
চায়ের দোকান থেকে পাড়া-মহল্লার আড্ডায় প্রায়ই শোনা যায়, ‘আগে ভালো ছিলাম।’ কথাটি শুধু অতীতের প্রতি আবেগ কিংবা রাজনৈতিক পক্ষপাতের প্রকাশ নয়, এর পেছনে থাকতে পারে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নানা সংকট। অতীতের সবকিছু ভালো ছিল, এমন নয়। তবে মানুষ কেন বর্তমানের সঙ্গে অতীতের তুলনা করছে, তা গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
দ্রব্যমূল্যের চাপে সাধারণ মানুষের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে। চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস ও সবজির দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন দিনমজুর, নিম্ন আয়ের মানুষ ও সীমিত বেতনের চাকরিজীবীরা। আয় না বাড়লেও ব্যয় বাড়ছে। ফলে খাবার, চিকিৎসা ও সন্তানের পড়াশোনার খরচ মেটাতে অনেক পরিবারকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
অন্যদিকে নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) ২০২৬ সালের জুলাই–সেপ্টেম্বর প্রতিবেদনে ২৫৩ জন নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১৫৪ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক। এমন পরিস্থিতিতে অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত, ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। অপরাধী যে-ই হোক, আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
জননিরাপত্তার আরেকটি বড় উদ্বেগ গণপিটুনি। এইচআরএসএসের একই প্রতিবেদনে তিন মাসে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ১৩৭টি ঘটনায় ৫৪ জন নিহত এবং ১৪৫ জন আহত হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। অপরাধের অভিযোগ উঠলেই কাউকে পিটিয়ে হত্যা করা কোনোভাবেই ন্যায়বিচার হতে পারে না। গুজব কিংবা সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার জনতার নেই। অপরাধের বিচার হতে হবে তদন্ত, প্রমাণ ও আইনানুগ প্রক্রিয়ায়। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্রুত পদক্ষেপ এবং জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
‘আগে ভালো ছিলাম’—এই কথাকে রাজনৈতিক বিতর্কে সীমাবদ্ধ না রেখে জনজীবনের বাস্তবতা বোঝার উপলক্ষ হিসেবে দেখা উচিত। মানুষের আক্ষেপের পেছনে যদি দ্রব্যমূল্যের চাপ, নিরাপত্তাহীনতা ও ন্যায়বিচার নিয়ে উদ্বেগ থাকে, তাহলে সেসব সমস্যার সমাধানেই গুরুত্ব দিতে হবে।
রাষ্ট্রের সাফল্য শুধু উন্নয়নের পরিসংখ্যানে নয়, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়ও প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন। মানুষ কতটা স্বস্তিতে সংসার চালাতে পারছে, নারী ও শিশুরা কতটা নিরাপদ এবং নাগরিকেরা কতটা আস্থা নিয়ে বিচার পাচ্ছে—এসবই রাষ্ট্রের সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। মানুষের দীর্ঘশ্বাসকে অবহেলা না করে তার কারণ খুঁজে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়াই হোক রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা
(মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন)
মন্তব্য করুন