
বিলাল হোসেন: সুন্দরবনে কোস্টগার্ড, বন বিভাগ, নৌ পুলিশ, র্যাব সদস্যরা থাকতেও দস্যুতা কমছে না। আমরা নির্যাতিত হয়ে আসার পরে প্রশাসনকে বারবার অবগত করলেও আমাদের কোন কথা তারা শোনে না। প্রশাসন যদি মনে করে বনদস্যু নির্মূল করব, তাহলে তারা এক ঘণ্টাও বনে থাকতে পারবে না। বনদস্যুদের সহযোগী হিসেবে উপরে থেকে যারা আমাদের কাছ থেকে বিকাশের মাধ্যমে টাকা লেনদেন করছে তাদেরকে আইনের আওতায় আনলে সুন্দরবনে দস্যুতা কমবে। আমরা আর কত টাকা সুদে নিয়ে সুন্দরবনে মাছ কাঁকড়া ধরতে যাব। আমাদের আর বেঁচে থাকার ইচ্ছা নেই। হয় বনদস্যুদের নির্মূল করুন, না হয় আমাদের মেরে ফেলুন। আর তা না হলে আমরা এই এলাকা ছেড়ে চলে যাব। শ্যামনগরের হরিনগরে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে এমন বক্তব্য দিয়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জের হরিনগর গ্রামের জেলে হাবিবুল্লাহ।
জেলে আজিজ সরদার বলেন, আমরা এখন ডাকাতদের বিরুদ্ধে মানববন্ধন করতেছি। এই ছবি ডাকাতদের কাছে পৌঁছে যাবে। আমরা সুন্দরবনে প্রবেশ করলে আমাদেরকে খুবই নির্যাতন করবে, তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য। গত দুই গুণে চার পার্টিকে দুই লাখ টাকা চাঁদা দিয়েছি। সুন্দরবনে তেমন মাছ কাঁকড়া পাওয়া যাচ্ছে না- ডাকাতদের টাকা দেবো নাকি সংসার চালাবো, নাকি সুদে নেওয়া টাকা পরিশোধ করব?
সুন্দরবন থেকে বনদস্যু নির্মূলে আয়োজিত আন্দোলন কর্মসূচিতে এভাবেই নিজেদের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেন জেলে বাওয়ালীরা।
সম্প্রতি সুন্দরবনকে ঘিরে বেড়েছে বনদস্যুদের তৎপরতা। এতে জেলেদের মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম নিরাপত্তাহীনতা। বনদস্যুদের অপহরণ, চাঁদাবাজি ও মুক্তিপণ আদায়ে উদ্বিগ্ন সুন্দরবননির্ভর হাজারো পরিবার। প্রশাসনের নজরদারি, নিয়মিত টহল ও কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় বনদস্যুদের তৎপরতা বেড়েছে। ফলে একদিকে জীবিকার সংকট অন্যদিকে প্রাণ হারানোর আশঙ্কা নিয়ে দিন কাটছে বনজীবীদের।
জেলে আব্দুর রব বলেন, সুন্দরবনে মাছ ধরতে যাওয়া এখন অনেকটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। নৌকা, জাল, খাবার ও অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ে বনে প্রবেশ করতে অনেক টাকা খরচ হয়। এরপর বনদস্যুদের চাঁদা দিতে হলে মাছ বিক্রির আয়ের বড় অংশ চলে যায়। আবার টাকা দিতে না পারলে অপহরণ কিংবা নির্যাতনের ভয় থাকে। জীবিকার বিকল্প না থাকায় বাধ্য হয়েই ঝুঁকি নিয়ে বনে যেতে হচ্ছে।
সুন্দরবন গবেষক পীযূষ বাউলিয়া পিন্টু বলেন, সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল জেলে, বাওয়ালী ও অন্যান্য বনজীবীদের জীবন জীবিকা এমনিতেই নানা সংকটে জর্জরিত। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙন, মাছের প্রাপ্যতা কমে যাওয়া এবং বন বিভাগের বিভিন্ন বিধিনিষেধের কারণে তাদের আয়-রোজগারে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এর সঙ্গে বনদস্যুদের আতঙ্ক যুক্ত হওয়ায় পরিবারগুলো আরও বেশি বিপাকে পড়েছে।
অনেক জেলে ঋণ নিয়ে নৌকা, জাল ও মাছ ধরার সরঞ্জাম সংগ্রহ করেন। বনে গিয়ে চাঁদা দিতে হলে কিংবা অপহরণের শিকার হলে সেই ঋণের বোঝা পরিবারের ওপর পড়ে। কোনো জেলে দীর্ঘদিন নিখোঁজ বা জিম্মি থাকলে তার পরিবারের সদস্যদের অনাহার ও আর্থিক সংকটের মুখে পড়তে হয়। পাশাপাশি বন বিভাগ, কোস্ট গার্ড, নৌপুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। সুন্দরবনের গুরুত্বপূর্ণ নদীপথ, খাল ও জেলেদের মাছ ধরার এলাকায় নিয়মিত টহল নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বনদস্যুদের সহযোগী, চাঁদা আদায়কারী ও অর্থ লেনদেনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জ কর্মকর্তা শাহিনুল ইসলাম বলেন, বনদস্যু নির্মূলে আমরা জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছি। সুনির্দিষ্ট তথ্য অনুযায়ী আমরা সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করব।
শ্যামনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাফিউল ইসলাম পাটোয়ারী বলেন, সুন্দরবনে বনদস্যু নির্মূলে আমরা নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছি। আমরা সঠিক তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে বনদস্যুদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছি। ইতোমধ্যে একজন বনদস্যুকে গ্রেপ্তার করে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে। কেউ সঠিক তথ্য প্রমাণ নিয়ে আমাদের অবগত করলে তাৎক্ষণিক তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।

মন্তব্য করুন