বাংলাদেশ, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
১৩ কার্তিক ১৪৩৩ | সময়:
The Editors
১৩ জুন ২০২৫, ৯:০৮ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

কপোতাক্ষে সুখেন-অন্নার ভাসমান জীবন সংগ্রাম

পাইকগাছা (খুলনা) প্রতিনিধি: চোখে মোটা গ্লাসের চশমা, তবুও দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ। যেন চোখে ভাসে কেবল কিছু অস্পষ্ট আলোর রেখা—জলের আয়নায় আটকে থাকা একঝাঁক বিষণ্ন তারা। চুলগুলো অনেক আগেই পেকে সাদা হয়ে গেছে, চোয়ালের চামড়া কুঁচকে গেছে বয়সের ভারে। মুখশ্রীতেই লেখা প্রৌঢ়ত্বের ইতিহাস। নাম তার সুখেন বিশ্বাস। বয়স সত্তরের কোটা পেরিয়ে গেছে। তবুও এখনও সংগ্রামী, জীবনযুদ্ধে হার না মানা এক নাম।

পাইকগাছার গদাইপুর ইউনিয়নের বোয়ালিয়া জেলেপল্লী, যাকে সবাই মালোপাড়া বলে চেনে—সেখানেই জন্ম ও শৈশব কেটেছে সুখেন বিশ্বাসের। কিন্তু কয়েক যুগ আগেই রাক্ষুসী কপোতাক্ষ নদ গিলে খেয়েছে তার বসতভিটা, সহায়-সম্বল। সেই থেকে একমাত্র সঙ্গিনী, সহধর্মিণী অন্নাদেবীকে সঙ্গে নিয়ে শুরু হয়েছে তার ভাসমান জীবন—ডিঙি নৌকাই তাদের ঘর, নদই জীবন। নদীই এখন তার ঠিকানা, তার পরিচয়। নদীর স্রোতের মতোই ভাসতে ভাসতে কাটে দিন—আজ বোয়ালিয়া, কাল আগড়ঘাটা, পরশু শিববাটি। কপোতাক্ষ, শালিখা, শিবসা—নানান নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন তারা। দিনের শেষে যতটুকু মাছ জোটে, তা বিক্রি করেই কোনোমতে চলে তাদের সংসার। কিন্তু প্রতিটি দিন সমান নয়—কখনও আধপেটা, কখনও অনাহারে কাটে দিন। বেশি সময়ই ভরসা শুধু শুকনো খাবার—চিড়া, মুড়ি আর বিস্কুট।

বৃষ্টি, রোদ, ঝড়-তুফান—কিছুই দমাতে পারেনি এই বৃদ্ধ দম্পতিকে। পাশে থেকে নিরন্তর সাহস জুগিয়ে যান অন্নাদেবী। তার চোখে মুখে রয়েছে গভীর প্রেমের ছায়া, যেন সন্ধ্যার নদীর স্তব্ধ কোনো প্রার্থনা। অসুস্থ হলে দু’জনের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ে উৎকণ্ঠা, ভয়।

শুক্রবার (১৩ জুন) সরেজমিনে কথার ফাঁকে অন্নাদেবী বললেন, আমার সব ছিল—ঘরবাড়ি, গরু, বাগান, জমি। সব কিছু ওই রাক্ষুসী নদী কেড়ে নিয়েছে। এটা আমার ভাগ্য। এখন জীবনের শেষবেলায় সৃষ্টিকর্তার কাছে একটাই প্রার্থনা—সাখা সিঁদুর নিয়েই যেন মরতে পারি। তার ছলছলে চোখ তখন নদীর মতোই গভীর।

তাদের একমাত্র মেয়ে এখনও মালোপাড়াতেই থাকে। মাঝেমধ্যে বুকের টানে তারা সেখানে ছুটে যান। আজ হঠাৎ নদীপাড়ে দেখাই হয় এই দম্পতির সঙ্গে। কথার ফাঁকে হঠাৎ সুখেন বিশ্বাস বললেন, বাবু, কথা বলতে ভালো লাগছে, কিন্তু দেরি হয়ে যাচ্ছে। এখন আর নদীতে আগের মতো মাছ মেলে না, যেতে হবে অনেক দূরে। যদি বেঁচে থাকি, আবার কথা হবে।

এইভাবেই দিনরাত নদীর বুকে লড়াই করে চলেছেন তারা। মাথার উপর নেই ছাদের নিশ্চয়তা, পাশে নেই কেউ—নেই কোনো আপনজন। একসময় সরকারের দেওয়া ঘরের আশায় আবেদন করেছিলেন, কিন্তু তদবির আর অন্যদের ভিড়ে তাদের ভাগ্যে কিছু জোটেনি। আজ শরীর আর আগের মতো সাড়া দেয় না, মাছ ধরাও হয়ে উঠেছে কষ্টকর। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বারবার ভেঙে দিয়েছে আত্মবিশ্বাস।

তবুও তারা লড়ে যাচ্ছেন—ভেসে যাচ্ছেন নদীর স্রোতের মতো।
সুখেন বিশ্বাস—শুধু একটি নাম নয়, একটি শব্দ,
যার প্রতিধ্বনি এখনো কপোতাক্ষের বাঁকে বাঁকে বয়ে চলে,
যেমন বয়ে চলে কোনো পুরোনো বেদনার নিঃশব্দ প্রবাহ।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

কালিগঞ্জে বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস পালিত

১

দেবহাটায় যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত

২

প্রাইভেট হসপিটাল ও ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের বিভাগীয় কমিটি ঘোষণা

৩

পাইকগাছায় ফোনে চাঁদা দাবি ও প্রাণনাশের হুমকি, ২৪ ঘণ্টায় আটক ৩

৪

তালায় জেলা পরিষদের বাইসাইকেল উপহার পেল ৮০ মেধাবী শিক্ষার্থী

৫

শ্যামনগরে জামায়াতের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ

৬

শ্যামনগরে স্থানীয় অভিযোজন কৌশলবিষয়ক প্রশিক্ষণ

৭

খেজুরবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠদান, আতংকে থাকে শিক্ষার্থীরা

৮

২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরও ৯ জনের মৃত্যু

৯

স্পেনে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৬৪

১০

এবার গ্যাসের দাম ৩০০ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব অপারেটরদের

১১

ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের আঘাতে ৫ জনের মৃত্যু

১২

সাতক্ষীরায় জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস পালিত

১৩

সুন্দরবনকে বনদস্যু মুক্ত করার দাবিতে মানববন্ধন

১৪

ভারতের উপকূলে আঘাত হেনেছে ঘূর্ণিঝড় অর্ণব

১৫

ঘূর্ণিঝ‌ড়ের সতর্কবার্তার ম‌ধ্যে আশাশুনিতে খোল‌পেটুয়া নদীর বাঁ‌ধে ভয়াবহ ভাঙন, এলাকায় আতংক

১৬

ডিবি গার্লস হাইস্কুলে লালন সাঁইজির তিরোধান দিবস পালিত

১৭

‎সবুজের সান্নিধ্যে মন ও প্রাণের নিরাময় || ‎তারিক ইসলাম

১৮

এবি পার্টি সাতক্ষীরা সদর উপজেলা শাখার আহবায়ক কমিটির অনুমোদন

১৯

কয়রা উপজেলা প্রেসক্লাবের নিন্দা

২০