
শ্যামনগর প্রতিনিধি: ‘আমার যখন ১৫ বছর বয়স তখন থেকে আমি এই কাজ করছি। আমার বাপ-ঠাকুরদাও এই কাজ করতেন। পূজা-পার্বণ ঘিরে বছরে চার মাস কাজ হয়, আর বাকি ৮ মাস বসে থাকতে হয়। সারা বছর কাজ না থাকলেও এ পেশা ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবিনি। এখন ছেলেমেয়েরা এই কাজ শিখতে চায় না। আমি চলে যাওয়ার পর এই পেশা আমার পরিবারের আর কেউ ধরে রাখতে পারবে না।’
চোখে মুখে হতাশা নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন সাতক্ষীরার শ্যামনগরের বংশীপুর ঋষিপাড়ার ভাই ভাই বাদ্য ভান্ডারের মালিক সত্তোরোর্ধ্ব সুনীল চন্দ্র দাস। দুর্গাপূজা সামনে রেখে এখন তাঁর দোকানে দম ফেলার ফুরসত নেই। কিন্তু উৎসবের এই ব্যস্ততা তাঁর কাছে স্থায়ী কোনো ভরসা নয়।
দুর্গাপূজা এলেই ঢাক-ঢোল, কাঁসর, করতালসহ নানা বাদ্যযন্ত্রের কদর বা চাহিদা বেড়ে যায়। প্রতিমা স্থাপন থেকে বিসর্জন পর্যন্ত পূজার প্রতিটি পর্ব বাদ্যের তালে মুখর থাকে। সেই ঢাক-ঢোল তৈরিতে এখন ব্যস্ত শ্যামনগরের ঢোলশিল্পীরা। তবে এই ব্যস্ততা টেকে মাত্র কয়েক মাস। বছরের বড় একটি সময় কাজ না থাকায় আয়ের অনিশ্চয়তায় পড়েন কারিগররা।
সরেজমিনে দেখা যায়, বংশীপুর ঋষিপাড়ার ভাই ভাই বাদ্য ভান্ডার ও পৌরসভার মডার্ন স্কুল সংলগ্ন সুর তরঙ্গ বাদ্যযন্ত্র ঘরসহ বিভিন্ন দোকানে কাঠের খুটখাট শব্দ। কেউ ঢাক-ঢোলের খোল তৈরি করছেন, কেউ রঙ করছেন, কেউ চামড়া লাগাচ্ছেন, কেউ আবার মেরামতে ব্যস্ত।
কারিগররা জানান, আগে গ্রামের অনেক পরিবারই বাদ্যযন্ত্র তৈরির সঙ্গে যুক্ত ছিল। ছোটরা বড়দের কাছে কাজ শিখত, একসময় নিজেরাই দক্ষ কারিগর হয়ে উঠত। এখন আর সেই ধারাবাহিকতা নেই। নতুন প্রজন্ম দীর্ঘ সময় অনিশ্চিত আয়ের পেশায় থাকতে চাইছে না। পড়াশোনা শেষ করে তারা চাকরি, ব্যবসা বা অন্য পেশায় যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে। কেউ যাচ্ছেন শহরে, কেউ খুঁজছেন দেশের বাইরে কাজের সুযোগ। একসময় শ্যামনগরে এ কাজের বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছিল। এখন হাতে গোনা দুই-একটি টিকে আছে। সেগুলোর মালিক ও কারিগররা পূর্বপুরুষের পেশা ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।
সুনীল চন্দ্র দাস বলেন, ছেলেমেয়েদের কথা, ‘পরিশ্রম বেশি, কিন্তু আয় নিয়মিত নয়।’ তাই তারা আর এই পেশায় জড়াতে চায় না।
তবে সুনীল দাসের ভাষ্য, বাদ্যযন্ত্র তৈরি নিছক পেশা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পারিবারিক ঐতিহ্য ও দক্ষতা। কাঠ, চামড়া, বাঁশ, দড়িসহ নানা উপকরণে ধাপে ধাপে তৈরি হয় একেকটি যন্ত্র। বিশেষ করে ঢাকের কাঠামো তৈরি, চামড়া প্রস্তুত ও বাঁধাইয়ে দক্ষতা না থাকলে কাঙ্ক্ষিত শব্দ আসে না।
বাদ্যযন্ত্রের কারিগররা বলছেন, পূজায় ঢাক-ঢোল অপরিহার্য, হিন্দুশাস্ত্রেও এর ব্যবহারের উল্লেখ আছে। তবু আধুনিক যন্ত্রপাতির আধিক্যে ঢাক-ঢোলের বাজনা কমছে। কাঠ, চামড়াসহ উপকরণের দাম বেড়েছে, তাই এখন লাভ খুব একটা হয় না।
সুর তরঙ্গ বাদ্যযন্ত্র ঘরের মালিক সনাতন দাস (৭৫) বলেন, ‘আগের দিনের মতো এখন ঢাক-ঢোলের তেমন চাহিদা নেই। যুগ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যেতে বসেছে ঢাক-ঢোল, খোল, তবলা।’
তাঁর ভাষ্য, পূজার সময় কাজের চাপ থাকলেও সেই আয়ে বছরের বাকি সময় সংসার চালানো কঠিন। কাঁচামালের দাম বাড়লেও সেই অনুপাতে যন্ত্রের দাম পাওয়া যায় না। দুর্গাপূজা, কালীপূজা, সরস্বতী পূজা বা বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মৌসুমে কাজ বাড়ে। বাকি সময় অনেকটা অলস বসে থাকতে হয়। ফলে দক্ষতা থাকলেও নিয়মিত আয়ের নিশ্চিয়তা থাকে না।
বাদ্যযন্ত্রের অনুরাগী ও শ্যামনগর শিল্পকলা একাডেমির পরিচালক সামিউল ইসলাম মন্টি বলেন, কারিগররা শুধু একটি পেশার সঙ্গে যুক্ত নন, তাঁরা লোকজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তাঁদের দক্ষতা হারিয়ে গেলে শুধু একটি পেশাই হারাবে না, হারিয়ে যেতে পারে বাদ্যযন্ত্র তৈরির অনেক কৌশলও।
তাঁর মতে, এই পেশা টিকিয়ে রাখতে কারিগরদের প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ, কাঁচামাল সংগ্রহে সহায়তা ও বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ দরকার।
সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে দেশীয় বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া গেলে সারা বছরই এসব পণ্যের বাজার তৈরি হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
মন্তব্য করুন