
লালন সাঁই গেয়েছিলেন, বাড়ির কাছে আরশিনগর, সেথায় এক পড়শি বসত করে। এই বাংলা সত্যিই এমন এক আরশিনগর, যার সৌন্দর্য আমাদের উঠোনেই ছড়িয়ে আছে, অথচ যার ঠিকানা আমরা এখনো ভালো করে সাজাতে পারিনি। ভ্রমণ আর আতিথেয়তা এ মাটিতে নতুন কিছু নয়। হাজার বছরের পথ বেয়ে আজকের বাংলাদেশে এলে দেখা যায়, পর্যটনের শিকড় আমাদের ইতিহাসের গভীরেই প্রোথিত।
প্রাচীন বঙ্গ: নদী, বন্দর আর তীর্থের পথ
বাংলার ইতিহাস মূলত নদী আর বন্দরের ইতিহাস। প্রাচীনকালে তাম্রলিপ্ত বন্দর থেকে বণিকেরা পাল তুলে যেতেন সিংহল ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায়। চীনা পরিব্রাজক ফা হিয়েন ও হিউয়েন সাং এ অঞ্চলের বিহার ও জনপদের বিবরণ রেখে গেছেন। বগুড়ার মহাস্থানগড় ছিল প্রাচীন পুন্ড্রনগরের কেন্দ্র, আর পাহাড়পুরের সোমপুর মহাবিহার ও ময়নামতির বৌদ্ধবিহার ছিল তীর্থযাত্রা ও জ্ঞানচর্চার তীর্থভূমি। আজকের পর্যটনের ভাষায় একে বলা যায় তীর্থ ও ঐতিহ্য পর্যটনের আদিরূপ। সাহিত্যেও এর ছাপ স্পষ্ট। চর্যাপদে নৌকা, নদী আর ঘাটের ছবি মেলে, মঙ্গলকাব্যে চাঁদ সওদাগরের সপ্তডিঙা আর বেহুলার ভেলা মনে করিয়ে দেয়, ভ্রমণ ও বাণিজ্য এই মাটির মজ্জায় মিশে আছে।
সুলতানি আমল: পরিব্রাজকের চোখে বাংলা
চতুর্দশ শতকে মরক্কোর পরিব্রাজক ইবনে বতুতা সোনারগাঁও হয়ে সিলেটে পৌঁছেছিলেন সুফি সাধক শাহজালালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। তাঁর বিবরণে বাংলার প্রাচুর্য আর সস্তা দরের কথা আছে, আবার পথের কষ্টের কথাও। কথিত আছে, তিনি এ দেশকে বলেছিলেন প্রাচুর্যে ভরা নরক। সেদিনের সেই দ্বৈততা আজও আমাদের পিছু ছাড়েনি: সম্পদ আছে, কিন্তু পথ ও পরিষেবা অগোছালো। মার্কো পোলোর বিবরণ যেমন ইউরোপকে এশিয়ার দিকে টেনেছিল, বতুতার ভ্রমণকাহিনি তেমনি মুসলিম বিশ্বে বাংলার খ্যাতি ছড়িয়েছিল। পর্যটন চিরকালই শুরু হয় গল্প থেকে।
পঞ্চদশ শতকে চীনা দূত মা হুয়ান বাংলার বন্দর ও বস্ত্রবাজারের বিবরণ লিখে গেছেন। ইলিয়াস শাহি ও হোসেন শাহি আমলে গৌড় ও পাণ্ডুয়ায় গড়ে উঠল আদিনা মসজিদ ও ছোট সোনা মসজিদ। খান জাহান আলীর হাতে সুন্দরবনের কোল ঘেঁষা বাগেরহাটে গড়ে উঠল ষাট গম্বুজ মসজিদ, যা আজও ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় আছে।
শেরশাহ ও মুঘল আমল: পথ, রাজধানী আর মসলিন
ষোড়শ শতকে শেরশাহ সুরি মাত্র পাঁচ বছরের শাসনে সোনারগাঁও থেকে পেশোয়ার পর্যন্ত যে সড়ক গড়ে তুলেছিলেন, ইতিহাসে তা গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড নামে অমর। পথের ধারে সরাইখানা, কূপ, ছায়াঘেরা গাছ আর ডাকচৌকি বসিয়ে তিনি যা গড়েছিলেন, তা ছিল একটি সংযোগ অবকাঠামো। বাণিজ্যের খরচ কমল, বাজার বাড়ল, পথিক পেল নিরাপত্তা। পথ যত নিরাপদ ও আতিথ্যময়, জনপদের অর্থনীতি তত প্রাণবন্ত, পর্যটনের এই মৌলিক পাঠ আমাদের মাটিতেই লেখা।
