বাংলাদেশ, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ | সময়:
The Editors
১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৪২ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় সুন্দরবনের পর্যটন || মো. মামুন হাসান

সুন্দরবনের দিকে তাকালে আমরা সাধারণত একটি বন দেখি। কেউ দেখেন রয়েল বেঙ্গল টাইগার, কেউ দেখেন নদী ও খাল, কেউ দেখেন কেওড়া গাছের সারি, আবার কেউ দেখেন নৌভ্রমণের রোমাঞ্চ। কিন্তু সুন্দরবনকে শুধু দেখার বিষয় হিসেবে দেখলে এর সবচেয়ে বড় সম্ভাবনাটিই অদৃশ্য থেকে যায়। সুন্দরবন একই সঙ্গে একটি প্রতিবেশব্যবস্থা, একটি জীবন্ত সংস্কৃতি, একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় পর্যটন গন্তব্য।

বিশ্ব পর্যটন দিবস ২০২৬ এর প্রতিপাদ্য ডিজিটাল এজেন্ডা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে পর্যটনের পুনর্নকশা। এই প্রতিপাদ্য আমাদের জন্য নিছক প্রযুক্তি ব্যবহারের আহ্বান নয়। এটি পর্যটনকে নতুনভাবে চিন্তা করার একটি সুযোগ। বিশেষ করে সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল একটি প্রাকৃতিক গন্তব্যের ক্ষেত্রে প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। আমরা কি প্রযুক্তি ব্যবহার করে শুধু আরও বেশি পর্যটক সুন্দরবনে আনব, নাকি প্রযুক্তির মাধ্যমে এমন পর্যটন ব্যবস্থা তৈরি করব যেখানে পর্যটকের অভিজ্ঞতা বাড়বে, স্থানীয় মানুষের আয় বাড়বে এবং একই সঙ্গে সুন্দরবনের ওপর চাপ কমবে? আমার বিবেচনায় দ্বিতীয় পথটিই বাংলাদেশের জন্য অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ব পর্যটনের চরিত্র দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। একজন পর্যটক এখন গন্তব্যে পৌঁছানোর অনেক আগেই তার ভ্রমণ শুরু করেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি দেখেন, অনলাইনে তথ্য খোঁজেন, আবহাওয়া পরীক্ষা করেন, মানচিত্রে পথ দেখেন, থাকার জায়গা নির্বাচন করেন, অন্য পর্যটকের অভিজ্ঞতা পড়েন এবং নিজের পছন্দ অনুযায়ী ভ্রমণ পরিকল্পনা তৈরি করেন। ফলে একটি গন্তব্যের প্রতিযোগিতা এখন শুধু তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে নয়, তার ডিজিটাল উপস্থিতির সঙ্গেও।

সুন্দরবনের ক্ষেত্রে এখানেই আমাদের বড় ঘাটতি। সুন্দরবন সম্পর্কে বিশ্বের মানুষের আগ্রহ রয়েছে, কিন্তু সেই আগ্রহকে একটি সুসংগঠিত ডিজিটাল পর্যটন অভিজ্ঞতায় রূপান্তরের কাজ এখনও যথেষ্ট এগোয়নি। একজন বিদেশি পর্যটক সুন্দরবনে আসতে চাইলে তার জন্য এক জায়গায় নির্ভরযোগ্য তথ্য, অনুমতি, পরিবহন, নৌযান, গাইড, আবহাওয়া, জোয়ারভাটা, নিরাপত্তা, থাকার ব্যবস্থা, স্থানীয় খাবার এবং কমিউনিটিভিত্তিক পর্যটনের তথ্য পাওয়া কতটা সহজ, সেই প্রশ্নের উত্তর আমাদের নতুন করে খুঁজতে হবে।

সুন্দরবনের জন্য একটি সমন্বিত স্মার্ট ডেস্টিনেশন প্ল্যাটফর্ম এখন সময়ের দাবি। এই প্ল্যাটফর্মে একজন পর্যটক তার ভ্রমণের উদ্দেশ্য জানাবেন। কেউ বন্যপ্রাণী দেখতে চান, কেউ প্রকৃতি ও ফটোগ্রাফিতে আগ্রহী, কেউ স্থানীয় সংস্কৃতি জানতে চান, কেউ নদীভিত্তিক ভ্রমণ করতে চান, আবার কেউ কয়েক দিনের জন্য গ্রামীণ জীবন ও সুন্দরবনের মানুষের সঙ্গে থাকতে চান। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পর্যটকের পছন্দ, সময়, বাজেট এবং পরিবেশগত সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করে তার জন্য একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক ভ্রমণ পরিকল্পনা তৈরি করতে পারে।

