
ডেস্ক রিপোর্ট: সাতক্ষীরা শহরের এক ভয়াবহ আতংকের নাম কিশোর গ্যাঙ লিডার নাহিদ হাসান। একের পর এক নিরাপরাধ সাধারণ মানুষের ওপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে বর্বরোচিত হামলা চালানোই তার নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। একাধিক মামলা থাকার সত্ত্বেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধরাছোয়ার বাইরে থাকায় এবং প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় থাকার কারণে দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে সাবেক ওয়ার্ড ছাত্রলীগ নেতা নাহিদ ও তার বাহিনীর সদস্যরা।
সর্বশেষ গত শুক্রবার (২ অক্টোবর) রাতে তার নৃশংসতার বলি হয়েছে শহরের কাটিয়া এলাকার রুচিরা বেকারির সত্ত্বাধিকারী আব্দুল গফুর খাঁনের ছেলে কলেজ ছাত্র জাকারিয়া খাঁন (১৯)।
জাকারিয়া হত্যার ঘটনায় পরদিন শনিবার রাতে তার ভাই মোঃ শাহারিয়ার খাঁন বাদী হয়ে শহরের ইটাগাছা এলাকার মৃত গিয়াস উদ্দীনের ছেলে কিশোর গ্যাঙ লিডার নাহিদ হাসান (২৫)সহ মোট ১২ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত আরো ৬/৭ জনের নামে সদর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। পুলিশ ইতিমধ্যে এ মামলার ২নং আসামি একই এলাকার মৃত ফিরোজ উদ্দীনের ছেলে মোহিত হাসান বনি (২০)কে গ্রেপ্তার করেছে।
মামলার অন্যান্য আসামিরা হলেন, শহরের ইটাগাছা এলাকার সিরাজুল ইসলামের ছেলে মোঃ আরিজুল ইসলাম (২৮), আবুল হোসেন ওরফে বড় খোকার ছেলে ছোট ময়না (২৭), রবিউল ইসলামের ছেলে মোঃ জুয়েল (২৪), মোঃ হাসানের ছেলে মোঃ সাগর (২৩), মৃত ফিরোজ উদ্দীনের ছেলে মোঃ রনি (৩০), শাকিল চেয়ারম্যানের ছেলে মোঃ সামি (২৪), জমিদার মুন্সির ছেলে মোঃ নাঈম (২২), নজরুল সরদারে ছেলে রাশিদুর জামান রাশেদ (৩০), মোঃ মিঠুর ছেলে মোঃ হুজাইফা (২০) ও মিজানুর রহমান মির্জার ছেলে মোঃ শরিফুল ইসলাম শরিফ (২৮)।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার গভীর রাতে সাতক্ষীরা শহরের প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের সামনে কদম গাছতলার নিচে রবিউলের চায়ের দোকানে কিশোর গ্যাঙ লিডার নাহিদসহ তার বাহিনীর সদস্যরা চা খেতে আসে। তারা এসময় তাকে দ্রুত চা দিতে বলে। চা দেওয়াকে কেন্দ্র করে রবিউলের সাথে তারা অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকে। এসময় রবিউলের প্রতিবেশী ভাইপো বাপ্পী হাসান এর প্রতিবাদ করলে তারা বাপ্পীকে মারপিট ও মাথায় ইট দিয়ে আঘাত করে গুরুতর জখম করে। এ সময় জাকারিয়া খাঁন ওই পথ দিয়ে যাওয়ার সময় বাপ্পীকে তাদের হাত থেকে রক্ষা করতে এগিয়ে গেলে তারা তাকে পরিকল্পিতভাবে এলোপাতাড়ি মারপিট করতে থাকে। এরপর কিশোর গ্যাঙ লিডার নাহিদ হাসান জাকারিয়ার বামপাশের বুকে চাকু মারে। এতে সাথে সাথে জাকারিয়া মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। এসময় চা দোকানী রবিউলসহ স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে অবস্থার অবনতি হওয়ায় পরে তাকে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তার মৃত ঘোষণা করেন।
নিহতের ফুফাতো ভাই ও সাতক্ষীরা পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাসুম বিল্লাহ শাহীন জানান, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় দেখা গেছে কিশোর গ্যাঙ লিডার নাহিদ হাসানের নেতৃত্বেই সরাসরি এই হত্যাকা- ঘটানো হয়েছে। অবিলম্বে তিনি নাহিদ হাসানসহ সকল আসামিকে গ্রেপ্তারসহ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
এদিকে, কিশোর গ্যাং লিডার নাহিদ হাসানের বিরুদ্ধে ২০২৩ সালের ২৩ অক্টোবর বকচরা দাখিল মাদ্রাসার সুপার মোঃ রমজান আলীকে প্রকাশ্যে ছুরিকাঘাত করে গুরুতর জখমের ঘটনায় সদর থানায় মামলা রয়েছে। ওই মামলায় চার্জশিটও দেয়া হয়েছে। এছাড়া ২০২৬ সালের ১২ এপ্রিল শহরের ‘ফুচকা বাংলা’র পরিচালক আজিজুল ইসলামকে ছুরি দিয়ে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত জখম করে কিশোর গ্যাঙ লিডার নাহিদ গং। এ নিয়েও মামলা রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া বাঁকাল ইসলামপুর এলাকার এক যুবকের পিঠে ছুরি মেরে নির্মম আঘাতসহ শহরের বিভিন্ন স্থানে ছুরি মারা ও আঙুল কেটে নেয়ার মতো গুরুতর অভিযোগে অসংখ্য মামলা রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৩ সালে কিশোর গ্যাঙ লিডার নাহিদের পিতা জেলা যুবলীগ নেতা ও চোরাকারবারী গিয়াস উদ্দীনকে ভোমরা সড়কের গাংনিয়া ব্রিজ এলাকায় চোরাকারবারীরা পিটিয়ে হত্যা করে। পিতার পথ ধরে অপরাধজগতে প্রবেশ করা নাহিদের পেছনে রয়েছে তার চাচা স্থানীয় পৌর বিএনপি নেতা নাছির উদ্দীনের রাজনৈতিক প্রভাব।
অভিযোগ রয়েছে, নাছির উদ্দীন প্রশাসনকে ম্যানেজ করার কারণে ভয়াবহ অনেক অপরাধের বিচার হয়নি নাহিদের। ফলে প্রশাসন ও আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পুরো শহরে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে কিশোর গ্যাঙ লিডার নাহিদ হাসান ও তার বাহিনীর সদস্যরা।
চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে কিশোর গ্যাঙ লিডার নাহিদের চাচা নাছির উদ্দীনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমার ভাইপো মুহিদ হাসান বনি ও জাকির হোসেন রনি এ ঘটনার সাথে জড়িত নয়। ঘটনার সময় নাহিদ নিজেও সেখানে ছিল না। আমাদের পরিবারকে সামাজিকভাবে হেয় করতে পরিকল্পিতভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। তবে নাহিদের অতীতের নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে আগের কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে পুলিশ তাকে ধরুক, তাতে আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু নিরীহ কাউকে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে আটক করা ঠিক হবে না।
সাতক্ষীরা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম এন্ড অপস) মিথুন সরকার জানান, কলেজ ছাত্র জাকারিয়া হত্যার ঘটনায় ইতোমধ্যে একজনকে আটক করা হয়েছে। বাকী আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
মন্তব্য করুন