মুঘল আমলে ঢাকা হলো সুবাহ বাংলার রাজধানী, নাম জাহাঙ্গীরনগর। বুড়িগঙ্গার তীরে গড়ে উঠল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্র, লালবাগ কেল্লা আর বড় কাটরা। এ যুগের সবচেয়ে বড় বিস্ময় ঢাকাই মসলিন, যাকে বলা হতো বোনা বাতাস। লোককথায় প্রচলিত, একটি পুরো শাড়ি নাকি আংটির ভেতর দিয়ে গলে যেত। তুলাচাষি থেকে বণিক পর্যন্ত যে শৃঙ্খল রোম, পারস্য ও ইউরোপের বাজার ছুঁয়েছিল, আধুনিক ভাষায় তা ছিল রপ্তানিমুখী মূল্যশৃঙ্খল। সেদিন পণ্যই ছিল গন্তব্যের ব্র্যান্ড। আজ জামদানি ভৌগোলিক নির্দেশক স্বীকৃতি পেয়েছে, ইউনেসকোর অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকাতেও স্থান পেয়েছে। ফ্রান্সের শ্যাম্পেইন বা ইতালির পারমা যেমন পণ্যকে গন্তব্যে রূপ দিয়েছে, আমাদের তাঁতপল্লিও তেমন হতে পারে।
ঔপনিবেশিক কাল: ছেদ আর সাহিত্যের নবদৃষ্টি
ঔপনিবেশিক শাসনে মসলিনের শিল্প ধ্বংস হলো, সম্পদ চলে গেল সাত সমুদ্র পারে। কিন্তু এই সময়েই বাংলা সাহিত্য নতুন করে আবিষ্কার করল গ্রামকে। রবীন্দ্রনাথ আক্ষেপ করলেন, দেশ দেখা হয়নি, কারণ ঘর থেকে দুই পা ফেলে একটি ধানের শিষের ওপর একটি শিশিরবিন্দু দেখার অবসর মেলেনি। বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালীতে কাশবনের ভেতর দিয়ে অপু আর দুর্গার রেলগাড়ি দেখার বিস্ময় আসলে গ্রামীণ প্রকৃতির এক অমলিন পর্যটনদৃষ্টি। জীবনানন্দ দাশ লিখলেন, বাংলার মুখ দেখে তিনি পৃথিবীর রূপ খুঁজতে যান না, আর আবার আসিব ফিরে এই বাংলায়। এই কণ্ঠগুলো একই কথা বলে: আমাদের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ঘরের কাছেই।
স্বাধীন বাংলাদেশ: সম্ভাবনা ও ব্যবধান
স্বাধীনতার পর দীর্ঘদিন পর্যটন নীতিনির্ধারণের প্রান্তেই ছিল। অথচ এই ছোট ভূখণ্ডে বৈচিত্র্য বিস্ময়কর। কক্সবাজারের প্রায় ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সৈকত বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন সৈকতগুলোর একটি। আছে সেন্ট মার্টিনের প্রবাল দ্বীপ, কুয়াকাটার সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত, বান্দরবান ও রাঙামাটির পাহাড় আর হ্রদ, সিলেটের চা বাগান, জাফলংয়ের ঝরনা, রাতারগুলের জলে ডোবা বন, সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জের হাওরের বর্ষা, আছে পানাম নগর ও পুরান ঢাকার ঐতিহ্য আর আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বর্ণিল উৎসব।
