
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত আজ আর কোনো দূরবর্তী আশংকা নয়। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের মানুষের কাছে এটি প্রতিদিনের বাস্তবতা। সাতক্ষীরার শ্যামনগরের কোনো নারী যখন নিরাপদ পানির সন্ধানে দূরের পথ পাড়ি দেন, কোনো কৃষক যখন লবণাক্ততার কারণে জমিতে ফসল ফলাতে হিমশিম খান, কিংবা কোনো জেলে যখন দুর্যোগের আশংকা নিয়ে নদীতে জীবিকার সন্ধানে যান, তখন জলবায়ু পরিবর্তনের পরিসংখ্যান বাস্তব জীবনের গল্প হয়ে ওঠে। অথচ এই মানুষগুলোর জীবন ও জীবিকার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় তাঁদের কণ্ঠ কতটা গুরুত্ব পায়, সেই প্রশ্নটি থেকেই যায়।
আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের আনতালিয়ায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সম্মেলন কপ৩১।
বিশ্বনেতা, সরকারি প্রতিনিধি, বিজ্ঞানী, উন্নয়ন সহযোগী, পরিবেশকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা এই সম্মেলনে জলবায়ু সংকট মোকাবিলার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করবেন।
জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, নির্গমন হ্রাস এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনায় আসবে। কিন্তু এই আয়োজনকে ঘিরে একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করা প্রয়োজন, যাঁরা জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি, আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনে তাঁদের উপস্থিতি ও অংশগ্রহণ কতটা অর্থবহ?
উপস্থিতি আর অংশগ্রহণ কি এক? আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের সরকারি প্রতিনিধি ছাড়াও পরিবেশবাদী সংগঠন, তরুণ, নারী, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, গবেষক এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক কাঠামো সনদের অধীনে স্বীকৃত পর্যবেক্ষক সংগঠনগুলো সম্মেলনের বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়।
তবে সম্মেলনে উপস্থিত থাকা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় সরাসরি ভূমিকা রাখার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।আনুষ্ঠানিক আন্তরাষ্ট্রীয় আলোচনা মূলত অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর প্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বিভিন্ন অধিবেশন পর্যবেক্ষণ, মতামত উপস্থাপন, প্রচারণা, সংলাপ এবং নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ পেতে পারেন। কিন্তু তাঁদের প্রত্যেকের বক্তব্য যে সরাসরি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে প্রতিফলিত হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। এখানেই প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যাঁরা বসতভিটা হারাচ্ছেন, যাঁদের কৃষিজমি লবণাক্ততায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যাঁরা জীবিকা হারিয়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন কিংবা যাঁদের নিরাপদ পানির অধিকার প্রতিনিয়ত সংকুচিত হচ্ছে, তাঁদের বাস্তব অভিজ্ঞতা কি সিদ্ধান্ত গ্রহণের আলোচনায় যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে? নাকি তাঁদের সংকটের কথা অন্য কেউ তুলে ধরছেন, অথচ তাঁরা নিজেরাই সেই আলোচনার প্রান্তে থেকে যাচ্ছেন?
আরেকটি বড় সমস্যা অংশগ্রহণের পথে আর্থিক ও কাঠামোগত বাধা। আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে অর্থ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। আন্তর্জাতিক যাতায়াত, আবাসন, ভিসা, নিবন্ধন-সংক্রান্ত প্রস্তুতি এবং দীর্ঘ সময় অবস্থানের ব্যয় অনেক তৃণমূল সংগঠন ও সীমিত সম্পদের অধিকারী প্রতিনিধির জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সম্মেলনে অংশগ্রহণের অনুমতি পেলেও প্রয়োজনীয় অর্থায়ন না থাকলে অনেকের পক্ষে সেখানে পৌঁছানো সম্ভব হয় না।
এ ছাড়া ভাষাগত দক্ষতা, আন্তর্জাতিক নীতিগত আলোচনার জটিলতা, পর্যাপ্ত তথ্যের অভাব এবং নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগের সীমিত সুযোগও কার্যকর অংশগ্রহণকে প্রভাবিত করতে পারে।
ফলে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে কারা উপস্থিত হতে পারছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতা ও মতামত কতটা শোনা হচ্ছে এবং তাঁরা আলোচনার কোন পর্যায়ে যুক্ত হতে পারছেন এসব বিষয় আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তবে এই বাধাগুলো সব প্রতিনিধি বা সব সম্মেলনের ক্ষেত্রে সমান নয়। তাই সমস্যাটির ব্যাপ্তি নির্ধারণ করতে হলে নির্দিষ্ট সম্মেলনের অংশগ্রহণের তথ্য, অর্থায়নের ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন প্রতিনিধিদলের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করা জরুরি।
একইভাবে রয়েছে উপকূলের মানুষের সংকট ও বৈশ্বিক আলোচনার দূরত্ব। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের শ্যামনগর জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বহুমাত্রিক সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, লবণাক্ততা এবং নিরাপদ পানির সংকট মানুষের জীবন ও জীবিকাকে প্রভাবিত করছে। এসব সংকটের প্রভাব নারী, শিশু, কৃষক, জেলে, দিনমজুর এবং আর্থসামাজিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর ওপর ভিন্ন ভিন্নভাবে পড়ছে।
