

বিলাল হোসেন: সুন্দরবন শুধু বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন নয়, উপকূলীয় জনপদের হাজারো মানুষের জীবন জীবিকার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এক প্রাকৃতিক সম্পদ।
যুগের পর যুগ সুন্দরবনের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন জেলে, বাওয়ালো, মৌয়াল, কাঁকড়া শিকারি ও নৌকার মাঝিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
তবে বনজ সম্পদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং জীবিকার অনিশ্চয়তায় এসব মানুষের অনেকেই এখন কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি।
এক্ষেত্রে পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব পর্যটনকে কেন্দ্র করে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা গেলে সুন্দরবন নির্ভর মানুষের জীবনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
সুন্দরবনকে ঘিরে পর্যটনের বিকাশ হলে স্থানীয় মানুষ পর্যটক পরিবহন, নৌযান পরিচালনা, গাইড, খাবার সরবরাহ, হস্তশিল্প, স্থানীয় পণ্য বিক্রি, আবাসন ও সাংস্কৃতিক সেবাসহ নানা খাতে যুক্ত হতে পারেন।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর, মুন্সিগঞ্জ, বুড়িগোয়ালিনী, গাবুরা, পদ্মপুকুরসহ সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার মানুষের মধ্য পর্যটনকে ঘিরে ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে।
পরিকল্পিতভাবে সুন্দরবনের ভিতরে এবং বাইরে সুন্দর সুন্দর পর্যটন স্পট তৈরির পাশাপাশি টুরিস্টদের রাত্রী যাপনের জন্য হোটেল মোটেলের ব্যবস্থা করতে হবে। অনেকের কাছে সুন্দরবন কেবল বন নয়, এটি তাদের জীবন, সংস্কৃতি ও জীবিকার অংশ। কিন্তু পর্যটনকেন্দ্রিক অবকাঠামো ও পরিকল্পিত উদ্যোগের অভাবে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ এখনো এই সম্ভাবনার পূর্ণ সুফল পাচ্ছেন না।
এ অ্যান্ড আর ট্রাভেলসের পরিচালক মাহবুব আলম জানান, সুন্দরবনে পর্যটক বাড়লে সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে স্থানীয় নৌকার মাঝি ও বনসংলগ্ন এলাকার তরুণদের জন্য। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের পর্যটক গাইড হিসেবে গড়ে তোলা গেলে একদিকে কর্মসংস্থান তৈরি হবে। অন্যদিকে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, স্থানীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে পর্যটকদের কাছে বাস্তব তথ্য তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে। স্থানীয়ভাবে তৈরি মধু, মোম, কেওড়া ফলের পণ্য, গোলপাতার সামগ্রী, বাঁশ-বেতের হস্তশিল্প, শুঁটকি, স্থানীয় খাবার ও অন্যান্য পণ্য পর্যটকদের কাছে বাজারজাত করা যেতে পারে। এতে নারীদের জন্যও ঘরে বসে আয় করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বনজীবী নারী উন্নয়ন সংগঠনের সভানেত্রী শেফালী বেগম বলেন, সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় এলাকার বহু নারী পরিবারের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সরাসরি বা পরোক্ষভাবে সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। পর্যটনকে কেন্দ্র করে নারী উদ্যোক্তা তৈরি করা গেলে তাদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে। স্থানীয় খাবারের রেস্তোরাঁ, হোমস্টে, হস্তশিল্প, বনজ ও কৃষিজ পণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং পর্যটকদের জন্য স্মারক সামগ্রী তৈরির ক্ষেত্রে নারীদের সম্পৃক্ত করা সম্ভব। তবে এ জন্য প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ, বাজার সংযোগ এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
স্থানীয় টুরিস্ট বোটের মালিক আনিসুর রহমান ও জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সুন্দরবনে পর্যটক বাড়ানোর পাশাপাশি পর্যটন ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। বাইরে থেকে ব্যবসায়ী এসে পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসা পরিচালনা করলে স্থানীয় মানুষ কেবল শ্রমিক হিসেবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। কিন্তু স্থানীয়দের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে পর্যটনের অর্থনৈতিক সুফল সরাসরি উপকূলীয় মানুষের ঘরে পৌঁছাবে।
এ জন্য পর্যটনকেন্দ্রিক সমবায় গঠন, স্থানীয় তরুণদের প্রশিক্ষণ, নৌযান ব্যবস্থাপনা, পর্যটক গাইডের স্বীকৃতি, নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ এবং স্থানীয় পণ্যের ব্র্যান্ডিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
স্থানীয় সমাজকর্মী গাজী আল ইমরান জানান, সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটনের অন্যতম বড় বাধা যোগাযোগব্যবস্থা ও পর্যটনভিত্তিক অবকাঠামোর ঘাটতি। পর্যটন স্পটগুলোতে নিরাপদ নৌযান, পর্যাপ্ত জেটি, পরিচ্ছন্ন শৌচাগার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, তথ্যকেন্দ্র ও জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে পর্যটকদের জন্য নির্দিষ্ট রুট ও সময়সূচি তৈরি এবং প্রশিক্ষিত গাইডের মাধ্যমে পর্যটন পরিচালনা করা হলে সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি পর্যটকদের অভিজ্ঞতাও উন্নত করা সম্ভব।
পরিবেশবিদ মোহন কুমার মন্ডল বলেন, সুন্দরবনের পর্যটন সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা। অতিরিক্ত পর্যটক, প্লাস্টিক বর্জ্য, শব্দদূষণ, অনিয়ন্ত্রিত নৌযান চলাচল কিংবা বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলে মানুষের অনুপ্রবেশ সুন্দরবনের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
তাই পর্যটনের পরিকল্পনা হতে হবে সুন্দরবনের ধারণক্ষমতা ও পরিবেশগত সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় রেখে। নির্দিষ্ট এলাকায় নির্দিষ্ট সংখ্যক পর্যটক প্রবেশ, বর্জ্য ফিরিয়ে আনা, প্লাস্টিক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং বন্যপ্রাণীর কাছাকাছি যাওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ম বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
বন বিভাগের বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন কর্মকর্তা এরফান উদ্দিন বলেন, সুন্দরবনকে ঘিরে পর্যটন উন্নয়নের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারেন স্থানীয় মানুষ। তারা সুন্দরবনের পথঘাট, নদী খাল, জোয়ার ভাটা, স্থানীয় সংস্কৃতি ও প্রকৃতি সম্পর্কে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রাখেন। সেই অভিজ্ঞতাকে প্রশিক্ষণ ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে স্থানীয় মানুষই হয়ে উঠতে পারেন সুন্দরবন পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
সুন্দরবন নির্ভর মানুষের দীর্ঘদিনের জীবিকা শুধু বনজ সম্পদ আহরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পর্যটন, কৃষি, মৎস্য, হস্তশিল্প ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে তাদের ওপর বনের চাপও কমতে পারে।
শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামসুজ্জামান কনক বলেন, এ অঞ্চলের পর্যটন খাতকে আমরা মিনিস্ট্রি পর্যায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি। পাশাপাশি
স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সমন্বিত পরিকল্পনায় সুন্দরবনকে ঘিরে একটি টেকসই পর্যটন অর্থনীতি গড়ে উঠতে পারে। এতে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষার পাশাপাশি উপকূলের মানুষের জন্য সৃষ্টি হতে পারে নতুন কর্মসংস্থান ও আয়ের পথ। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের পর্যটন উপর নির্ভরশীল মানুষকে সব সময় সার্বিক সহযোগিতা করবে।
মন্তব্য করুন