বাংলাদেশ, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
২ আশ্বিন ১৪৩৩ | সময়:
The Editors
২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ৮:২১ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

কাগজে-কলমে অভয়ারণ্য: সুন্দরবনে প্রতি গোনে ৩১৮ নৌকায় প্রায় ২৪ লাখ টাকার বাণিজ্য!

এম জুবায়ের মাহমুদ: পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের প্রায় ৫২ শতাংশ এলাকাকে সরকারিভাবে অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার স্বার্থে। অভয়ারণ্যে সাধারণ মানুষের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, কিন্তু বাস্তবে চিত্র উল্টো। বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয় দালালদের সাথে যোগসাজশে টাকার বিনিময়ে অবাধে অভয়ারণ্যে প্রবেশ করে মৎস্য শিকার করছে জেলেরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, নির্দিষ্ট হারে টাকা দিলেই দলে দলে নৌকা নিয়ে অভয়ারণ্যে প্রবেশের অনুমতি মেলে জেলেদের।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতি গোনে শত শত নৌকা প্রবেশ নিষিদ্ধ অভয়ারণ্যে প্রবেশ করছে অবাধে।

অভিযোগ রয়েছে, অভয়ারণ্যে প্রবেশকারীরা অবাধে মাছ ও ছোট কাঁকড়া শিকার করেন, ধ্বংস করেন বনজ সম্পদ, বিপন্ন করে তোলেন সুন্দরবনের প্রাণবৈচিত্র্য।

টহল ফাঁড়িতেই হয় অবৈধ প্রবেশের চুক্তি
সাতক্ষীরা রেঞ্জের বুড়িগোয়ালিনী, কদমতলা, কৈখালী, কোবাদক স্টেশনের আওতাধীন নোটাবেকী, মান্দারবাড়িয়া, কোবাদক, পুষ্পকাটি, দোবেকী ও হলদেবুনিয়া টহল ফাঁড়ির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে টাকার বিনিময়ে জেলেদের নিষিদ্ধ এলাকায় ঢুকতে সহযোগিতা করার।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, খোদ অফিসের কর্মকর্তারাই অভয়ারণ্য ঢুকতে জেলেদের সহযোগিতা করেন।

হলদেবুনিয়া টহল ফাঁড়ির আওতাধীন তালপেটি, কামানদাগ, আড়েরদুনে ও ছায়া খালে এমন ৩৩টি নৌকা ঢুকতে সহযোগিতা করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং এর থেকে প্রতিগোনে তাদের আয় হয় প্রায় ২ লাখ ৬৪ হাজার টাকা।

নোটাবেকী টহল ফাঁড়ির আওতাধীন ইলশেমারি, আগুনজ্বালা, পান্তামারী, খেজুরদানা, চামটা ও কালমেবাড়ি খালে প্রবেশের জন্য চুক্তি রয়েছে ৫০টি নৌকার, যেখানে প্রতিগোনে আয় প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

পুষ্পকাটি টহল ফাঁড়ির আওতাধীন আশাশুনি, জলঘাটা, তালতমী ও কস্রখালী খালে ৫২টি নৌকা প্রবেশ করে, যেখানে প্রতিগোনে আয় প্রায় ৪ লাখ ১৬ হাজার টাকা।

মান্দারবাড়িয়া টহল ফাঁড়ির আওতাধীন কয়লা, বেহেলা, তেতুলবেড়ি, লাউভাঙ্গা, মান্দারবাড়িয়া খালে প্রবেশ করে ৩৩টি নৌকা, যেখানে গােনে আয় প্রায় ২ লাখ ৯৭ হাজার টাকা।

দোবেকী টহল ফাঁড়ির আওতাধীন মেঘনা, ফুটকি, মনোশভেড়ে, আগরাকোনা, বালীঝাকি খালে প্রবেশ করে ১৫০টি নৌকা, যেখানে প্রতিগোনে আয় প্রায় ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এই অর্থ বনবিভাগের নিচতলা থেকে উপরতলা পর্যন্ত ভাগ হয়।

মহাজনের দাদনে প্রবেশ
জেলেদের বড় অংশ মহাজনদের কাছ থেকে দাদন নিয়ে অভয়ারণ্যে যায়। স্থানীয় মহাজনদের মধ্যে বুড়িগোয়ালিনীর আবু হোসেন, গাবুরার মোজাইদুল ইসলাম অয়ন, পাতাখালীর আবু সালেহ, কয়রার কামরুল ইসলাম, বিপুল মন্ডল, হরিনগরের আকবর হোসেন ও রহিম হোসেনসহ অনেকে রয়েছেন। একজন মহাজন গড়ে ৩০ -৩৫ টি নৌকার জেলেদের অর্থায়ন করেন।