নিরাপদ পানির সংকটের কথাই ধরা যাক। উপকূলের অনেক পরিবারকে প্রয়োজনীয় পানি সংগ্রহ করতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। এতে সময় ও শ্রম ব্যয়ের পাশাপাশি নারী ও কিশোরীদের দৈনন্দিন জীবন, শিক্ষা এবং অন্যান্য কাজের ওপরও প্রভাব পড়ে। অন্যদিকে লবণাক্ততা কৃষি উৎপাদন ও জীবিকার ধরন বদলে দিতে পারে। দুর্যোগের পর ঘরবাড়ি, সম্পদ ও আয়ের উৎস পুনর্গঠন করতে গিয়ে পরিবারগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে হয়। এই বাস্তবতাগুলো শুধু স্থানীয় উন্নয়নের সমস্যা নয়, এগুলো জলবায়ু অভিযোজন, অর্থায়ন, ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা এবং ন্যায়সংগত উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত।
তাই আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় উপকূলের মানুষের অভিজ্ঞতা অন্তর্ভুক্ত করা কেবল তাঁদের দুর্দশার বিবরণ তুলে ধরার বিষয় নয়। বরং কোন ধরনের সহায়তা প্রয়োজন, কোন অবকাঠামো কার্যকর হবে, কীভাবে জীবিকা সুরক্ষিত রাখা সম্ভব এবং অর্থায়ন কীভাবে মানুষের কাছে পৌঁছাবে, এসব বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্যও তাঁদের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ।
কপ৩১ শুধু নতুন প্রতিশ্রুতি ঘোষণার মঞ্চ নয়, বরং আগের সিদ্ধান্তগুলোর বাস্তবায়ন কতটা এগিয়েছে, অর্থায়ন কতটা কার্যকর হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন কতটা বিবেচনায় এসেছে, তা পর্যালোচনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। এই উদ্যোগের সিদ্ধান্ত গ্রহণে তৃণমূলের কণ্ঠ অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।
জলবায়ু সম্মেলনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার তৃণমূল সংগঠন, নারী, তরুণ, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, কৃষক ও জেলেদের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে তাঁদের ভ্রমণ ও আবাসন ব্যয়ের সহায়তা, প্রয়োজনীয় তথ্য এবং নীতিগত আলোচনায় অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয়ত, সম্মেলনে তাঁদের উপস্থিতিকে অর্থবহ করতে আনুষ্ঠানিক আলোচনার সঙ্গে নাগরিক সমাজের সংলাপের সংযোগ বাড়াতে হবে। তাঁদের অভিজ্ঞতা ও সুপারিশ কীভাবে সংশ্লিষ্ট আলোচনায় উপস্থাপিত হচ্ছে এবং সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বিবেচিত হচ্ছে, সে বিষয়ে স্বচ্ছতা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সিদ্ধান্তকে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। জলবায়ু অর্থায়নের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মতামত, প্রয়োজন এবং জবাবদিহির ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় সহায়তা নির্ধারণের সময় শুধু আর্থিক ক্ষতির হিসাব নয়, মানুষের বাস্তুচ্যুতি, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ক্ষতি, সামাজিক সম্পর্কের ভাঙন এবং অন্যান্য অনর্থনৈতিক ক্ষতিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
চতুর্থত, তরুণদের অংশগ্রহণকে শুধু স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম বা প্রচারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নীতিগত আলোচনা, গবেষণা, স্থানীয় অভিজ্ঞতা উপস্থাপন এবং বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রেও সুযোগ দিতে হবে। কারণ তরুণেরা শুধু ভবিষ্যতের জলবায়ু সংকটের মুখোমুখি প্রজন্ম নন, তাঁদের অনেকেই বর্তমানে নিজ নিজ এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কাজ করছেন।
এবার আসি কপ৩১-এর সাফল্য কোথায়?
কোনো আন্তর্জাতিক সম্মেলনের সাফল্য শুধু অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা, ঘোষণার পরিমাণ কিংবা প্রতিশ্রুত অর্থের অংক দিয়ে বিচার করা যথেষ্ট নয়।
দেখতে হবে, গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে এবং যাঁদের জন্য এসব সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ, তাঁদের জীবনে কী পরিবর্তন আনছে। কপ৩১-এর সামনে তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অভিজ্ঞতাকে আলোচনার প্রান্ত থেকে মূল বিবেচনায় নিয়ে আসা।
তাঁদের অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো, অর্থায়নের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
শ্যামনগরের উপকূলীয় মানুষের কাছে জলবায়ু ন্যায়বিচার কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়। এটি নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা, জীবিকা রক্ষার সুযোগ, দুর্যোগের পর ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পরিবেশের প্রশ্ন।
আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনার সঙ্গে এই বাস্তবতার সংযোগ যত দৃঢ় হবে, সিদ্ধান্তগুলো মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে তত বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
পরিশেষে বলবো বিশ্বের জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে শুধু আলোচনার বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না, তাঁদের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও মতামতকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত যাঁরা সবচেয়ে কাছ থেকে অনুভব করেন, সংকট মোকাবিলার কার্যকর পথ খুঁজতেও তাঁদের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত মূল্যবান।
লেখক: পরিবেশ কর্মী
মন্তব্য করুন