বাংলাদেশ, শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬
১ কার্তিক ১৪৩৩ | সময়:
The Editors
১৬ অক্টোবর ২০২৬, ৯:৩৬ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

‎সুন্দরবনের ‘সুন্দরী’ কি হারিয়ে যাবে? || ‎তারিক ইসলাম

‎‘সুন্দরবন’—নামটির সঙ্গে ‘সুন্দরী’ গাছের সম্পর্ক অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। যে বৃক্ষের সমৃদ্ধি আর বিশালতায় টিকে আছে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের মূল সৌন্দর্য ও পরিচয়, সেই সুন্দরী গাছই আজ আক্রান্ত এক মরণব্যাধিতে। বনজুড়ে চলছে গাছগুলোর নীরব বিদায়ের করুণ সুর। কেবল পাতা আর ডালপালা শুকিয়ে যাওয়া নয়, মড়ক ছড়িয়ে পড়ছে মূল কাণ্ড পর্যন্ত। এর পাশাপাশি আশঙ্কাজনকভাবে কমছে নতুন চারা গজানোর হারও। সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র যে বড় ধরনের পরিবেশগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সুন্দরী গাছের এই অসুস্থতা তারই এক মারাত্মক বার্তা।

‎সম্প্রতি সুন্দরবনের পরিবেশ নিয়ে প্রকাশিত একটি সমীক্ষার ফলাফল পুরো দেশকে শঙ্কিত করে তুলেছে। ২০২৪–২৫ সালে পরিচালিত ‘সুন্দরবনের প্রতিবেশব্যবস্থার পরিবীক্ষণ’ শীর্ষক দুই বছর মেয়াদি সমীক্ষা অনুযায়ী, বনের প্রায় ৩৯ শতাংশ সুন্দরী গাছই এখন ‘আগামরা’ বা ‘টপ-ডাইং’ (Top-Dying) রোগে আক্রান্ত। সব মিলিয়ে আক্রান্ত গাছের আনুমানিক সংখ্যা দাঁড়ায় ১২ কোটি ৯৫ লাখ। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এর মধ্যে দুই কোটিরও বেশি গাছ গুরুতরভাবে মরে যাওয়ার মুখোমুখি।

‎পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) ও আরণ্যক ফাউন্ডেশনের যৌথ পরিচালনায় এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক স্বপন কুমার সরকারসহ বিশেষজ্ঞ দলের গবেষণায় এই ভয়াল চিত্র উঠে এসেছে।‎

‎সুন্দরবনের প্রায় ৪০ শতাংশ প্রধান বৃক্ষ যখন একযোগে রোগাক্রান্ত হয়, তখন এটি কেবল একটি নির্দিষ্ট উদ্ভিদের সমস্যা থাকে না; পুরো বনের অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ফেলে দেয়। গবেষকেরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, উজান থেকে আসা মিষ্টি পানির প্রবাহ হ্রাস, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রের নোনা পানির অনাকাঙ্ক্ষিত অনুপ্রবেশ এবং মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি—এসব মিলেই সুন্দরী গাছের জীবনীশক্তি শুষে নিচ্ছে। সুন্দরবনের মিষ্টি পানি ও মৃদু লবণাক্ত পরিবেশের ভারসাম্য বজায় না থাকায় মাটির বায়ুসঞ্চালন কমছে, যা গাছগুলোর গোড়া ও কাণ্ডকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তার ওপর ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড় ও পলি জমার কারণে বন নিজের প্রাকৃতিক পুনরুৎপাদন ক্ষমতা হারাচ্ছে।‎

‎সুন্দরবন কেবল নান্দনিক সৌন্দর্যের আধার নয়, এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কোটি মানুষের জীবন ও সম্পদের প্রাকৃতিক সুরক্ষাবর্ম। প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের থাবা থেকে বছরের পর বছর বুক দিয়ে বাংলাদেশকে আড়াল করে রেখেছে এই ম্যানগ্রোভ বন। আর সেই বনের মূল কাঠামোর অন্যতম স্তম্ভ সুন্দরী গাছ যদি একে একে উজাড় হয়ে যায়, তবে গোটা উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারসহ দুর্লভ জীববৈচিত্র্য মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে।

‎সুন্দরবনের এই নীরব আর্তনাদ আর উপেক্ষা করার সময় নেই। সময় এসেছে সুনির্দিষ্ট ও জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার: ‎১. মিষ্টি পানির প্রবাহ পুনরুদ্ধার: উজান থেকে সুন্দরবনমুখী নদ-নদীগুলোতে মিষ্টি পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে আন্তঅঞ্চলীয় ও জাতীয় পানিসম্পদ নীতিতে বিশেষ জোর দিতে হবে।

