বাংলাদেশ, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ | সময়:
The Editors
১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮:৪৪ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

আলীম ভাই: বিভেদের সময়ে একজন ভালো মানুষের চলে যাওয়া || মোজাফ্ফর রহমান

কিছু মানুষের চলে যাওয়ার খবর কানে আসে, কিন্তু মন তা সহজে মেনে নিতে চায় না। মনে হয়, মানুষটি হয়তো আবার ফোন করবেন, হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলবেন—‘কী খবর, ভালো আছো?’ অথবা কোনো এক বিকেলে তাঁর ছোট্ট দোকানে গিয়ে বসলে আগের মতোই এক কাপ চা এগিয়ে দিয়ে শুরু করবেন গল্প।

শেখ আব্দুল আলীম ভাইয়ের চলে যাওয়ার খবরটি আমার কাছে ঠিক তেমনই এক অবিশ্বাস্য সংবাদ।

সাতক্ষীরার সাংবাদিকতা ও ব্যবসায়িক অঙ্গনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত পরিচিত ও প্রিয় মুখ। দীর্ঘদিন তিনি দৈনিক পত্রদূত-এর নিজস্ব প্রতিনিধি হিসেবে সাংবাদিকতা করেছেন। পাশাপাশি দৈনিক সদ্যখবর ও দৈনিক সাতক্ষীরা চিত্র পত্রিকাতেও সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার পাশাপাশি মানুষের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়ানোর কারণে তিনি অর্জন করেছিলেন আলাদা এক মানবিক পরিচিতি।

কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল অন্য জায়গায়—তিনি ছিলেন নিরহংকার, নির্লোভ, সাদামাটা এবং মানুষের প্রতি গভীর মমতাসম্পন্ন একজন মানুষ।

দুঃখজনক হলেও সত্য, এই ভালো মানুষটি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন, আকস্মিকভাবে।

১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, শুক্রবার মাগরিবের নামাজের পর রাজধানীর ডক্টর সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তাঁর চলে যাওয়ার সংবাদটি তাই শুধু একটি মৃত্যুসংবাদ নয়; আমার কাছে এটি যেন বহু পুরোনো কিছু স্মৃতির দরজা হঠাৎ খুলে দেওয়া।

তাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে বারবার ফিরে যাচ্ছি ২০০৫ সালের ২৪ জুনের সেই দিনগুলোতে।

সেদিন সাতক্ষীরা কারাগারে ছোট ভাই মনিরুল ইসলাম মনি ও আমি নির্যাতনের শিকার হয়েছিলাম। পরবর্তী সময়ে আমাদের সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকতে হয় বেশ কিছুদিন। সময়টা ছিল আমাদের জীবনের অত্যন্ত কঠিন একটি অধ্যায়। শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি ছিল মানসিক চাপ, অনিশ্চয়তা ও এক ধরনের নিঃসঙ্গতা।

সেই নিঃসঙ্গ সময়ে আলীম ভাই ছিলেন আমাদের পাশে।
একজন সাংবাদিক হিসেবে নয়, একজন আপন মানুষের মতো।

প্রায় প্রতিদিন হাসপাতালে আসতেন তিনি। এসে প্রথমেই জিজ্ঞেস করতেন—শরীরের অবস্থা কেমন? ডাক্তার কী বলেছেন? ঠিকমতো চিকিৎসা হচ্ছে তো? ডাক্তার-নার্সরা খোঁজ নিচ্ছেন তো? নাস্তা করেছি কি না—সেটিও তাঁর জানার বিষয় ছিল।

আজ এত বছর পর বুঝতে পারি, এসব প্রশ্ন নিছক কুশল জিজ্ঞাসা ছিল না। এর ভেতরে ছিল গভীর মানবিক দায়িত্ববোধ।

তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগ আসেনি। খবর জানতে পত্রিকার পাতাই ছিল অন্যতম প্রধান মাধ্যম। আমাদের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন প্রতিবাদ সমাবেশ করতো, বিবৃতি দিতো। কোন পত্রিকায় কী খবর প্রকাশিত হয়েছে—সেটা জানারও আমাদের একটা আগ্রহ ছিল।