জেলেদের অভিযোগ
বুড়িগোয়ালিনী এলাকার জেলে মহাজন মাসুম সানা জানান, গত গোনে নৌকা প্রতি ৭ হাজার টাকা নোটাবেকী টহল ফাড়ির স্টাফ ফরিদ হোসেনকে বুড়িগোয়ালিনীর কালামের দোকানে বসে দিয়ে অভয়ারণ্যে ঢুকতে পেরেছিলাম। কিন্তু এ গোনে টাকা দিতে দেরি হওয়ায় আমার তিনটি নৌকা থেকে ৫ জন জেলেকে ধরে কোর্টে চালান দিয়েছে। তাদের কাছ থেকে ১২৫ কেজি মাছ জব্দ করে মাত্র ২০ কেজি দেখিয়ে চালান দিয়েছে। বাকি মাছ বিক্রি করে টাকা তাদের পকেট ভরেছে।

তবে, মাছ বিক্রির বিষয়টি অস্বীকার করে উক্ত ফাঁড়ির ওসি আনোয়ার হোসেন বলেন, এমন করা হয়নি।

আরেক জেলে রফিকুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, তিনি সাংবাদিকদের কাছে তথ্য দেওয়ায় এবার আর তার নৌকা অভয়ারণ্যে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না।

জেলেদের মহাজন আবু হোসেন বলেন, সুন্দরবনে খোলা বাদা না থাকলে তারা অভয়ারণ্য ঢুকবে এটা স্বাভাবিক। আমার মতো অনেকেই যাচ্ছে বন্ধ হলে সবার হোক।

পরিবেশবাদীদের উদ্বেগ
পরিবেশবাদী সংগঠন ইয়ুথনেট-এর অতিরিক্ত সমন্বয়ক এস এম শাহিন আলম বলেন, অভয়ারণ্য ঘোষণার উদ্দেশ্যই ছিল বনের প্রাণ ও প্রকৃতি রক্ষা করা। কিন্তু টাকার বিনিময়ে অবাধে প্রবেশের কারণে অভয়ারণ্য খাতা-কলমেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এর ফলে শুধু সুন্দরবন নয়, বৈশ্ব ঐতিহ্যও হুমকির মুখে।

তিনি আরো বলেন, সুন্দরবনের মতো আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্যের ভাণ্ডারে এ ধরনের অনিয়ম চলতে থাকলে তা শুধু দেশের সম্পদ নয়, বিশ্ব ঐতিহ্যের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে অপূরণীয় ক্ষতি হবে। অবৈধ প্রবেশ রোধে কঠোর নজরদারি ও প্রযুক্তিনির্ভর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জরুরি।

যা বলছে বনবিভাগ
নোটাবেকী টহল ফাঁড়ির স্টাফ ফরিদ হোসেন, মান্দারবাড়িয়ার মাহফুজ হোসেন ও হলদেবুনিয়ার জাহাঙ্গীর হোসেন তাদের বিরুদ্ধে জেলে-মহাজন-পরিবেশবাদীদের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এছাড়া পুষ্পকাটির কবীর হোসেন ও দোবেকীর করীম মোল্লা একইভাবে নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন।

এ বিষয়ে পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের রেঞ্জার ফজলুল হক বলেন, অভয়ারণ্যে আইন অমান্য করে কেউ প্রবেশ করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর কর্মকর্তাদের যে নামগুলো আসছে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নেপালের বিপক্ষে সিরিজ খেলবে বাংলাদেশ, চূড়ান্ত সূচি প্রকাশ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্ণাঢ্য আয়োজনে ছাত্রদলের নবীন বরণ

তালায় গ্রামীণ সড়কের মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন বিষয়ক কর্মশালা

মথুরেশপুর ইউনিয়ন বিএনপির সম্পাদক হেমায়েত বহিষ্কার

ভারতে সাজাভোগ শেষে দেশে ফিরল শিশুসহ ১৮ বাংলাদেশি

রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করে সৌর বিদ্যুৎ চালুর দাবি

ট্রি অফ লাইফ’র উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ

ভারতসহ ১০ দেশের ওপর শতভাগ শুল্কের প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের

শ্যামনগরে কৃষিপ্রতিবেশবিদ্যা ও জলবায়ু ন্যায্যতা বিষয়ক প্রশিক্ষণ

অবসর নেওয়া মেসিকে নিয়েই দল ঘোষণা আর্জেন্টিনার

১০

সুন্দরবনে ফের এক জেলে অপহৃত, কাটছে না আতঙ্ক

১১

ইরান যুদ্ধের লাগাম টানতে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে প্রস্তাব পাস

১২

হাম উপসর্গে ৮ জনের মৃত্যু, নতুন রোগী ১৩২০

১৩

মেট্রোরেলের দুই প্রকল্পে ব্যয় বাড়ল ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা

১৪

ডেঙ্গুতে ৭ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি নতুন রোগী ১৭৫৩

১৫

৩ মেট্রোরেলসহ একনেকে ১২ প্রকল্প অনুমোদন

১৬

শ্যামনগরে জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবেলায় কর্মশালা

১৭

তালায় ভেজাল সার-কীটনাশক মজুদ, ব্যবসায়ীর জেল-জরিমানা

১৮

মেডিকেল-ডেন্টাল ভর্তি পরীক্ষা হতে পারে ৪ ডিসেম্বর

১৯

সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা–কর্মচারীরা বাড়তি বোনাস নিয়েছেন ১১৬ কোটি টাকা, ফেরত দেওয়ার নির্দেশ

২০
error: Content is protected !!