বাংলাদেশ, শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
২১ ভাদ্র ১৪৩৩ | সময়:
The Editors
৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬:২৩ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

দক্ষতার শক্তিতে বদলে যেতে পারে সাতক্ষীরার ভবিষ্যৎ || মো. মামুন হাসান

একটি জেলার ভবিষ্যৎ কতটা উজ্জ্বল হবে, তা শুধু সেই জেলার রাস্তা, সেতু কিংবা বড় বড় ভবন দেখে বোঝা যায় না। বোঝা যায় সেই জেলার তরুণেরা কী শিখছে, কী কাজ জানছে এবং আগামী দিনের পরিবর্তনের জন্য কতটা প্রস্তুত হচ্ছে সেটার মাধ্যমে। কারণ সময়ের সঙ্গে পৃথিবী বদলাচ্ছে। চাকরির ধরন বদলাচ্ছে। প্রযুক্তি বদলাচ্ছে। শিল্পের চাহিদা বদলাচ্ছে। এই পরিবর্তনের সময়ে যে তরুণের হাতে বাস্তব দক্ষতা থাকবে, ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় মূলত সেই তরুণই এগিয়ে থাকবে।

এ কারণেই বাংলাদেশের উন্নয়ন ভাবনায় কারিগরি শিক্ষাকে আর প্রান্তিক কোনো বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং দক্ষ জনশক্তি তৈরির সবচেয়ে কার্যকর পথগুলোর একটি হতে পারে কারিগরি শিক্ষা। একটি দেশের অর্থনীতি যত এগোয়, দক্ষ কর্মীর প্রয়োজন তত বাড়ে। অথচ আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষিত হওয়ার ওপর যতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, দক্ষ হওয়ার ওপর ততটা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এখন সেই মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন।

সাতক্ষীরার বাস্তবতায় কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব আরও গভীর। এই জেলার রয়েছে কৃষি, মৎস্য, ব্যবসা, ক্ষুদ্র শিল্প, সীমান্ত বাণিজ্য ও পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা। সুন্দরবনকে ঘিরে পর্যটনের বিশাল সুযোগ রয়েছে। উপকূলীয় জীবন, নদী, খাল, গ্রামীণ সংস্কৃতি, স্থানীয় খাবার, কৃষি ও মৎস্যসম্পদকে কেন্দ্র করেও নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে তোলা সম্ভব। কিন্তু সম্ভাবনা থাকলেই উন্নয়ন হয় না। সম্ভাবনাকে অর্থনীতিতে রূপ দিতে প্রয়োজন দক্ষ মানুষ।

সেই জায়গায় সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে শুধু শ্রেণিকক্ষ, ল্যাবরেটরি আর পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে তার প্রকৃত শক্তি প্রকাশ পায় না। একটি পলিটেকনিক হতে পারে একটি জেলার দক্ষতা উন্নয়নের প্রাণকেন্দ্র। এখানকার শিক্ষার্থীরা যদি আধুনিক প্রযুক্তির পাশাপাশি বাস্তব কর্মদক্ষতা অর্জন করে, তাহলে তারা শুধু চাকরির বাজারের জন্য প্রস্তুত হবে না, নিজেরাই নতুন কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করতে পারবে।আমাদের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি দরকার এখানেই। একজন শিক্ষার্থীকে শুধু চাকরি পাওয়ার জন্য তৈরি না করে কাজ তৈরি করার মতো করে গড়ে তুলতে হবে।

সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের সামনে সেই সুযোগ রয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ, আধুনিক ল্যাব, শিল্প প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ, ইন্টার্নশিপ, উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ এবং কর্মক্ষেত্রের বাস্তব অভিজ্ঞতা যদি শিক্ষার সঙ্গে আরও শক্তভাবে যুক্ত করা যায়, তাহলে এই প্রতিষ্ঠান থেকে বের হওয়া একজন শিক্ষার্থী সাতক্ষীরার অর্থনীতিতেই নতুন সম্ভাবনার জন্ম দিতে পারে।