এতে পর্যটন ব্যবস্থাপনার ধরনই বদলে যেতে পারে। ধরা যাক, কোনো একটি মৌসুমে সুন্দরবনের একটি নির্দিষ্ট এলাকায় পর্যটকের চাপ বেড়ে গেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যদি পর্যটকের প্রবাহের তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে, তাহলে পর্যটকদের অন্য উপযোগী এলাকায় পাঠানো সম্ভব হবে। কোনো সংবেদনশীল এলাকায় পরিবেশগত চাপ বাড়লে সেখানে প্রবেশ সীমিত করা যেতে পারে। আবার কোনো এলাকায় পর্যটক কম থাকলে সেখানকার স্থানীয় উদ্যোক্তাদের পর্যটন পণ্য উন্নয়নে উৎসাহিত করা যেতে পারে। অর্থাৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শুধু পর্যটক বাড়ানোর প্রযুক্তি নয়। সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে এটি পর্যটক ব্যবস্থাপনার প্রযুক্তি হতে পারে।

সুন্দরবনের মতো একটি ভঙ্গুর প্রতিবেশব্যবস্থার ক্ষেত্রে এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পর্যটনের সাফল্য শুধু কতজন মানুষ সুন্দরবনে গেলেন, তা দিয়ে মাপা উচিত নয়। বরং দেখতে হবে কতজন পর্যটক এসেছেন, কতক্ষণ অবস্থান করেছেন, কোথায় গেছেন, কতটা অর্থ স্থানীয় অর্থনীতিতে রেখে গেছেন এবং প্রকৃতির ওপর কতটা চাপ সৃষ্টি করেছেন। আমাদের পর্যটন পরিসংখ্যানেও এই পরিবর্তন প্রয়োজন। শুধু পর্যটকের সংখ্যা গণনা করে পর্যটনের সাফল্য নির্ধারণ করলে চলবে না। পর্যটকের অবস্থানকাল, মাথাপিছু ব্যয়, স্থানীয় পণ্য ও সেবায় ব্যয়ের পরিমাণ, স্থানীয় মানুষের আয়, পরিবেশগত চাপ এবং পর্যটকের সন্তুষ্টির মতো সূচককে পর্যটন পরিকল্পনার অংশ করতে হবে। বিশেষ করে সুন্দরবনের ক্ষেত্রে প্রয়োজন হতে পারে একটি স্মার্ট ক্যারিং ক্যাপাসিটি মডেল। অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট সময়ে সুন্দরবনের কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় কতজন পর্যটক প্রবেশ করলে পরিবেশের ওপর গ্রহণযোগ্য মাত্রার চাপ সৃষ্টি হবে, তা তথ্য ও প্রযুক্তির মাধ্যমে নির্ধারণ করা। পর্যটকের সংখ্যা একটি নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ কিংবা সময় পুনর্বিন্যাসের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে পর্যটন এবং সংরক্ষণের মধ্যে যে প্রচলিত দ্বন্দ্ব রয়েছে, তা অনেকটাই কমানো সম্ভব।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আরেকটি বড় ব্যবহার হতে পারে বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণে। ক্যামেরা ট্র্যাপ, স্যাটেলাইট তথ্য, সেন্সর এবং অন্যান্য ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে পাওয়া বিপুল তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রাণীর চলাচল, পরিবেশগত পরিবর্তন এবং মানবিক চাপ সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়া সম্ভব। কোথাও অনিয়ন্ত্রিত নৌযান চলাচল বাড়ছে কি না, কোথাও পর্যটকের চাপ অস্বাভাবিক হচ্ছে কি না কিংবা কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে পরিবেশগত পরিবর্তন ঘটছে কি না, প্রযুক্তির মাধ্যমে এসব বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব। তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। সুন্দরবনে প্রযুক্তির ব্যবহার হবে প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নয়, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে আরও দায়িত্বশীল করার জন্য।