আলীম ভাই প্রতিদিন সকালে পত্রিকা হাতে নিয়ে হাসপাতালে হাজির হতেন।

বিভিন্ন পত্রিকায় আমাদের ঘটনা নিয়ে প্রকাশিত খবরগুলো খুঁজে বের করতেন। তারপর সেগুলো আমাদের হাতে দিয়ে বলতেন, ‘দেখো, এখানে তোমাদের নিয়ে খবর হয়েছে।’

ভাবুন তো, একজন সাংবাদিকের নিজের পেশাগত ব্যস্ততার মধ্যেও প্রতিদিন অন্যের জন্য এতটুকু সময় বের করে নেওয়া—এটা কি শুধু দায়িত্ব? -আমার কাছে তা ছিল ভালোবাসা।

শুধু পত্রিকা এনে দেওয়া নয়, আমাদের মনোবল যাতে ভেঙে না যায়, সে বিষয়েও তিনি ছিলেন সতর্ক। কথা বলতেন, সাহস দিতেন। তাঁর আচরণে এমন একটা আশ্বাস থাকত—আমরা একা নই।

হাসপাতালের সঙ্গে আলীম ভাইয়ের একটি আলাদা সম্পর্কও ছিল। তাঁর সহধর্মিণী—আমাদের ভাবী—সেখানে চাকরি করতেন।

সেই সুবাদে হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীদের সঙ্গে তাঁর ভালো সম্পর্ক ছিল। সেই সম্পর্কটুকুও তিনি আমাদের জন্য কাজে লাগিয়েছিলেন। আমাদের চিকিৎসা ঠিকমতো হচ্ছে কি না, কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ে খোঁজ রাখতেন।

মানুষের বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানোর জন্য আলীম ভাইয়ের কোনো বিশেষ উপলক্ষ লাগতো না।

শহরে তাঁর ছোট্ট একটি ইলেকট্রনিক্সের দোকান ছিল। বাসার কোনো ছোটখাটো কাজ নিয়ে সেখানে গেলেও তাঁর আন্তরিকতায় কখনো কমতি দেখিনি।

কাজের কথা শেষ হওয়ার আগেই চায়ের আপ্যায়ন। তারপর সংসারের খবর, ছেলে-মেয়েদের খবর। যেন দোকানে কোনো ক্রেতা আসেননি, এসেছেন তাঁর নিজের একজন মানুষ।

সেই চায়ের আড্ডায় সাংবাদিকতা নিয়ে অনেক কথা হয়েছে।
তিনি পুরোনো দিনের সাংবাদিকতার কথা বলতেন। বর্তমান সময়ের সাংবাদিকতার বাস্তবতা নিয়েও আলোচনা করতেন। কীভাবে সাংবাদিকতা বদলে যাচ্ছে, মানুষের সঙ্গে সাংবাদিকের সম্পর্ক কোথায় দাঁড়িয়ে আছে—এসব নিয়ে তাঁর ছিল নিজস্ব ভাবনা।

আজ তিনি নেই। কিন্তু তাঁর সঙ্গে বলা সেই কথাগুলোই যেন নতুন করে মনে পড়ছে। বিশেষ করে মনে পড়ছে তাঁর সরলতাকে।

আলীম ভাই ছিলেন সাদামাটা মানুষ। তাঁর মধ্যে অহংকার ছিল না। লোভ ছিল না। নিজের অবস্থান নিয়ে বাড়তি কোনো আত্মপ্রদর্শন ছিল না। মানুষের সঙ্গে খুব সহজে মিশতে পারতেন।

আর একটি বিষয় তাঁকে আমার কাছে সবসময় আলাদা করে রেখেছে—তিনি বিভেদের মানুষ ছিলেন না।

