

বিলাল হোসেন: চারদিকে যতদূর চোখ যায় সবুজের সমারোহ। কিন্তু এরই মধ্যে যেন বিষাদের ছায়া। সেচের পানির অভাবে ফেটে চৌচির আমন ধানের ক্ষেত। এতে চলতি আমন মৌসুমে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপকূলে চরম ফলন বিপর্যয়ের শংকা তৈরি হয়েছে স্থানীয় কৃষকদের মনে।
শ্যামনগর উপকূলে লবণাক্ততা ও সেচ সংকটের কারণে যখন বোরো মৌসুমে জমিগুলো পতিত থাকে, তখন আমনই ছিল একমাত্র ভরসা। কিন্তু এবার চাষাবাদের পানির অভাবে সেই আমন উৎপাদন নিয়েও চরম শংকা তৈরি হয়েছে।
প্রয়োজনের সময় জমিতে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ, বুড়িগোয়ালিনী, আটুলিয়া ঈশ্বরীপুর, রমজান নগর, নুরনগর ও কাশিমাড়ী ইউনিয়নের কৃষকরা।
শ্যামনগরের কুলতলী গ্রামের কৃষক তরুপশু সরদার জানান, দীর্ঘ কর্মজীবনে এবারই তিনি প্রথম আমন চাষাবাদে পানি সংকটে পড়েছেন।
তিনি বলেন, আমন মৌসুম মূলত বৃষ্টির পানি নির্ভর। কিন্তু এবছর এখনই খরা দেখা দিয়েছে। ধানক্ষেত পানির অভাবে ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। ধান উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পানি পাওয়া না গেলে গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে। গাছ এখনই শুকিয়ে হলুদ হয়ে যাচ্ছে। এতে ফলনে মারাত্মক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।
ধানখালি গ্রামের কৃষক অসিত কুমার বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলে ধান চাষের অন্যতম বড় সমস্যা হলো মাটি ও পানির লবণাক্ততা। শুষ্ক মৌসুমে মিঠাপানির প্রাপ্যতা কমে গেলে অনেক এলাকায় কৃষিকাজের জন্য উপযুক্ত পানি সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এখন পানি প্রয়োজন, কিন্তু কোথাও সেচের পানি নেই। ইতোমধ্যে অনেক এলাকার ধান গাছ শুকিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। কেবল আমন মৌসুমে ধান হতো, এখন তাও যদি না হয়, তাহলে মানুষ চলবে কেমন করে?
শ্যামনগর উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, চলতি মৌসুমে উপজেলার ১৭ হাজার ৯ হেক্টর জমিতে আমন ধান রোপন করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ২৫ শতাংশ জমিতে পানি সংকট দেখা দিয়েছে।
কৃষক সুনীল জোয়ারদার বলেন, ধান চাষে অনেক বেশি পানি প্রয়োজন হয়। কুশি গঠন, শীষ বের হওয়া এবং দানা গঠনের সময় প্রয়োজনীয় পানি নিশ্চিত করা জরুরি। এসব পর্যায়ে পানির ঘাটতি দেখা দিলে ফলন পাওয়া যাবে না। এবার আমরা সেই পরিস্থিতির মুখোমুখি।
শ্যামনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা অলিউল ইসলাম বলেন, পানি সংকটে লবণাক্ততা ধানগাছের পানি ও পুষ্টি গ্রহণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এতে চারার বৃদ্ধি কমে যাওয়া, পাতার আগা শুকিয়ে যাওয়া, গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ফলন হ্রাসের ঝুঁকি তৈরি হয়। একই সঙ্গে মাটির লবণাক্ততা ও সেচের পানির সংকট একসঙ্গে দেখা দিলে কৃষকদের সমস্যা আরও জটিল হয়ে ওঠে। তবে সব উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততার মাত্রা এক নয়। স্থানভেদে নদীর পানি, ভূগর্ভস্থ পানি ও মাটির বৈশিষ্ট্য ভিন্ন হওয়ায় সমস্যার ধরনও আলাদা হতে পারে। তাই এলাকাভিত্তিক পরীক্ষা ও তথ্যের ভিত্তিতে সেচের পরিকল্পনা করা জরুরি।
তিনি বলেন, সামনে একটা নিম্নচাপ হওয়ার সম্ভাবনা আছে। যদি হয়, তাহলে কৃষকরা এই ক্ষতির মুখ থেকে কিছুটা রেহাই পেতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে শ্যামনগর উপকূলে লবণাক্ততা মোকাবেলা ও সেচ সংকট দূরীকরণে এলাকাভিত্তিক বা ফসলের মাঠ ভিত্তিক বড় বড় পুকুর বা জলাধার খনন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের উপর গুরত্বারোধ করেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইন্ডিজেনাস নলেজ (বারসিক)।
সংস্থাটি ‘শ্যামনগর উপকূলে সুপেয় পানির সংকট, সমাধানে করণীয় কী?’ শীর্ষক এক গবেষণায় বলেছে, শ্যামনগরে চারদিকে লবণ পানির উপস্থিতিতে প্রাণ-প্রকৃতি, পরিবেশ-প্রতিবেশ সর্বোপরি মানুষের জীবন বিষিয়ে উঠছে। তাই এককভাবে শুধু মানুষের জন্য সুপেয় পানির সংকট দূরীকরণের উদ্যোগ কখনোই টেকসই হবে না। যদি না সামাজিকভাবে বা সামাজিক উৎস তৈরির মাধ্যমে স্বাদু বা মিষ্টি পানির সংকট দূর করা না যায়। এজন্য গবেষণায় এলাকাভিত্তিক বা ফসলের মাঠ ভিত্তিক বড় বড় পুকুর বা জলাধার খনন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে ফসলের মাঠ ভিত্তিক জলাশয়গুলোতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও প্রয়োজন অনুযায়ী সেচের চাহিদা মেটানোর কথা বলা হয়েছে।

মন্তব্য করুন