সুন্দরবনের পর্যটনকে শুধু বনভ্রমণে সীমাবদ্ধ রাখারও সুযোগ নেই। সুন্দরবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মানুষ এবং সংস্কৃতি। বনবিবির আখ্যান, বাউল গান, স্থানীয় লোকসংস্কৃতি, মধু সংগ্রহের ঐতিহ্য, জেলে সম্প্রদায়ের জীবন, স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতি, নৌযাত্রা এবং উপকূলীয় মানুষের জীবনসংগ্রাম সুন্দরবনের পর্যটন অভিজ্ঞতার অবিচ্ছেদ্য অংশ হতে পারে।শ্যামনগর ও সুন্দরবনসংলগ্ন জনপদগুলোতে পরিকল্পিত হোমস্টে গড়ে উঠতে পারে। একজন পর্যটক সেখানে গিয়ে শুধু একটি ঘরে রাত কাটাবেন না। তিনি স্থানীয় খাবার খাবেন, গ্রামের মানুষের জীবন দেখবেন, নদীতে নৌভ্রমণ করবেন, স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হবেন এবং সুন্দরবনকে বইয়ের বাইরে জীবনের ভেতর থেকে বুঝবেন। এখানে ডিজিটাল প্রযুক্তি স্থানীয় মানুষের জন্য নতুন বাজার তৈরি করতে পারে।

একজন স্থানীয় নারী ঘরে খাবার তৈরি করছেন, একজন তরুণ নৌভ্রমণের ব্যবস্থা করছেন, কেউ স্থানীয় হস্তশিল্প তৈরি করছেন, কেউ প্রশিক্ষিত প্রকৃতি গাইড হিসেবে কাজ করছেন। তাদের সেবা যদি একটি নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা যায়, তাহলে পর্যটক এবং স্থানীয় উদ্যোক্তার মধ্যে সরাসরি সংযোগ তৈরি হবে। এতে পর্যটনের অর্থনৈতিক সুফল মধ্যস্বত্বভোগীর পরিবর্তে স্থানীয় মানুষের কাছে বেশি পৌঁছাতে পারে। সুন্দরবনের পর্যটনের ভবিষ্যৎ তাই শুধু চাকরির বাজারে নয়, উদ্যোক্তা তৈরির মধ্যেও নিহিত। উপকূলীয় এলাকার একজন তরুণ হতে পারেন ডিজিটাল ট্যুর গাইড। কেউ হতে পারেন নেচার ইন্টারপ্রেটার। কেউ তৈরি করতে পারেন হোমস্টে। কেউ পরিচালনা করতে পারেন নদীভিত্তিক পর্যটন। কেউ স্থানীয় খাবারকে পর্যটন পণ্যে রূপ দিতে পারেন। কেউ আবার সুন্দরবনের গল্প, সংস্কৃতি ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করতে পারেন।

এই জায়গায় পর্যটন শিক্ষার সঙ্গে প্রযুক্তি শিক্ষার সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি। আগামী দিনের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট শিক্ষার্থীকে শুধু হোটেল ব্যবস্থাপনা কিংবা ট্রাভেল এজেন্সির প্রচলিত জ্ঞান দিলে হবে না। তাকে ডেটা বিশ্লেষণ, ডিজিটাল মার্কেটিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জিআইএস, স্মার্ট ডেস্টিনেশন ম্যানেজমেন্ট, পরিবেশবান্ধব পর্যটন এবং কমিউনিটিভিত্তিক পর্যটনের সঙ্গে পরিচিত করতে হবে। কারণ পর্যটনের আগামী দিনের প্রতিযোগিতা হবে দক্ষতা ও প্রযুক্তির প্রতিযোগিতা।

সুন্দরবনের পর্যটনে আরেকটি বড় পরিবর্তন প্রয়োজন পর্যটন প্রচারণায়। আমরা এখনও অনেক সময় সুন্দরবনকে শুধু বাঘ দেখার জায়গা হিসেবে তুলে ধরি। অথচ সুন্দরবন গল্প বাঘের চেয়ে অনেক বড়। সুন্দরবন নদীর গল্প, মানুষের গল্প, জলবায়ুর গল্প, জীববৈচিত্র্যের গল্প, বনবিবির গল্প, মধু সংগ্রহকারীর গল্প, জেলের গল্প, উপকূলের সংগ্রামের গল্প। সুন্দরবনকে যদি আমরা শুধু একটি প্রাণী দেখার গন্তব্য হিসেবে বাজারজাত করি, তাহলে এর বিশাল সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত মূল্যকে ছোট করে ফেলা হবে। আমাদের প্রচারণার ভাষাও বদলাতে হবে। বার্তা হতে পারে, বাঘ দেখতে নয়, সুন্দরবন বুঝতে আসুন।