‎২. পলি নিরসন ও নদী-খাল খনন: বনের অভ্যন্তরীণ যে নদ-নদী ও খালগুলো পলি ভরাট হয়ে মিষ্টি ও নোনা পানির ভারসাম্য নষ্ট করছে, সেগুলো পরিবেশবান্ধব উপায়ে পুনঃখননের উদ্যোগ নিতে হবে।

‎৩. রোগ প্রতিরোধে জোরালো গবেষণা: আগামরা রোগের সঠিক জীবাণু বা অণুজীব শনাক্ত করে তা থেকে সুন্দরী গাছকে রক্ষায় বন অধিদপ্তর এবং বিজ্ঞানীদের সমন্বিত গবেষণা বাড়ানো প্রয়োজন।‎

‎৪. সুরক্ষিত অঞ্চল ঘোষণা ও নজরদারি: বনের যেসব এলাকায় রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি, সেগুলোকে বিশেষ নজরদারির আওতায় এনে নতুন চারা উৎপাদন ও বৃদ্ধির পরিবেশ তৈরি করতে হবে। ‎

‎সুন্দরবন ছাড়া আমাদের মানচিত্রের এক বিরাট অংশকে কল্পনা করা যায় না, আর সুন্দরী গাছ ছাড়া সুন্দরবনের অস্তিত্ব অসম্পূর্ণ। ১২ কোটি ৯৫ লাখ সুন্দরী গাছের রোগাক্রান্ত হওয়া কোনো সাধারণ পরিসংখ্যান নয়, এটি আমাদের প্রকৃতির বিপন্নতার স্পষ্ট সতর্কবার্তা। এখনই যদি কার্যকর ও বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত না নেওয়া হয়, তবে হয়তো মানচিত্রে ‘সুন্দরবন’ নামটি থেকে যাবে, কিন্তু হারিয়ে যাবে তার আসল রূপকার—আমাদের ‘সুন্দরী’।
‎

লেখক : ‎সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি

 

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

‎সুন্দরবনের ‘সুন্দরী’ কি হারিয়ে যাবে? || ‎তারিক ইসলাম

১

কামালনগর কবরস্থান সম্প্রসারণে জমি ক্রয়ের জন্য মতবিনিময়: আর্থিক সহযোগিতার আহ্বান

২

‘আগে ভালো ছিলাম’-জনজীবনের দীর্ঘশ্বাস, রাষ্ট্রের জন্য সতর্কবার্তা || গাজী মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ

৩

নেত্রকোনায় সাংবাদিককে গুলি করে হত্যা: শরীরে ৬ গুলির চিহ্ন

৪

আশাশুনিতে দুর্গাপূজার নিরাপত্তায় আনসারদের সতর্ক থাকার নির্দেশ

৫

ঢাকা-সৌদি রুটে ১০৭ ফ্লাইট বাতিল, ভোগান্তিতে ১৬ হাজারের বেশি যাত্রী

৬

যুব উন্নয়নের প্রশ্নফাঁসে জড়িত ৫ সরকারি কর্মচারীসহ গ্রেপ্তার ৭

৭

কৃষি পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষায় উপকূলের ২৫ নারীকে সম্মাননা

৮

কালিগঞ্জে সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রীকে অপহরণের অভিযোগ!

৯

রাতের আধারে মুন্সিগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন মালঞ্চ নদীর চরের জমি দখল!

১০

আলোচনায় অপু বিশ্বাসের ‘প্রিয় বন্ধু’, কে তিনি?

১১

দক্ষতার দুই ডানায় ভর করে নতুন অর্থনীতি || মো. মামুন হাসান

১২

জলবায়ু অভিযোজনের নামে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে ঋণের ফাঁদে ফেলা চলবে না

১৩

মোংলায় প্রয়াত কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’র ৭০তম জন্মবার্ষিকী পালিত

১৪

তালায় মাছ চুরির অভিযোগে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ

১৫

শামীমকে হত্যার উস্কানিদাতা ফজলুল হককে ধরিয়ে দিতে লেখক মহিউদ্দিন মোহাম্মদের পুরস্কার ঘোষণা

১৬

বিশ্ব মেরুদণ্ড দিবসে আলোচনা : উন্নত চিকিৎসায় সরকারি হাসপাতালে স্পাইন ইউনিট চালুর দাবি

১৭

সাতক্ষীরায় সাংবাদিকতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে অভিজ্ঞতা বিনিময় অধিবেশন

১৮

হাজার বছরের পথ বেয়ে পর্যটনের বাংলাদেশ || মো: মামুন হাসান

১৯

সাতক্ষীরায় দুর্গাপূজার নিরাপত্তায় ৩১ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন

২০