বাংলাদেশ, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
১ শ্রাবণ ১৪৩৩ | সময়:
The Editors
৮ জুলাই ২০২৬, ১১:৩৭ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

গরিবের ‘ডাক্তারবাবু’ সুনীল মণ্ডল

oplus_2097154

সুলতান শাহাজান, শ্যামনগর: ৪০ বছর ধরে রোগীদের স্বেচ্ছায় দেওয়া নামমাত্র ফি’তে চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন সাতক্ষীরার শ্যামনগরের সুন্দরবনঘেঁষা পার্শ্বেখালী গ্রামের সুনীল কুমার মণ্ডল।

চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের কাছে টাকা না থাকলেও চিকিৎসা ও বিনামূল্যে ওষুধ দেন এই পল্লী চিকিসৎক। তাই স্থানীয়দের কাছে ‘গরিবের ডাক্তারবাবু’ হিসেবেই পরিচিত তিনি।

সুন্দরবনের উপকূলঘেঁষা জনপদে, যেখানে আধুনিক চিকিৎসাসেবা এখনও অনেকের কাছে দূরের স্বপ্ন, সেখানে গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে পল্লী চিকিৎসক সুনীল কুমার মণ্ডল শুধু একজন গ্রাম্য ডাক্তার নন, বরং তিনি এলাকাবাসীর কাছে জীবনের সংকটে অনেক বড় ভরসার নাম।

পল্লী চিকিসৎক সুনীল কুমার মণ্ডলের বাড়ি সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সীগঞ্জ ইউনিয়নের পার্শ্বেখালী গ্রামে। সেখানে সুন্দরবনঘেঁষা মীরগাঙ নদীর তীরে ছোট্ট একটি ঘরে বসেই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চিকিৎসা সেবা দেন তিনি।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চারপাশে ভিড়। সুনীল মণ্ডল রোগী দেখছেন। কেউ জেলে, কেউ কৃষক, কেউবা গৃহিণী। সবার চোখে একটাই বিশ্বাস ডাক্তার বাবু আছেন, সমস্যা নাই। তার কক্ষ থেকে অনেকেই ব্যবস্থাপত্র নিয়ে বের হচ্ছেন আবার কারো কারো তিনি নিজেই ওষুধ দিচ্ছেন। রোগী দেখার বিপরীতে কারো কাছ থেকে নিচ্ছেন ১০ টাকা, ২০ টাকা কেউবা দিচ্ছেন সর্বোচ্চ ৫০ টাকা ফি। আবার অনেকের কাছ থেকে কোনো ফি নিচ্ছেন না। দিচ্ছেন ফ্রি ওষুধও।

রোগী দেখার ফাঁকেই কথা হয় পল্লী চিকিৎসক সুনীল কুমার মণ্ডলের সঙ্গে। তিনি জানান, ছোট বেলা থেকেই তার ইচ্ছে ছিল কাকা গীরেন্দ্রনাথ মন্ডল ও বাবা অশ্বিনী মণ্ডলের মতো চিকিৎসক হয়ে মানুষের সেবা করবেন। পরে কাকা-বাবার পথ ধরে পার্শ্ববর্তী ছোট ভেটখালীর গ্রাম্য চিকিৎসক সোলাইমান হোসেনের হাত ধরে হাতে-খড়ি হয় তার। পরবর্তীতে পল্লী চিকিৎসার ওপর বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও কোর্স সম্পন্ন করে নিজ গ্রামে শুরু করেন চিকিৎসা সেবা। এভাবেই ৪০ বছর ধরে নামমাত্র ফি’তে চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। এই মানবিক বোধ নিয়েই তিনি হয়ে ওঠেন এলাকার মানুষের নির্ভরতার প্রতীক।

সুনীল কুমার মণ্ডল জানান, সুন্দরবনের বাঘের আক্রমণে আহত হওয়া রোগী থেকে শুরু করে জ্বর, সর্দি, কাশি, বাত ব্যথা, প্যারালাইসিস, আঘাত লাগা, শ্বাসকষ্ট, চুলকানিসহ ছোটখাটো প্রায় সব ধরনের চিকিৎসা করেন তিনি। রোগীরা যে টাকা দেন তাই নেন। টাকা চান না কারো কাছে। আবার রোগীদের কাছে টাকা না থাকলে জরুরি ওষুধপত্রও দিয়ে দেন বিনামূল্যে। আজীবন এভাবেই মানুষকে সেবা দিতে চান তিনি।

তিনি আরোও জানান, তার জীবনের প্রথম রোগী ননীগোপাল নামের এক মৌয়াল। সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে বাঘের আক্রমণে গুরুতর আহত হন। সেই রোগীকে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তোলেন তিনি। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর রেজাউল ইসলাম নামে এক জেলে বাঘের আক্রমণে আহত হলে তাকেও চিকিৎসা দেন। এখন তিনি আবার সুন্দরবনে মাছ-কাঁকড়া ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন। এমন অসংখ্য গল্প ছড়িয়ে আছে তার জীবনে। যেখানে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আসা মানুষ ফিরে গেছে নতুন আশায়।

চিকিৎসার মূল দর্শন সম্পর্কে সুনীল মণ্ডল বলেন, আমি চিকিৎসা দেই টাকার জন্য না। মানুষের দোয়া-আশীর্বাদ পাওয়ার জন্য এই পেশায় আইছি। বয়স বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি জানান, জীবনের শেষ সময়টুকু পর্যন্ত মানুষের ভালোবাসা দোয়া ও আশীর্বাদ নিয়েই বিদায় নিতে চাই।