একজন পর্যটক যখন সুন্দরবন থেকে ফিরে যাবেন, তখন তার সঙ্গে শুধু কিছু ছবি নয়, সুন্দরবন রক্ষার একটি দায়িত্ববোধও ফিরে যাওয়া উচিত। এই পরিবর্তন ঘটাতে পারে স্মার্ট ডিজিটাল ইন্টারপ্রিটেশন। কিউআর কোড, অগমেন্টেড রিয়েলিটি, বহুভাষিক অডিও গাইড এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ভার্চুয়াল সহকারী ব্যবহার করে পর্যটককে তার অবস্থানভিত্তিক তথ্য দেওয়া সম্ভব। একজন পর্যটক কটকা, কচিখালী, করমজল কিংবা অন্য কোনো দর্শনীয় স্থানে দাঁড়িয়ে তার মোবাইল ফোনে একটি কিউআর কোড স্ক্যান করলেন। সঙ্গে সঙ্গে তার সামনে খুলে গেল সেই এলাকার ইতিহাস, জীববৈচিত্র্য, নদী ও জোয়ারভাটার তথ্য, স্থানীয় মানুষের জীবন এবং পরিবেশগত গুরুত্ব। পর্যটন তখন শুধু বিনোদন থাকবে না, হয়ে উঠবে একটি চলমান শিক্ষার অভিজ্ঞতা।

তবে প্রযুক্তিনির্ভর পর্যটনের সঙ্গে কিছু ঝুঁকিও রয়েছে।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো একটি স্থান জনপ্রিয় হয়ে গেলে সেখানে হঠাৎ পর্যটকের চাপ তৈরি হতে পারে। বন্যপ্রাণীর অবস্থান প্রকাশ করে দেওয়া, প্রাণীর খুব কাছে গিয়ে ছবি তোলা, অতিরিক্ত শব্দ করা কিংবা প্লাস্টিক ও বর্জ্য ফেলার মতো আচরণও বাড়তে পারে। তাই সুন্দরবনের ডিজিটাল পর্যটন ব্যবস্থায় পর্যটকের আচরণবিধি, পরিবেশগত সতর্কতা এবং দায়িত্বশীল ভ্রমণের বিষয়টি বাধ্যতামূলকভাবে যুক্ত করতে হবে।

প্রযুক্তি তখনই সফল হবে, যখন তা পর্যটকের স্বাধীনতা ও প্রকৃতির নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে পারবে। এ জন্য সুন্দরবনের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি ডিজিটাল ট্যুরিজম মাস্টারপ্ল্যান প্রয়োজন। সেখানে পর্যটন, বন সংরক্ষণ, স্থানীয় সরকার, নৌপরিবহন, বেসরকারি খাত, পর্যটন উদ্যোক্তা, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। প্রয়োজন একটি কেন্দ্রীয় পর্যটন ডেটা সিস্টেম। প্রয়োজন ডিজিটাল অনুমতি ব্যবস্থা। প্রয়োজন পর্যটক প্রবাহের তথ্য বিশ্লেষণ। প্রয়োজন প্রশিক্ষিত স্থানীয় গাইডের ডিজিটাল ডাটাবেজ। প্রয়োজন পরিবেশগত ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ। প্রয়োজন স্থানীয় উদ্যোক্তাদের ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস। প্রয়োজন বহুভাষিক তথ্যসেবা। সর্বোপরি প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থাপনা যেখানে সুন্দরবনের সংরক্ষণ এবং পর্যটন একে অন্যের প্রতিপক্ষ নয়, বরং পরস্পরের সহায়ক শক্তি হয়ে ওঠে।