তবু হিসাবটা ম্লান। জিডিপিতে পর্যটনের অবদান প্রায় ৩ থেকে ৪ শতাংশ, যেখানে বিশ্বের গড় প্রায় ১০ শতাংশ। সরকারি হিসাবে এ খাতে প্রায় ৫১ দশমিক ৯ লাখ মানুষ কাজ করছেন। ২০৩০ সালের মধ্যে এ সংখ্যা ৭২ দশমিক ৮ লাখে পৌঁছানোর সম্ভাবনা আছে, আর ২০৪০ সালের মধ্যে ২ দশমিক ১৯ কোটি কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। অর্থনীতিবিদেরা পর্যটনকে বলেন অদৃশ্য রপ্তানি, কারণ ক্রেতা নিজেই এসে নিজের টাকা খরচ করেন। এই টাকার গুণক প্রভাব বিপুল। সুন্দরবনসংলগ্ন ১৫টি রিসোর্টের ১৫৩ জন কর্মীর ১৩৫ জনই স্থানীয়, প্রায় ৮৮ শতাংশ, আর গড়ে উঠেছে ৫৮টি ক্ষুদ্র ব্যবসা। তবে খাবার, আসবাব বা কর্মী বাইরে থেকে এলে মুনাফা গ্রামে থাকে না, একে বলা হয় অর্থনৈতিক ক্ষরণ। আফ্রিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের অনেক বিলাসী রিসোর্ট এই অভিযোগের মুখে পড়েছে।
সুন্দরবন: সংরক্ষণের শর্তে সমৃদ্ধি
এই মানচিত্রের মাঝখানে সুন্দরবন এক অনন্য মুকুট। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন ১৯৯৭ সালে ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে। রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ আর অজস্র পাখির এই আবাস লক্ষাধিক মানুষের জীবিকারও ভরসা। বনবিবির লোকগাথা আর দক্ষিণ রায়ের পালা এখানকার লোকসংস্কৃতির জীবন্ত অধ্যায়। সাতক্ষীরায় কর্মরত একজন শিক্ষক হিসেবে আমি দেখি, শ্যামনগর ও কালীগঞ্জের মানুষ কপোতাক্ষ আর ইছামতীর তীরে একদিকে প্রতাপাদিত্যের যশোরেশ্বরী মন্দিরের ইতিহাস বয়ে বেড়ায়, অন্যদিকে লোনা পানি আর ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে প্রতিদিন লড়ে। সুন্দরবন তাঁদের কাছে ঢাল, আবার রুটিও।
তাই এই বনের পর্যটন গড়তে হবে প্রথমে সংরক্ষণের শর্তে, তারপর আয়ের লোভে। কোনো গন্তব্য প্রকৃতির ক্ষতি না করে কত পর্যটক সামলাতে পারে, তার বিজ্ঞানসম্মত হিসাব না থাকলে উন্নয়ন ধ্বংসের আরেক নাম হয়ে দাঁড়ায়। ভেনিস ও বার্সেলোনা দেখিয়েছে, অতিপর্যটন বাসিন্দাদের নিজের শহরেই পরবাসী করে তোলে। মার্ক টোয়েন বলেছিলেন, ভ্রমণ কুসংস্কার ও সংকীর্ণ মানসিকতার প্রাণঘাতী শত্রু। কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন ভ্রমণ যে গন্তব্যের আত্মাকেই ক্ষয় করে, সে সতর্কতাও মনে রাখতে হবে। ভুটান পর্যটকের সংখ্যা সীমিত রেখে প্রতি রাতের জন্য টেকসই উন্নয়ন ফি নেয়। কোস্টারিকা বনসংরক্ষণকারীকে পরিবেশ সেবার মূল্য দিয়ে ইকোট্যুরিজমকে জাতীয় ব্র্যান্ডে পরিণত করেছে। রুয়ান্ডা গরিলা পর্যটনের পারমিট আয়ের একটি অংশ বনসংলগ্ন মানুষের উন্নয়নে ব্যয় করে। সুন্দরবনের জন্যও চাই তেমন একটি সংরক্ষণ ফি, যার হিসাব রাখবে স্থানীয় কমিটি।
