
মোঃ ফরহাদ হোসেন, কয়রা (খুলনা): একদিকে কপোতাক্ষ ও শাকবাড়িয়া নদীর জলরাশি, অন্যদিকে পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। এর সঙ্গে নদী-খাল, জীববৈচিত্র্য, ইতিহাস, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও মুন্ডা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী জীবনযাপন—সব মিলিয়ে খুলনার কয়রা হতে পারে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণীয় ইকো-ট্যুরিজমের গন্তব্য। পরিকল্পিত পর্যটন অবকাঠামো গড়ে উঠলে পর্যটক আকর্ষণের পাশাপাশি সৃষ্টি হতে পারে বিপুল কর্মসংস্থান। এতে সুন্দরবননির্ভর মানুষের বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি হয়ে কমতে পারে বনের ওপর অতিরিক্ত চাপ।
আজ ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবস। এ বছরের দিবসটি ঘিরে বিশ্বজুড়ে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পর্যটনের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এমন সময়ে সুন্দরবনের কোলঘেঁষা কয়রার পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।
খুলনা জেলা শহর থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দক্ষিণে কয়রা উপজেলা। উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা সুন্দরবনসংলগ্ন। পাশ দিয়ে বয়ে গেছে কপোতাক্ষ ও শাকবাড়িয়া নদী। নদীর ওপারেই দেখা মেলে সুন্দরবনের সবুজ দেয়াল। কেওড়া, গেওয়া, বাইন, সুন্দরীসহ নানা প্রজাতির গাছপালা, নদী-খাল, পাখি ও বন্যপ্রাণীর উপস্থিতি এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে করেছে বৈচিত্র্যময়।
কেওড়াকাটায় পর্যটন কেন্দ্র, থমকে আছে নির্মাণকাজ
কয়রা সদরের ৬ নম্বর কয়রা গ্রামের শাকবাড়িয়া নদীর তীরে কেওড়াকাটা এলাকায় নির্মিত হচ্ছে ‘সুন্দরবন’ পর্যটন কেন্দ্র। সুন্দরবনের একেবারে কাছাকাছি হওয়ায় সম্ভাবনাময় এ স্থানটি ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক প্রত্যাশা। তবে নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ না হওয়ায় সেই সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

এ এলাকায় রয়েছে মুন্ডা সম্প্রদায়ের বসবাস। পর্যটনকেন্দ্রটি চালু হলে প্রকৃতির পাশাপাশি স্থানীয় মুন্ডা জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গেও পর্যটকদের পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া ৪ নম্বর কয়রা লঞ্চঘাট, কাটকাটা, গোবরা ম্যানগ্রোভ বনসহ সুন্দরবনঘেঁষা আরও কয়েকটি স্থানকে পরিকল্পিতভাবে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।
ইতিহাস-ঐতিহ্যও হতে পারে পর্যটনের আকর্ষণ
কয়রার পর্যটন মানচিত্রে যুক্ত হতে পারে ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনও। উত্তর বেদকাশীতে রাজা প্রতাপাদিত্যের স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনা, আমাদীতে বোরহান খাঁ ওরফে বুড়া খাঁ এবং তাঁর ছেলে ফতে খাঁর স্মৃতিচিহ্ন ইতিহাসপ্রেমীদের আকৃষ্ট করতে পারে।

সহজ যোগাযোগে কম খরচে সুন্দরবন ভ্রমণ
খুলনা থেকে সড়কপথে সহজেই কয়রায় পৌঁছানো যায়। খুলনার সোনাডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড থেকে সরাসরি বাসে কয়রা সদরে আসতে সময় লাগে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা। এরপর মদিনাবাদ মডেল সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় মোড় থেকে ইজিবাইক বা মোটরসাইকেলে কয়েক মিনিটেই পৌঁছানো যায় ৪ নম্বর কয়রা লঞ্চঘাট ও ৬ নম্বর কয়রা এলাকার পর্যটনকেন্দ্রসংলগ্ন স্থানে।

