
যান্ত্রিক সভ্যতার এই যুগে ইট-পাথরের খাঁচায় বন্দি আমাদের যাপিত জীবন। কংক্রিটের দেয়াল, গাড়ির হর্ন আর অন্তহীন কাজের চাপ আমাদের মনকে প্রতিনিয়ত করে তুলছে অবসাদগ্রস্ত। এই ক্লান্তি থেকে মুক্তি পেতে মানুষ নানা উপায় খোঁজে।
তবে আধুনিক বিজ্ঞান ও মনস্তত্ত্ববিদরা বলছেন, মানসিক চাপ দূর করার সবচেয়ে সুন্দর ও প্রাকৃতিক মাধ্যম হতে পারে আমাদের ঘরের কোণে বা বারান্দার টবে থাকা ছোট্ট সবুজ গাছটি। হ্যাঁ, গাছেরও প্রাণ আছে— এই সহজ সত্যটিকে উপলব্ধি করে গাছের সাথে কিছুটা সময় কাটানো এবং কথা বলা আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী।
বাঙালির মননে গাছের প্রাণ ও অনুভূতি গভীরভাবে প্রোথিত। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর অমর সৃষ্টিতে প্রকৃতির সাথে মানুষের আত্মিক সম্পর্কের কথা বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন।
তিনি প্রকৃতির মাঝে খুঁজে পেয়েছেন পরম শান্তি—
‘আমারে লহ গো টানি’ ওই ফুলদলপুটে,/ ওই শাখায় শাখায়, ওই মর্মরে ও কুঞ্জে উঠে।’
বিজ্ঞানাচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু তাঁর অনন্য বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে, উদ্ভিদেরও প্রাণ আছে, মানুষ এর মত সংবেদনশীলতা রয়েছে।
অন্যদিকে, কবি জীবনানন্দ দাশ বাংলার নিসর্গ, ঘাস আর লতাপাতার প্রেমে বুঁদ হয়ে লিখেছেন— ‘বাংলার নদী মাঠ ভাঁটফুল ঘুঘু আর হিজলের বন / মানবের মন কিংবা মন তার ফুরায়ে গেলেই তবু যেন পাইয়াছে মন।’
আর পল্লীকবি জসীম উদ্দীন তাঁর কবিতায় গাছপালা ও মাটির ঘ্রাণকে ফুটিয়ে তুলেছেন এক দারুণ মায়াবী ছন্দে।
গাছের সাথে কথা বলার বা সময় কাটানোর কার্যকারিতা এখন কেবল অনুভূতির বিষয় নয়, বরং বৈজ্ঞানিকভাবেও প্রমাণিত। ২০২২ সালে ‘ট্রিজ ডটকম’ (Trees.com) কর্তৃক ১২৫০ জন ব্যক্তির ওপর পরিচালিত একটি জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৬৫ শতাংশ মানুষ স্বীকার করেছেন যে গাছের সাথে গল্প বা কথা বললে তাদের মনস্তাত্ত্বিক চাপ (Psychological Stress) উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
শুধু মন ভালো করাই নয়, গাছের সাথে কথা বলার শারীরিক উপকারিতাও রয়েছে। সাম্প্রতিক একটি ল্যাব গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের কথা বলার সময় উৎপন্ন শব্দ বা কম্পন গাছের চারপাশের বায়ুমণ্ডলে মৃদু আন্দোলন তৈরি করে। এই মৃদু কম্পন গাছের কোষ বিভাজন ও পুষ্টি শোষণ প্রক্রিয়াকে উদ্দীপিত করে, যা গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশকে আরও ত্বরান্বিত করে। অর্থাৎ, আপনি যখন গাছের সাথে কথা বলেন, তখন তা যেমন আপনার মনকে শান্ত করে, তেমনি গাছটিকেও সুস্থ ও সতেজ রাখতে সাহায্য করে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই ধরনের উদ্ভিদ-ভিত্তিক চর্চাকে বলা হয় ‘হর্টিকালচারাল থেরাপি’ (Horticultural Therapy) বা ‘ইকোথেরাপি’।
ইনডোর প্ল্যান্টের যত্ন নেওয়া, গাছের পাতায় জমে থাকা ধুলো মুছে দেওয়া, কিংবা নিয়ম করে জল ঢালার ফাঁকে গাছকে নিজের মনের কথা বলা— এক ধরণের চমৎকার মনস্তাত্ত্বিক থেরাপি হিসেবে কাজ করে।
যখন আমরা কোনো গাছের যত্ন নিই, তখন আমাদের মস্তিষ্ক ‘ডোপামিন’ ও ‘সেরোটোনিন’-এর মতো ভালো লাগার হরমোন নিঃসরণ করে, যা আমাদের দুশ্চিন্তা ও বিষণ্ণতা দূর করতে সাহায্য করে।
সবুজের সাথে এই নিরব মিতালি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রকৃতির সাথে আমাদের শিকড়ের টান কতটা গভীর। তাই প্রতিদিনের ব্যস্ততা থেকে কিছুটা সময় বাঁচিয়ে ঘরের কোণের ছোট্ট সবুজ বন্ধুটির পাশে বসুন। তার সাথে আপনার দিনের জমানো কথাগুলো ভাগ করে নিন; দেখবেন, আপনার মানসিক ক্লান্তি যেমন দূর হয়ে গেছে, তেমনি আপনার স্নেহে গাছটিও আরও সুন্দরভাবে বেড়ে উঠছে। সবুজ হোক আমাদের মানসিক প্রশান্তির সবচেয়ে বিশ্বস্ত ঠিকানা।
লেখক : সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি

মন্তব্য করুন