

সুলতান শাহাজান, শ্যামনগর: মালঞ্চ নদীর ওপারেই সুন্দরবন। এপারে সাতক্ষীরার মুন্সীগঞ্জের মথুরাপুর জেলেপাড়ার বারান্দায় বসে সনেকা মন্ডল ভাবছেন, দস্যুমুক্ত সুন্দরবনের দাবিতে মিছিল-মিটিংয়ের ছবি-ভিডিও কি বনের দস্যুদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে? তাঁর স্বামী ও দুই সন্তান ওই বনেই মাছ-কাঁকড়া ধরেন। আবার তাঁরাই যাচ্ছেন আন্দোলনে!
গত ২৮ অক্টোবর গাবুরায় মানববন্ধনের মধ্য দিয়ে শ্যামনগরে বনদস্যুদের নির্মূলের দাবিতে পাঁচ দিনের টানা কর্মসূচি শুরু হয়েছে। এরপর সুন্দরবন-লাগোয়া বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচিও হয়েছে। জেলে, মৌয়াল, বাওয়ালীরা অংশ নিচ্ছেন, সঙ্গে তাঁদের স্ত্রী-সন্তানেরাও। দাবি একটাই, বনে যাওয়া মানুষগুলো যেন নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারেন। কিন্তু এই আন্দোলন বনজীবী পরিবারের নারীদের মনে আশার পাশাপাশি ভয়ও বাড়িয়েছে।
সনেকা মন্ডল বলেন, ‘ডাকাতির বিরুদ্ধে এসব মিছিল-মিটিংয়ের খবর বনের ডাকাতিরা সব পাচ্ছে। আমাগা স্বামী-সন্তানেরা মিছিলে যাচ্ছে। অনেক নিষেধ করিছি, শোনে না, জোর কুরে যাচ্ছে। এসব ছবি-ভিডিও দেখে বনে গেলে ডাকাতিরা ধরে নিয়ে আবার মাইরধোর করে কি না, সেই ভয় করছে।’
সিংহড়তলী গ্রামের জেলে দীনবন্ধু বাউলিয়ার স্ত্রী সাবিত্রী বাউলিয়ারও একই উদ্বেগ। চুনকুড়ি নদীর বেড়িবাঁধে স্বামীর নৌকা মেরামত করতে করতে তিনি বলেন, ‘শহরে মিটিং-মিছিল হচ্ছে, এর ফল কী হয় কে জানে? ডাকাতের বিরুদ্ধে এই মিছিলের কথা যদি ওদের কানে যায়, তাহলে আবার বনে গেলে কী যে নির্যাতন করে?’
মথুরাপুর জেলেপাড়ার শুবাশী মন্ডলের (৫৫) অবস্থা আরও কঠিন। ২০ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি সুন্দরবনে মাছ-কাঁকড়া ধরে সংসার চালান। পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারীও তিনি। বনে কাজ করতে করতে শরীর ভেঙে গেছে তাঁর।
শুবাশী বলেন, ‘বাদায় কাজ করতে গিয়ে শরীর ভেঙে গেছে। কী করব, খেতে তো হবে। কোমরের হাড় ক্ষয় হুয়ে গেছে। ওষুধ কেনার টাকাও নি। ভালো ডাক্তার দেখানো তো দূরির কথা। ডাকাতের ভয়ে বাদায় যাতি পারি নে, না খেয়ে মরার দশা হচ্ছে।’ তাঁর আকুতি, ‘সুন্দরবন থেকে ডাকাত মুক্ত করে আমাগা বাঁচান।’
ভয় ছুঁয়ে গেছে শিশুদেরও মাঝেও। ৬৩ নম্বর হরিনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী শশী মন্ডলের বাবা সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরেন। সে বলে, ‘বাদায় এখন খুব ডাকাত শুনেছি। ডাকাত বন্ধ করার জন্য বাজারে মিছিল-মিটিং হচ্ছে। বাবা অনেক দিন বাদায় যায় না। আমাদের বাড়িতে ভালো খাবারও রান্না হয় না।’
এ বিষয়ে শ্যামনগর উপজেলা পরিষদের সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান নুরজাহান পারভীন ঝর্ণা বলেছেন, বনজীবী পরিবারের নারীরা এখন স্বামী-সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন। একদিকে জীবিকার তাগিদে স্বজনদের বনে যেতে হয়, অন্যদিকে দস্যুমুক্ত সুন্দরবনের দাবিতে আন্দোলনেও অংশ নিতে হচ্ছে। আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে বনে গিয়ে তাঁরা কোনো প্রতিশোধের শিকার হন কি না, সেই ভয়ও রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই, দ্রুত বনদস্যুদের দমন করে বনজীবীদের নিরাপদে জীবিকা নির্বাহের পরিবেশ নিশ্চিত করা হোক।’