বিশেষ করে ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টের মতো বিষয় সাতক্ষীরার জন্য কেবল একটি একাডেমিক বিষয় নয়, এটি স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি সম্ভাবনার ক্ষেত্র। সুন্দরবন দেখতে প্রতিবছর দেশ বিদেশের মানুষ আসে। কিন্তু পর্যটন শুধু একটি বন দেখিয়ে শেষ হয়ে যায় না। পর্যটককে স্বাগত জানানো, থাকার ব্যবস্থা করা, স্থানীয় খাবার পরিবেশন, নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করা, প্রশিক্ষিত গাইড তৈরি, স্থানীয় সংস্কৃতি তুলে ধরা, হোমস্টে পরিচালনা এবং পর্যটন পণ্য তৈরি করার জন্য দক্ষ মানুষের প্রয়োজন।

সাতক্ষীরার একটি গ্রামও পর্যটনের অংশ হতে পারে। একজন কৃষক তার কৃষিকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করতে পারেন। একজন উদ্যোক্তা স্থানীয় খাবারকে ব্র্যান্ড করতে পারেন। একজন তরুণ প্রশিক্ষিত ট্যুর গাইড হিসেবে কাজ করতে পারেন। একটি পরিবার হোমস্টে পরিচালনা করতে পারে। একজন শিক্ষার্থী ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সাতক্ষীরার পর্যটনকে সারা দেশের মানুষের কাছে তুলে ধরতে পারে। অর্থাৎ দক্ষতা থাকলে স্থানীয় সম্পদই হয়ে উঠতে পারে অর্থনৈতিক সম্পদ।

এই পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় অর্থনীতির মধ্যে একটি শক্তিশালী সম্পর্ক। সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটকে সেই সম্পর্ক তৈরির একটি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। স্থানীয় ব্যবসায়ী, শিল্প উদ্যোক্তা, পর্যটন প্রতিষ্ঠান, হোটেল, রেস্টুরেন্ট, কৃষি উদ্যোক্তা, মৎস্য খাত এবং সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে শিক্ষার্থীরা বইয়ের পাশাপাশি বাস্তব পৃথিবীকেও চিনতে পারবে।

কারিগরি শিক্ষার আরেকটি বড় শক্তি হলো এর কর্মমুখী চরিত্র। একজন তরুণ যদি কোনো একটি কাজ ভালোভাবে শিখে বের হতে পারে, তাহলে তার সম্ভাবনা শুধু দেশের চাকরির বাজারে সীমাবদ্ধ থাকে না। দক্ষতা তাকে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারেও নিয়ে যেতে পারে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দক্ষ কর্মীর চাহিদা বাড়ছে। বাংলাদেশ যদি মানসম্মত দক্ষ জনবল তৈরি করতে পারে, তাহলে আমাদের তরুণেরা দেশের অর্থনীতির পাশাপাশি বৈদেশিক কর্মসংস্থানেও বড় অবদান রাখতে পারবে।

তবে এজন্য শুধু শিক্ষার্থীকে দায়ী করলে চলবে না। কারিগরি শিক্ষার মান উন্নয়নে প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, অভিভাবক, শিল্প খাত এবং সরকারের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সময়ের সঙ্গে কারিকুলাম পরিবর্তন করতে হবে। আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচিত করতে হবে। শিক্ষক প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে। শিল্প প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিয়মিত সংযোগ তৈরি করতে হবে। শিক্ষার্থীদের উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কারিগরি শিক্ষাকে ঘিরে সমাজের পুরোনো ধারণা বদলাতে হবে।

কারিগরি শিক্ষা মানে কম মেধাবীদের শিক্ষা নয়। বরং ভবিষ্যতের অর্থনীতি যে দক্ষতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে, কারিগরি শিক্ষা সেই দক্ষতার ভিত্তি তৈরি করে। একজন দক্ষ টেকনিশিয়ান, দক্ষ শেফ, দক্ষ হোটেল ম্যানেজার, দক্ষ ট্যুর গাইড, দক্ষ ইলেকট্রিশিয়ান কিংবা দক্ষ প্রযুক্তিবিদ দেশের অর্থনীতিতে যে অবদান রাখেন, তা কোনোভাবেই ছোট নয়।