আগামীর পথ: অভিজ্ঞতা, দক্ষতা আর ডিজিটাল সংযোগ
জোসেফ পাইন ও জেমস গিলমোর দেখিয়েছেন, আধুনিক ভোক্তা পণ্য নয়, কেনেন স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। বাংলাদেশের হাতে সেই অভিজ্ঞতার ভান্ডার অফুরন্ত: বাউলগান, পালাকীর্তন, যাত্রা, নবান্ন, পৌষপার্বণের পিঠা, বৈশাখী মেলা, নৌকাবাইচ, নকশিকাঁথা, শীতলপাটি। কুষ্টিয়া হতে পারে বাউল ও লালন সাধনার তীর্থ, কিশোরগঞ্জ ও ময়মনসিংহ লোকসংগীত আর হাওরজীবনের আঙিনা, সিলেট চা ও পাহাড়ের জনপদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম আদিবাসী সংস্কৃতির মিলনক্ষেত্র, কক্সবাজার ও কুয়াকাটা সাগরপর্যটনের কেন্দ্র, আর খুলনা ও সাতক্ষীরা সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার।
জাপানের ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রোডাক্ট আন্দোলন দেখিয়েছে, প্রতিটি জনপদ একটি স্বাক্ষর পণ্য নিয়ে গর্ব করলে গ্রামই হয়ে ওঠে গন্তব্য। ভারতের কেরালা হোটেল শিল্পকে স্থানীয় কৃষক ও নারী উদ্যোক্তাদের সঙ্গে যুক্ত করে পর্যটনের আয় গ্রামে ধরে রাখছে। নেপালের হোমস্টে মডেল প্রমাণ করেছে, একটি সাধারণ গ্রামের ঘরও পর্যটন উদ্যোক্তা হতে পারে। স্পেনের কামিনো দে সান্তিয়াগো এক পুরোনো তীর্থপথকে হাজারো গ্রামের জীবিকার ভিত্তি করেছে। আমাদের শেরশাহি পথ, লালনের আখড়া আর সুন্দরবনের নদীপথও হতে পারে তেমন সাংস্কৃতিক করিডর।
প্রাচীন বাণী বলে, অতিথি দেবো ভব। অতিথিকে সম্মান করার ঐতিহ্য আমাদের আছে, কিন্তু ঐতিহ্য একা যথেষ্ট নয়, চাই পেশাদার দক্ষতা। পলিটেকনিকে আমরা প্রতিদিন দেখি, গ্রামের তরুণ ও তরুণীরা সুযোগ পেলে অসাধারণ পেশাদার হয়ে ওঠে। সনদভিত্তিক ও নারীবান্ধব প্রশিক্ষণ, প্রতিটি গ্রামের জন্য ডিজিটাল পর্যটন পাসপোর্ট, বুকিং ও পারমিটের একটি অ্যাপ, পলিটেকনিকের শিক্ষার্থীদের স্থানীয় হোমস্টে ও রিসোর্টে ইন্টার্নশিপ, এসবই হতে পারে সেই সুযোগ তৈরির পথ।
শেষ কথা
তাম্রলিপ্তের বন্দর থেকে শেরশাহের সরাই, মসলিনের তাঁত থেকে সুন্দরবনের নদীপথ, আর সেখান থেকে আজকের ডিজিটাল বুকিং, এই যাত্রা একই সুতোয় গাঁথা। যে জনপদ পথিককে সম্মান করে, সে জনপদ সমৃদ্ধ হয়। বাংলাদেশের পর্যটনকে হতে হবে প্রকৃতিনির্ভর, মানুষকেন্দ্রিক ও সংস্কৃতিভিত্তিক। গ্রামকে শ্রমিক জোগানের কারখানা না বানিয়ে পর্যটনের মালিক ও উপকারভোগী করতে হবে। জীবনানন্দের সেই আকুতি, আবার আসিব ফিরে এই বাংলায়, যেদিন প্রতিটি পর্যটকের মুখে শোনা যাবে, সেদিনই আমরা বলতে পারব, আরশিনগরের পথ আমরা খুঁজে পেয়েছি।
লেখক: বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ,সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।
মন্তব্য করুন