদ প্রবাহের তথ্যের ভিত্তিতে ঋণ মূল্যায়ন করা যেতে পারে। পাশাপাশি ফলাফলভিত্তিক পর্যটন বিনিয়োগ তহবিল গঠন করা সম্ভব, যেখানে অর্থ বরাদ্দের সাফল্য শুধু অবকাঠামো নির্মাণ দিয়ে নয়, স্থানীয় কর্মসংস্থান, পর্যটকের অবস্থানকাল, পরিবেশ সংরক্ষণ ও ব্যবসায়িক আয়ের ভিত্তিতে পরিমাপ করা হবে।
চতুর্থত, পর্যটন অর্থনীতির নির্ভরযোগ্য হিসাব তৈরি করতে হবে। একটি জাতীয় পর্যটন অর্থনৈতিক ড্যাশবোর্ডে দর্শনার্থীর ধরন, গড় ব্যয়, অবস্থানকাল, কর্মসংস্থান, স্থানীয় মূল্য সংযোজন, বিনিয়োগ ও পরিবেশগত প্রভাবের তথ্য সমন্বিতভাবে প্রকাশ করা যেতে পারে। এতে কোন গন্তব্যে বিনিয়োগের সম্ভাবনা বেশি, কোথায় পর্যটকের ব্যয় স্থানীয় আয়ে রূপান্তরিত হচ্ছে না এবং কোন বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা রয়েছে, তা বোঝা সহজ হবে। নীতি তখন অনুমাননির্ভর না হয়ে তথ্যনির্ভর হবে।
দক্ষ মানবসম্পদ ছাড়া এই সম্ভাবনা পূরণ হবে না। হোটেল ব্যবস্থাপনা, খাদ্য উৎপাদন, হাউসকিপিং, ফ্রন্ট অফিস, বিদেশি ভাষা, ডিজিটাল বিপণন ও পর্যটন নিরাপত্তায় প্রশিক্ষিত কর্মী তৈরি করতে হবে। কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং পর্যটন শিল্পের মধ্যে কার্যকর অংশীদারত্ব গড়ে উঠলে তরুণেরা দেশে কর্মসংস্থান পাবেন, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারেও দক্ষতার ভিত্তিতে কাজের পথ তৈরি হবে। একই সঙ্গে পর্যটন গন্তব্যের ধারণক্ষমতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে, কারণ প্রাকৃতিক সম্পদ নষ্ট করে অর্জিত আয় দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।
পোশাকশিল্প ও প্রবাসী আয় বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তিকে শক্তিশালী করেছে। এখন প্রয়োজন সেই ভিত্তির ওপর আরও বৈচিত্র্যময় অর্থনৈতিক কাঠামো নির্মাণ। পর্যটন রাতারাতি এই দুই খাতের জায়গা নেবে না, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টি, নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ এবং আঞ্চলিক কর্মসংস্থানের একটি বড় নতুন উৎস হতে পারে। শর্ত একটাই, পর্যটনকে বিচ্ছিন্ন প্রচার কার্যক্রম হিসেবে না দেখে উৎপাদন, বিনিয়োগ, রপ্তানি, দক্ষতা ও স্থানীয় মূল্য সংযোজনের সমন্বিত অর্থনৈতিক খাত হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
বাংলাদেশের সামনে তাই প্রশ্নটি পর্যটন সম্ভাবনা আছে কি না, তা নয়; প্রশ্ন হলো, সেই সম্ভাবনাকে আয়, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রায় রূপান্তরের জন্য আমরা কতটা প্রস্তুত। পোশাকশিল্প আমাদের উৎপাদনের শক্তি দেখিয়েছে, প্রবাসী আয় দেখিয়েছে বৈশ্বিক শ্রমবাজারের গুরুত্ব। পর্যটন দেখাতে পারে, একটি দেশের প্রকৃতি, সংস্কৃতি, আতিথেয়তা ও দক্ষতাও আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবান অর্থনৈতিক সম্পদ। এই সম্পদকে পরিকল্পিত বিনিয়োগ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনায় কাজে লাগাতে পারলে পর্যটন বাংলাদেশের অর্থনীতির নতুন শক্তি হয়ে উঠতে পারে।
লেখক: বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ , সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট
মন্তব্য করুন