
বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের সংকট যখন ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে, তখন এই যুদ্ধ জয়ে নতুন এক হাতিয়ার হিসেবে সামনে আনা হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তিকে। আগামী কপ৩১ (COP31) সম্মেলনের আয়োজক কর্তৃপক্ষ বিশ্ব পরিবেশ রক্ষায় এআই-এর কার্যকর ব্যবহারের এক বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে ‘আনতালিয়া আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) প্লেজ’ বা আনতালিয়া এআই অঙ্গীকার। এই অঙ্গীকারে পরিবেশবান্ধব এআই অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং দায়িত্বশীল উপায়ে প্রযুক্তিটির টেকসই বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
তবে মূল প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে—এআই খাতের এই লাগামহীন বিস্তারের মুখে পরিবেশ সুরক্ষার ভারসাম্য রক্ষা করা কতটা বাস্তবসম্মত? নাকি এটিও কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতার দলিলেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে?
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এআই যে অভাবনীয় বিপ্লব আনতে পারে, সে বিষয়ে কারোরই সংশয় নেই। বিশালাকার পরিবেশগত উপাত্ত (Data) বিশ্লেষণ, ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার নির্ভুল পূর্বাভাস, স্মার্ট গ্রিডের মাধ্যমে শক্তি সাশ্রয় এবং কৃষি খাতের অভিযোজন কৌশল তৈরিতে এআই অনন্য ভূমিকা রাখছে। গবেষকদের মতে, বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে প্রযুক্তিগত সমন্বয় আনতে এআই-এর বিকল্প নেই।
তবে এর পেছনের অন্ধকার দিকটিও আশঙ্কাজনক। উচ্চমাত্রার এআই মডেলগুলোর অ্যালগরিদম প্রশিক্ষণ ও পরিচালনার জন্য প্রয়োজন হয় বিশাল সব ডেটা সেন্টার। আর এই ডেটা সেন্টার পরিচালনা করতে প্রয়োজন হয় বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ, যার সিংহভাগই আসে কার্বনভিত্তিক জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়িয়ে। একই সঙ্গে অবকাঠামো ঠান্ডা রাখতে কোটি কোটি লিটার পানির অপচয় ঘটছে। বিশ্বজুড়ে বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বাড়তে থাকা ‘কার্বন ফুটপ্রিন্ট’ এখন জলবায়ু লক্ষ্যের ঠিক বিপরীতে হাঁটছে।
কপ৩১ আয়োজকদের ঘোষিত এই অঙ্গীকারে প্রযুক্তি কোম্পানি এবং নীতিনির্ধারকদের জন্য প্রধানত কয়েকটি নির্দেশক নীতি বেঁধে দেওয়া হয়েছে:
সবুজ অবকাঠামো: ডেটা সেন্টারগুলোকে পুরোপুরি নবায়নযোগ্য শক্তির আওতায় আনা।
দক্ষ অ্যালগরিদম: কম শক্তি প্রয়োগ করে কাজ সম্পাদন করতে পারে এমন এআই মডেল তৈরি।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি: এআই তৈরিতে কতটা কার্বন নিঃসরণ হচ্ছে, তার স্পষ্ট হিসেব জনসমক্ষে আনা।
উদ্যোগটি কাগজে-কলমে ইতিবাচক মনে হলেও এটি প্রকাশের পরপরই শিল্প খাতের বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া এসেছে।
শিল্প বিশেষজ্ঞদের মূল সংশয় হলো, আনতালিয়া প্লেজের নীতিগুলো মূলত ‘স্বেচ্ছামূলক’ (Voluntary)। এখানে নীতি না মানলে কোনো বাধ্যতামূলক আইনি শাস্তি বা অর্থনৈতিক জরিমানার ব্যবস্থা নেই। বর্তমানের চরম বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার বাজারে কোম্পানিগুলো পরিবেশের কথা ভেবে নিজেদের প্রযুক্তির গতি কমাবে—এমনটা ভাবা কিছুটা অসংগত।
তাছাড়া, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের বিকাশের চেয়ে এআই শিল্পের প্রসারের গতি বহুগুণ দ্রুত। চাহিদা মেটাতে সবুজ শক্তির জোগান না থাকলে ডেটা সেন্টারগুলো শেষ পর্যন্ত প্রচলিত বিদ্যুৎ খাতের ওপরই চাপ বাড়াবে। ফলে স্বল্প মেয়াদে এটি বৈশ্বিক উষ্ণায়ন আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও পরিবেশ সুরক্ষা—দুটির একটিকেও আজকের পৃথিবীতে বাদ দেওয়ার উপায় নেই। তবে এআই যেন সবুজ পৃথিবীর স্বপ্নকে গ্রাস না করে, সে জন্য কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন:
১. আইনি বাধ্যবাধকতা: আন্তর্জাতিক পরিসরে ডেটা সেন্টারের কার্বন নিঃসরণের সুনির্দিষ্ট বাধ্যবাধকতা তৈরি করতে হবে।
২.সবুজ জ্বালানির রূপান্তর: ডেটা সেন্টারে ১০০% নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের সময়সীমা নির্দিষ্ট করা দরকার।
৩. টেকসই প্রযুক্তি বিনির্মাণ: কম শক্তিতে চলনশীল ‘সবুজ এআই’ (Green AI) গবেষণায় বেশি বিনিয়োগ করতে হবে।
প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করার পাশাপাশি যেন এই গ্রহের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে না ফেলে—তা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আনতালিয়া প্লেজ যদি কেবল আলোচনার বার্তা হয়ে থাকে, তবে তা জলবায়ু সংকটকে আরও ঘনীভূত করবে। প্রযুক্তিকে পৃথিবীর ধ্বংসের কারণ নয়, বরং বেঁচে থাকার অন্যতম অবলম্বন হিসেবে গড়ে তোলাই হোক কপ৩১-এর আসল অঙ্গীকার।
লেখক : সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি

মন্তব্য করুন