আজ যখন সাংবাদিকতার অঙ্গনেও নানা বিভাজন, মতের পার্থক্য ও পারস্পরিক দূরত্ব চোখে পড়ে, তখন আলীম ভাইয়ের কথা আরও বেশি মনে পড়ে। তিনি বিভিন্ন মতের, বিভিন্ন ঘরানার মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে পারতেন। পেশাগত মতপার্থক্য তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ককে বিষিয়ে তুলতো না।

সবার সঙ্গে তাঁর একটা ভালো সম্পর্ক ছিল। কেউ তাঁকে কেবল ‘এক পক্ষের সাংবাদিক’ হিসেবে দেখেনি। তিনি ছিলেন সবার আলীম ভাই।

এই গ্রহণযোগ্যতা কোনো পদ-পদবি দিয়ে অর্জন করা যায় না। এটি অর্জন করতে হয় মানুষের প্রতি আস্থা, সম্মান ও ভালোবাসা দিয়ে। আলীম ভাই সেটিই করেছিলেন।

তাঁর আরেকটি পরিচয় ছিল ব্যবসায়ী নেতা হিসেবে। মৃত্যুর আগপর্যন্ত সাতক্ষীরা জেলা ইলেকট্রনিক ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু আমার চোখে তাঁর সবচেয়ে বড় নেতৃত্ব ছিল অন্য জায়গায়—মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নেতৃত্ব।

২০০৫ সালের সেই হাসপাতালের দিনগুলোতে তিনি আমাদের জন্য কী করেছেন, হয়তো তিনি নিজেও কখনো সেটিকে বড় করে দেখেননি। তিনি হয়তো মনে করতেন, এ তো সামান্য কিছু—মানুষ হিসেবে মানুষের পাশে দাঁড়ানো।

কিন্তু মানুষের জীবনে বড় কাজ সবসময় বড় আকারে আসে না। কখনো একটি পত্রিকার কপি হয়ে আসে। কখনো একটি ‘কেমন আছেন?’ প্রশ্ন হয়ে আসে। কখনো এক কাপ চা হয়ে আসে। কখনো শুধু পাশে বসে দুটো সাহসের কথা বলা হয়ে আসে।

আলীম ভাই আমাদের জন্য সেই ছোট ছোট বড় কাজগুলোই করে গেছেন।

আজ তাঁর মৃত্যুর সংবাদে সাতক্ষীরা শোকাহত। সাংবাদিক সমাজ, ব্যবসায়ী মহল, সুশীল সমাজ—সব জায়গাতেই তাঁর জন্য যে শোক, তার কারণ শুধু তিনি একজন সাংবাদিক বা ব্যবসায়ী নেতা ছিলেন বলে নয়। তাঁর চলে যাওয়ায় মানুষ একজন মানবিক মানুষকে হারিয়েছে।

সময়ের সঙ্গে হয়তো তাঁর দোকানের জায়গায় অন্য দোকান হবে। সাংবাদিকতার মাঠে অন্যরা আসবেন। ব্যবসায়ী সংগঠনের দায়িত্বও অন্য কেউ পালন করবেন। কিন্তু মানুষের মনে একজন ভালো মানুষের যে জায়গা তৈরি হয়, সেই জায়গা সহজে পূরণ হয় না।

বিশ বছর আগের একটি হাসপাতালের স্মৃতি আজও যদি এতটা স্পষ্ট থাকে, তার কারণ সেই স্মৃতির মানুষটি ছিলেন সত্যিকারের মানুষ।

আলীম ভাই, আপনি হয়তো জানতেন না—২০০৫ সালের সেই কঠিন সময়ে আপনার প্রতিদিনের উপস্থিতি আমাদের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

আপনার হাতে সকালে পাওয়া পত্রিকাগুলো হয়তো একসময় হারিয়ে গেছে, কিন্তু সেদিনের আপনার আন্তরিকতা হারায়নি।

