
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: গত তিন দশক ধরে এক নির্মম নিশানা হয়ে আছে এভারেস্টের চূড়ায় ওঠার পথে বরফে জমে থাকা এক মৃতদেহ। সবুজ পর্বতারোহণের জুতো ভারতীয় সেই পর্বতারোহীকে পরিচিত করেছে ‘গ্রিন বুটস’ নামে।
বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে যাওয়ার পথে হাজার হাজার পর্বতারোহী এই দৃশ্য দেখে আসলেও, এবার সেই মরদেহটি উদ্ধারে এগোচ্ছে ভারত। দীর্ঘ ৩০ বছর আগে মৃত এই পর্বতারোহীর নাম দোরজে মোরুপ।
এভারেস্টে বরফের নিচে অবহেলিত শত শত মরদেহের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত তিনি।
বন্ধু বা পরিবার কখনোই আশা হারায়নি যে তিনি একদিন ফিরবেন।
এবার তাদের সেই অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে মরদেহটি ফিরিয়ে আনার আশা করা হচ্ছে।
দোরজে মোরুপের স্ত্রী কোনচাক ইয়াংস্কিত বিবিসিকে বলেন, কোনো কোনো রাতে ঘুমানোর আগে আমার মনে হতো, আজ রাতে হয়তো দরজায় কড়া নাড়বে কেউ, দরজা খুললেই দেখব তিনি দাঁড়িয়ে আছেন।
তিনি বাড়ি ফিরলে তাকে জিজ্ঞেস করব- এত বছর কোথায় ছিলে?
ভারত-তিব্বত সীমান্ত পুলিশ (আইটিবিপি)-এর ল্যান্স নায়েক বা ল্যান্স করপোরাল ছিলেন ৪৮ বছর বয়সী মোরুপ। হিমালয়ের ট্রেকিংয়ে তিনি নতুন ছিলেন না। এভারেস্ট জয়ের জন্য আইটিবিপির যে ছয় সদস্যের দল অংশ নিয়েছিল, মোরুপ ছিলেন তাদের একজন। নেপাল সীমান্ত দিয়ে বেশির ভাগ পর্বতারোহী এভারেস্টে উঠলেও, মোরুপের দলটি তিব্বতের তুলনামূলক দুর্গম চীনা অংশ দিয়ে ইতিহাস গড়তে চেয়েছিল।
তুষারঝড়ের কারণে দলের তিন সদস্য ফিরে এলেও মোরুপ এবং অন্য দুজন—সেওয়াং স্মানলা সেওয়াং পালজোর—৮ হাজার ৮৪৭ মিটার উচ্চতার চূড়ার দিকে এগিয়ে যান। তবে নামার সময় এক ভয়াবহ তুষারঝড় তাদের প্রাণ কেড়ে নেয়। গত এক শতাব্দীতে এভারেস্ট অঞ্চলে তিন শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তাদের বেশির ভাগেরই মরদেহ পাহাড়েই থেকে গেছে।
এর মধ্যে দুজনের খোঁজ কখনো মেলেনি। তবে ‘গ্রিন বুটস’ নামে পরিচিত দোরজে মোরুপের মরদেহটি গত তিন দশক ধরে ৮ হাজার ৫০০ মিটার উচ্চতায় বরফে জমে রয়েছে।
বহু বছর ধরে ধারণা করা হতো ‘গ্রিন বুটস’ হলেন এই অভিযানেরই আরেক সদস্য সেওয়াং পালজোর। কিন্তু বেঁচে থাকা সহকর্মীদের সাক্ষ্য এবং শেষ রেডিও যোগাযোগের তথ্যের ভিত্তিতে কর্তৃপক্ষ এখন নিশ্চিত হয়েছে ওই মরদেহটি আসলে মোরুপেরই।
মরদেহ উদ্ধার কতটা কঠিন হবে?
পাহাড় থেকে মরদেহ নামিয়ে আনা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং ব্যয়বহুল কাজ। মোরুপের মরদেহটি রয়েছে এভারেস্টের ‘ডেথ জোন’-এ, যেখানে তাপমাত্রা মাইনাস ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে যেতে পারে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের তুলনায় অক্সিজেনের মাত্রা মাত্র এক-তৃতীয়াংশ।
অভিজ্ঞ নেপালি পর্বতারোহী ছিরিং জাংবু শেরপা বলেন, আবহাওয়া এবং বরফের অবস্থাই এখানে সবচেয়ে বড় বিষয়।
চীনা অংশে খাড়া ঢাল রয়েছে এবং নেপালি অংশের মতো সেখানে কোনো উদ্ধার অবকাঠামো বা হেলিকপ্টারের সুবিধা নেই।
মাউন্টেনিয়ারিং গাইড পেম্বা ওংচু শেরপা জানান, বসন্ত মৌসুমের অনুকূল আবহাওয়ায়ও মরদেহ নামানো অত্যন্ত কঠিন। আর শরৎতে তো পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত। তিনি আরও বলেন, কেবল পথ তৈরি করার জন্যই ১০ থেকে ১২ জন দক্ষ পর্বতারোহীর প্রয়োজন হবে।
বরফে জমে থাকা ভারী সরঞ্জামসহ মরদেহ নামানো এবং পরবর্তীতে তা নিচে নামিয়ে হেলিকপ্টার বা ইয়াকের সাহায্যে বিমানবন্দরে পৌঁছানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। ভারতীয় পর্বতারোহী কুন্তল জোইশার বলেন, প্রথম ১ হাজার মিটার পথ নামানোই সবচেয়ে বড় লজিস্টিক্যাল চ্যালেঞ্জ। এই পুরো উদ্ধার অভিযানের খরচ সাধারণত ৪০ হাজার থেকে ৮০ হাজার ডলার পর্যন্ত হতে পারে, যা বেশিরভাগ পরিবারের সামর্থ্যের বাইরে।
সূত্র: বিবিসি
মন্তব্য করুন