কয়রা সদরে পর্যটকদের থাকার জন্য রয়েছে কয়েকটি আবাসিক হোটেল। ফলে তুলনামূলক কম খরচে অবস্থান করে একাধিক পর্যটন স্পট ঘুরে দেখার সুযোগ রয়েছে।
এক সফরেই নদী, বন ও ইতিহাস
কয়রায় পৌঁছে কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশন থেকে প্রয়োজনীয় অনুমতি ও পাস নিয়ে ট্রলারে সুন্দরবনের বিভিন্ন পর্যটন স্পটে যাওয়া সম্ভব। শেখেরটেক ও কালাবগী ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্র, হিরণ পয়েন্ট, দুবলার চর ও শুঁটকি পল্লীসহ সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সুন্দরবনের শেখেরটেক ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্রের পুরোনো স্থাপনাগুলোও পর্যটকদের আকর্ষণের অন্যতম উপাদান। বন, নদী, বন্যপ্রাণী ও ঐতিহাসিক স্থাপনা—সব মিলিয়ে কয়রাকে ঘিরে তৈরি হতে পারে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন সার্কিট।

পর্যটন সংশ্লিষ্টদের মতে, কয়রায় পর্যটন অবকাঠামো গড়ে উঠলে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। নৌযান চালক, ট্যুর গাইড, হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ, হোমস্টে, পরিবহন, স্থানীয় খাবার ও হস্তশিল্পসহ বিভিন্ন খাতে মানুষের আয় বাড়তে পারে। বিশেষ করে সুন্দরবননির্ভর জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালদের জন্য পর্যটন হতে পারে বিকল্প আয়ের একটি বড় উৎস। এতে জীবন-জীবিকার বৈচিত্র্য বাড়ার পাশাপাশি সুন্দরবনের ওপর মানুষের অতিরিক্ত নির্ভরতাও কমতে পারে।
কয়রা কপোতাক্ষ কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আ.ব.ম. আব্দুল মালেক বলেন, সম্ভাবনাময় পর্যটন স্পটগুলোতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও আবাসনের ব্যবস্থা করা গেলে কয়রা হয়ে উঠতে পারে ইকো-ট্যুরিজমের স্বর্গভূমি। এতে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়বে।
দীর্ঘদিনের দাবি, বাস্তবায়নের অপেক্ষা
২০১৮ সাল থেকে কয়রার সম্ভাবনাময় এলাকায় আধুনিক পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার দাবি জানিয়ে আসছে উপকূলের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ইনিশিয়েটিভ ফর কোস্টাল ডেভেলপমেন্ট (আইসিডি)।
সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা আশিকুজ্জামান বলেন, সুন্দরবনবেষ্টিত বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম উপজেলা কয়রায় পরিকল্পিতভাবে পর্যটন শিল্প গড়ে উঠলে এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। মানুষের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীলতাও কমবে। কেওড়াকাটায় নির্মাণাধীন পর্যটনকেন্দ্রের কাজ দ্রুত শেষ করে পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করা প্রয়োজন।
তবে পর্যটন বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়দের মতে, শুধু পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণ করলেই হবে না। প্রয়োজন নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা, উন্নত স্যানিটেশন, আবাসন, পর্যটক নিরাপত্তা, প্রশিক্ষিত গাইড, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশবান্ধব নৌযানের ব্যবস্থা। একই সঙ্গে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পর্যটন পরিচালনা করতে হবে।
সঠিক পরিকল্পনা ও টেকসই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সুন্দরবনের কোলঘেঁষা কয়রা হয়ে উঠতে পারে প্রকৃতি, ইতিহাস ও নদীভিত্তিক ইকো-ট্যুরিজমের নতুন ঠিকানা। আর পর্যটনের হাত ধরে সৃষ্টি হতে পারে উপকূলের মানুষের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। যার সুফলে মানুষের জীবন-জীবিকার উন্নয়নের পাশাপাশি সুন্দরবনও পেতে পারে বাড়তি সুরক্ষা।
মন্তব্য করুন