সেটিই থেকে গেছে।
থেকে গেছে আপনার সরল হাসি।
থেকে গেছে এক কাপ চায়ের আপ্যায়ন।
থেকে গেছে বিপদের দিনে পাশে দাঁড়ানোর সাহস।
থেকে গেছে মানুষের প্রতি আপনার নিঃশর্ত ভালোবাসা।

আজকের এই বিভেদের সময়ে তাই আলীম ভাইয়ের চলে যাওয়া শুধু একজন মানুষের মৃত্যু নয়; এটি যেন আমাদের মনে করিয়ে দিয়ে গেল—মানুষের পরিচয়ের চেয়ে বড় কোনো পরিচয় নেই।
আর ভালো মানুষ চলে গেলেও তাঁর ভালোবাসার স্মৃতি থেকে যায়।

আলীম ভাইও থাকবেন।
সাতক্ষীরার মানুষের স্মৃতিতে।
সহকর্মীদের স্মৃতিতে।
বন্ধুদের স্মৃতিতে।
আর আমার মতো যাঁরা তাঁর দুঃসময়ের সেই মানবিক মুখটি দেখেছেন, তাঁদের হৃদয়ে আরও গভীরভাবে।

।। বিদায় আলীম ভাই।।।

আপনার মতো সাদা-মাটা, নিরহংকার ও নির্লোভ মানুষদের জন্য পৃথিবী হয়তো কখনো শূন্য হয়ে যায় না। কারণ তাঁরা চলে গেলেও তাঁদের রেখে যাওয়া মানবিকতার আলো অন্যদের পথ দেখায়।

আল্লাহ আপনার সব ভুলত্রুটি ক্ষমা করুন, কবরকে প্রশস্ত করুন এবং আপনাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী, সাবেক সাধারণ সম্পাদক, সাতক্ষীরা প্রেসক্লাব

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জবি শিক্ষকদের গবেষণা : সাশ্রয় হবে ২২% নাইট্রোজেন সারের ব্যবহার

নয়ন ভট্টাচার্যের সুস্থতা কামনা রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদের

আলীম ভাই: বিভেদের সময়ে একজন ভালো মানুষের চলে যাওয়া || মোজাফ্ফর রহমান

সমুদ্রতীরে দীঘি, শাড়িতে ছড়ালেন রূপের দ্যুতি

রিশাদ-আলিসের ঘূর্ণিতে সিরিজ জয় বাংলাদেশের

স্কুলে ভর্তিতে পরীক্ষা হবে তিন বিষয়ে, জানা গেল নতুন নিয়ম

হামের উপসর্গে একদিনে ৭ জনের মৃত্যু

যৌথ ঘোষণায় চূড়ান্ত ঐকমত্য: ‘সব ধরনের আগ্রাসনের’ নিন্দা ব্রিকসের

কালিগঞ্জে বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের প্রস্তুতি সভা

কয়রায় জমি জবর দখলের চেষ্টা, প্রতিকার চেয়ে নারীর সংবাদ সম্মেলন

১০

তালায় বিএনপি নেতার বসতবাড়িতে হামলা-ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন

১১

শার্শায় যুবদল নেতা শহীদের পদ স্থগিতের প্রতিবাদে বিক্ষোভ

১২

তালায় জমি দখলের চেষ্টার অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন

১৩

চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন সাংবাদিক শেখ আব্দুল আলীম

১৪

কালিগঞ্জে মারকাযুল খিদমাহ ফাউন্ডেশনের ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প

১৫

কুষ্ঠরোগ নিয়ে সচেতন হওয়ার আহ্বান

১৬

মফস্বল সাংবাদিকদের আর কত আত্মহনন? || কল্যাণ ব্যানার্জি

১৭

কয়রায় প্রায় ২শ কেজি ঝিনুকসহ ট্রাক জব্দ, কারাগারে ২

১৮

ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় সুন্দরবনের পর্যটন || মো. মামুন হাসান

১৯

সাংবাদিক আব্দুল আলিমের মৃত্যুতে সাতক্ষীরা সাংবাদিক কেন্দ্রের শোক

২০
error: Content is protected !!