২০১৮ সালের নভেম্বরে ৩২টি দস্যু বাহিনীর সদস্যদের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে তৎকালীন সরকার সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করেছিল। তবে স্থানীয় বনজীবীদের দাবি, ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক অস্থিরতার পর বনে আবার একাধিক চক্র সক্রিয় হয়েছে। তাঁদের ভাষ্য, এখন নদী-খালে অন্তত ১২ থেকে ১৪টি দল সক্রিয়। তারা নৌকা থামিয়ে জেলেদের জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করছে।
মুন্সিগঞ্জের হরিনগর, সিংড়তলী, মথুরাপুর ও চুনকুড়ির একাধিক জেলে অভিযোগ করেছেন, বনে ঢুকতে নৌকাপ্রতি মোটা অঙ্কের টাকা দিতে হচ্ছে, কখনো কখনো এক লাখ টাকার বেশি চাওয়া হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিংড়তলীর এক জেলে বলেন, মাছ ধরা ও কাঁকড়া সংগ্রহের জন্যও নৌকাপ্রতি অন্তত ৪০-৫০ হাজার টাকা দিতে হচ্ছে। বনে যাওয়া বন্ধ হলে বা খরচ বাড়লে এর ধাক্কা প্রথমে পড়ে সংসারের চুলায়। নিরাপত্তাহীনতায় অনেকে পেশা ছাড়ার কথাও ভাবছেন।
বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবন থেকে করিম-শরীফ, নানা ভাই, ছোট সুমন, আলিফ ও আসাবুর বাহিনীসহ বিভিন্ন চক্রের সদস্যদের আটক করা হয়েছে। অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার হয়েছে। জিম্মি দশা থেকে জেলে ও পর্যটককে জীবিত উদ্ধারও করা হয়েছে।
কোস্টগার্ডের মিডিয়া বিভাগ জানায়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনায় ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে ‘অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন’ ও ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’ চলছে। সুন্দরবন-লাগোয়া এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে।
তবে উপকূলের বনজীবীদের নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা লেখক ও গবেষক পীযূষ বাউলিয়া পিন্টু বলেন, ‘বাস্তবে সুন্দরবনে দস্যু-আতঙ্ক এখনো কমেনি।’ তাঁর মতে, শুধু বনের ভেতরে অভিযান চালিয়ে সমাধান হবে না, দস্যুদের অস্ত্র ও অর্থের জোগানদাতাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
বনজীবী পরিবারের নারী, শিশু ও প্রবীণদের উৎকণ্ঠার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘তাঁদের কাছে বনদস্যুমুক্ত সুন্দরবনের দাবি কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়। এটি পরিবারের নিরাপত্তা ও বেঁচে থাকার প্রশ্ন। স্বজনেরা নিরাপদে বনে যাবেন, কাজ করবেন, আর দিন শেষে সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরবেন, এটুকুই তাঁদের চাওয়া।’
এদিকে, সুন্দরবনে বনদস্যু নির্মূলের দাবিতে রোববার (১ নভেম্বর) বেলা সাড়ে এগারোটায় হরিনগর বাজারে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। একই দিন দুপুরে শ্যামনগর উপজেলা সদরেও বনজীবীরা মানববন্ধন ও সমাবেশ করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন।

মন্তব্য করুন