সুন্দরবন বাংলাদেশের পশ্চিম উপকূলের শুধু একটি বন নয়। এটি বাংলাদেশের জলবায়ু নিরাপত্তার অন্যতম প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা, জীববৈচিত্র্যের আধার এবং একই সঙ্গে একটি সম্ভাবনাময় পর্যটন অর্থনীতি। তাই সুন্দরবনের পর্যটন নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হলে আমাদের শুধু বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টিতে তাকালে হবে না। পরিবেশ, বন, স্থানীয় সরকার, নৌপরিবহন, তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা এবং স্থানীয় অর্থনীতির সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। বিশ্ব পর্যটন দিবসের প্রতিপাদ্য আমাদের সেই সুযোগটি তৈরি করে দিয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি সুন্দরবনের পর্যটনকে গত শতাব্দীর কাঠামোতেই পরিচালনা করব, নাকি একবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তিনির্ভর, তথ্যভিত্তিক এবং পরিবেশসংবেদনশীল পর্যটন ব্যবস্থায় নিয়ে যাব? সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই সিদ্ধান্তের ওপর। আমাদের মনে রাখতে হবে, পর্যটনের সবচেয়ে বড় সাফল্য পর্যটক বাড়ানো নয়, একটি গন্তব্যের মূল্য বাড়ানো। সুন্দরবনের ক্ষেত্রে সেই মূল্য শুধু অর্থনৈতিক নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জীববৈচিত্র্য, স্থানীয় মানুষের জীবন, উপকূলের ভবিষ্যৎ এবং বাংলাদেশের পরিবেশগত নিরাপত্তা।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের সিদ্ধান্তকে দ্রুত ও তথ্যভিত্তিক করতে পারে। ডিজিটাল প্রযুক্তি সুন্দরবনকে বিশ্বের মানুষের কাছে নতুনভাবে তুলে ধরতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সুন্দরবনকে রক্ষা করবে মানুষের দায়িত্বশীলতা। তাই বিশ্ব পর্যটন দিবস ২০২৬ এ আমাদের অঙ্গীকার হোক, স্মার্ট পর্যটন চাই, কিন্তু প্রকৃতির বিনিময়ে নয়। ডিজিটাল সুন্দরবন চাই, কিন্তু জীবন্ত সুন্দরবনকে অক্ষুণ্ন রেখেই। সুন্দরবনকে শুধু পর্যটনের গন্তব্য নয়, আগামী দিনের টেকসই পর্যটনের একটি বৈশ্বিক মডেল হিসেবে গড়ে তোলাই হোক বাংলাদেশের নতুন লক্ষ্য।

লেখক: ইন্সট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মফস্বল সাংবাদিকদের আর কত আত্মহনন? || কল্যাণ ব্যানার্জি

কয়রায় প্রায় ২শ কেজি ঝিনুকসহ ট্রাক জব্দ, কারাগারে ২

ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় সুন্দরবনের পর্যটন || মো. মামুন হাসান

সাংবাদিক আব্দুল আলিমের মৃত্যুতে সাতক্ষীরা সাংবাদিক কেন্দ্রের শোক

সাংবাদিক আলিমের মৃত্যুতে সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের শোক

সাংবাদিক শেখ আব্দুল আলিম আর নেই

বাব আল-মান্দেব প্রণালির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিলো হুথিরা

গুলশানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আ.লীগের ঝটিকা মিছিল, ককটেল বিস্ফোরণ, গ্রেপ্তার ২

বিএনপি সরকার জাতির সঙ্গে গাদ্দারি করেছে: শহিদুল ইসলাম মুকুল

সাতক্ষীরা পৌরসভা সুইপার কল্যাণ ইউনিয়নের নির্বাচন: গফুর সভাপতি, গণেশ সম্পাদক

১০

কয়রায় ১০ দিনব্যাপী বৃক্ষমেলা উদ্বোধন

১১

জবি ক্যারিয়ার ক্লাবের আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় বিজনেস কেস কম্পিটিশনের রেজিস্ট্রেশন শুরু

১২

নলতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের কমিটি গঠন

১৩

দেবহাটায় কমিউনিটি পুলিশিং কাবাডি চ্যাম্পিয়ানশিপের বাছাই ম্যাচ

১৪

সুন্দরবনে বিষ দিয়ে মাছ শিকার, আটক জেলে কারাগারে

১৫

সাতক্ষীরায় বাড়ছে ডেঙ্গু, সচেতনতায় বাড়ি বাড়ি ভিবিডির স্বেচ্ছাসেবকেরা

১৬

ইন্টোরিয়র ডিজাইনে আধুনিক সেবার প্রত্যয়ে যাত্রা করলো এস এস এন্টারপ্রাইজ

১৭

বৈরী আবহাওয়ার সুযোগে কালিন্দী নদীপথে বিএসএফের পুশ-ইনের চেষ্টা, ব্যর্থ করে দিয়েছে বিজিবি

১৮

ইয়েমেনের পুরো লোহিত সাগর উপকূল নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে হুথি যোদ্ধারা

১৯

জিয়া ফাউন্ডেশনের নেতা পরিচয়ে চাঁদাবাজি ও মাদক কারবারী, গ্রেপ্তারের দাবিতে বিএনপি নেতাদের মানববন্ধন

২০
error: Content is protected !!