আজকের সাতক্ষীরাকে যদি আগামী দিনের কর্মসংস্থান ও দক্ষতার জেলা হিসেবে দেখতে চাই, তাহলে কারিগরি শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটকে শুধু একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং জেলার মানবসম্পদ উন্নয়নের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ভাবতে হবে।

একটি দক্ষ হাত একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলাতে পারে। কয়েকটি দক্ষ হাত একটি প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ বদলাতে পারে। আর হাজারো দক্ষ হাত একটি জেলার অর্থনীতির চেহারা বদলে দিতে পারে। সাতক্ষীরার সামনে সম্ভাবনার অভাব নেই। অভাব শুধু সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর মতো পর্যাপ্ত দক্ষ মানুষের। তাই এখন সময় শুধু শিক্ষিত হওয়ার নয়, দক্ষ হওয়ার। শুধু চাকরি খোঁজার নয়, কাজ সৃষ্টি করার। শুধু নিজের ভবিষ্যৎ ভাবার নয়, নিজের জেলার ভবিষ্যৎ গড়ার।

সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট সেই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দরজা হতে পারে। দরজাটি খুলে দিতে পারলে সাতক্ষীরার তরুণেরা শুধু চাকরির বাজারে প্রবেশ করবে না, তারা নিজেরাই আগামী দিনের বাজার তৈরি করবে। আর একটি জেলার সবচেয়ে বড় সম্পদ যদি কিছু হয়ে থাকে, সেটি তার মাটি নয়, তার মানুষ। সেই মানুষকে দক্ষ করে তুলতে পারলেই বদলে যাবে সাতক্ষীরার ভবিষ্যৎ।

লেখক: ইনস্ট্রাক্টর (টেক) ও বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

দেবহাটায় বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বর্ণাঢ্য র‍্যালি ও আলোচনা

গৃহবধূ চন্দনা গুম মামলার প্রধান আসামি ভেন্ডার রবি গ্রেপ্তার

দক্ষতার শক্তিতে বদলে যেতে পারে সাতক্ষীরার ভবিষ্যৎ || মো. মামুন হাসান

স্বপ্ন সার্থক মানবিক ফাউন্ডেশন’র ৩য় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন

পাইকগাছায় ভূমি সেবায় গতি, আশার সঞ্চার

সাতক্ষীরায় কৃষি ব্যাংক কর্মকর্তাদের সম্মেলন

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তালা উপজেলা ছাত্রকল্যাণ সমিতির যাত্রা

ঘোনা পল্লীমঙ্গল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি গাজী সুলতান, তালা প্রেসক্লাবের অভিনন্দন

কয়রায় তরুণ সংঘের নির্বাচন: শামীম সভাপতি, আবু মুছা সম্পাদক

শ্যামনগর উপজেলা প্রেসক্লাবের নির্বাচন: মনির সভাপতি, লিটন সম্পাদক

১০

কয়রায় বিয়ের ১৭ দিনের মাথায় শ্বশুরবাড়িতে যুবকের আত্মহত্যা!

১১

বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের ৫৫তম শাহাদাৎ বার্ষিকীতে সমাধিসৌধে শ্রদ্ধা

১২

১১ দলীয় ঐক্যের জোটের লংমার্চ: ‘গ্যাস দে বিদ্যুৎ দে নইলে গদি ছাইড়া দে’

১৩

কোরআনের বর্ণনায় অন্তরের সুস্থতা ও অসুস্থতা || মুফতি আতাউর রহমান

১৪

আশুলিয়ায় বন্ধ ঘরে স্বামী-স্ত্রী ও নবজাতকের মরদেহ

১৫

সাতক্ষীরায় শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী উদযাপন

১৬

শ্যামনগরে যাত্রা করলো হেতালখালি মানবসেবা ফাউন্ডেশন

১৭

কয়রায় ইয়াবাসহ ৩ মাদক কারবারী আটক

১৮

পরীক্ষার্থীর দুধের শিশুকে কোলে তুলে নিয়ে প্রশংসায় ভাসছেন কনস্টেবল শিল্পী

১৯

দেবহাটায় দৃষ্টিপাত সম্পাদক জি.এম ন‍ূর ইসলামের স্মরণ সভা

২০
error: Content is protected !!