তার চেম্বার থেকে চিকিৎসা সেবা নিয়ে বের হলে কথা হয় আছিয়া খাতুনের সঙ্গে। বলেন, এই ‘ডাক্তার বাবু’ আমাগা প্রথম আর শেষ ভরসা। জঙ্গলে বাঘে ধরা হোক বা যেকোনো অসুখ-বিসুখ আমরা উনার কাছেই আসি। উনি (পল্লী চিকিৎসক সুনীল মণ্ডল) বলে, ‘হামাগুড়ি দিয়া হলেও আমার কাছ পর্যন্ত আসবা।’ এই বিশ্বাসেই আমরা আসি।

শাহাজান গাজী নামে চিকিৎসা নিতে আসা আরেক রোগী বলেন, ছোটবেলা থেইকা এই ডাক্তার বাবুর কাছে চিকিৎসা নেই আমি সহ আমার পরিবারের সকলে। আজও প্রেসার দেইখা ওষুধ দিল। টাকা দেই নি, উনিও চাই নি।

চিকিৎসা সেবা নিতে আসা সন্ধ্যা মন্ডল নামের এক গৃহিণী বলেন, বিয়ার পর থেকেই এই ২৭-২৮ বছর ধরে এই ডাক্তার বাবুর কাছে আসি। কখনো ৫ টাকা, কখনো ১০-২০ টাকা দিছি, আবার অনেক সময় কিছুই দেওয়া হয় না। কিন্তু উনি কোনদিন কিছু বলে না।

৭০ বছর বয়সী সুন্দরবনের জেলে নুর ইসলামের ভাষ্য, বিশ্বাসে অর্ধেক রোগ ভালো হয়ে যায়। ৩০ বছর ধরে আমরা এই ডাক্তার বাবুর কাছে চিকিৎসা নেই। আমাগো পরিবারের বউ, ছেলে-মেয়ে সবাই সুনীল ডাক্তারের রোগী। দূরে থাকলেও অসুখ হলে সবাই তার কাছে আসে।

তিনি আরোও বলেছেন, আমার দুই মেয়ের একজনের বিয়ে হয়েছে সাতক্ষীরা শহরে, আরেকজনের পার্শ্ববর্তী উপজেলা কালীগঞ্জে। তারাও অসুস্থ হলেই সেখান থেকে এখানে এসে এই ডাক্তার বাবুর কাছে চিকিৎসা নেয়। আমরা মনে করি, তার কাছে আসলেই যেন রোগ ভালো হয়ে যায়।

স্থানীয় ইউপি সদস্য আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, পল্লীচিকিৎসক সুনীল কুমার আমাদের এলাকার গর্ব। ৪০ বছর ধরে তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠা, সততা ও মানবিকতার সঙ্গে দরিদ্র মানুষের চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। চিকিৎসাকে তিনি কখনো ব্যবসা হিসেবে দেখেননি; বরং মানুষের সেবাকেই নিজের জীবনের ব্রত হিসেবে নিয়েছেন। এমন মানুষ সমাজে খুবই বিরল।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

শ্যামনগরে ৭২ জনের মাঝে ১৮শ মুরগির বাচ্চা ও খাদ্য বিতরণ

সড়কে ইজিবাইক বন্ধ করলে বাস চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হবে: আশাশুনিতে ইজিবাইক মালিক সমিতি

আশাশুনির বাঁশদহা নদীতে কাঠের সেতু নির্মাণ

কালিগঞ্জে রথযাত্রা সফল করতে বিএনপির প্রস্তুতি সভা

হাড়দ্দহা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ম্যানেজিং কমিটি গঠন

কালিগঞ্জে ছাত্রদলের উদ্যোগে বিশুদ্ধ পানি, স্যালাইন ও পরীক্ষা উপকরণ বিতরণ

খুলনায় সাংবাদিকদের উপর হামলার ঘটনায় সাতক্ষীরা প্রেসক্লাবের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ

বুধহাটায় ১৫ দিনব্যাপী বৃক্ষ মেলা উদ্বোধন

শার্শায় শিশু ধর্ষণের অভিযোগে কিশোর গ্রেপ্তার

দ্য এডিটরসে সংবাদ প্রকাশ: শ্যামনগরে ৩ বেকারিকে জরিমানা

১০

তালায় সড়ক দুর্ঘটনা রোধ ও স্থায়ী বাসস্ট্যান্ড নির্মাণের দাবিতে মানববন্ধন

১১

‌দেবহাটায় জলবায়ু ঝুঁকি ও বজ্রপাত রোধে খেজুর বীজ ও তালের চারা রোপণ কর্মসূচি

১২

সামেক হাসপাতালে আউট সোর্সিংয়ে নিয়োগপ্রাপ্তদের নিয়ে ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে মানববন্ধন

১৩

শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে সচিবালয় অভিমুখে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের লং মার্চ

১৪

0ne million seeds campaign launched for coastal restoration

১৫

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি থেকে বেরিয়ে গেল ইরান

১৬

শার্শা উপজেলা সাংবাদিক ঐক্য পরিষদের সাধারণ সভা

১৭

কালিগঞ্জের বাজারগ্রামে ড্রেন সংস্কার কাজ উদ্বোধন

১৮

শ্যামনগরে পরিত্যক্ত ভবন ভাঙতে গিয়ে ছাদ ধসে পড়ে ৫ শ্রমিক আহত

১৯

খুলনায় সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে গুলি: সাতক্ষীরা সাংবাদিক কেন্দ্রের উদ্বেগ, নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি

২০
error: Content is protected !!