
আমাদের বিভাগে প্রতিটি নতুন ব্যাচের প্রথম ক্লাসে আমি একটি অভ্যাস মেনে চলি। পাঠ্যসূচি খোলার আগে সবাইকে জিজ্ঞেস করি, ”আজ সকালে কে কী খেয়ে এসেছ?” প্রশ্নটা শুনে প্রথমে সবাই হাসে। কিন্তু উত্তরগুলো শুনতে শুনতে আমি অনেক কিছু জেনে ফেলি। কেউ বলে, খেয়ে আসার সময় হয়নি। কেউ বলে, হোস্টেলের খাবার মুখে রোচে না। একজন একবার মাথা নিচু করে বলেছিল, “স্যার, কাল রাতে ঘুম হয়নি।” সেদিন বুঝেছিলাম, শ্রেণিকক্ষে যে প্রশ্ন সবচেয়ে জরুরি, সেটিই সবচেয়ে কম করা হয়: “তুমি কেমন আছ?”
ঘুমহীন রাত আর ভারী ব্যাগ
একজন পলিটেকনিক শিক্ষার্থীর দিন শুরু হয় ভোরে। অনেকে বাড়ি থেকে দূরে মেসে বা হোস্টেলে থাকে। সকালের ক্লাস, দুপুরে ব্যবহারিক, বিকেলে প্রজেক্টের কাজ, রাতে পরের দিনের প্রস্তুতি। এর মাঝখানে আছে মোবাইলের পর্দা, যেখানে সহপাঠীর সাফল্যের ছবি, বিদেশে যাওয়া বড় ভাইয়ের পোস্ট, আর “কোন কোর্স করলে লাখ টাকার চাকরি” ধরনের বিজ্ঞাপন। এই তুলনার ভিড়ে একজন আঠারো বছরের তরুণ নিজেকে ছোট ভাবতে শুরু করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার অনেকগুলোর সূচনা ঘটে কৈশোর ও তারুণ্যের শুরুতে, আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা শনাক্তই হয় না। আমাদের দেশের পরিস্থিতিও ভিন্ন নয়। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপে দেখা গেছে, প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়া মানুষের সংখ্যা অত্যন্ত কম। অর্থাৎ বেশির ভাগ তরুণ কষ্টটা একা বয়ে বেড়ায়, আর আমরা সেটাকে “বয়সের ধর্ম” বলে পাশ কাটায়।
ব্যর্থতার ভয় যেখানে সবচেয়ে বড় পাঠ
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় ফেল করা মানে শুধু একটি বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়া নয়, তা প্রায় একটি সামাজিক ঘোষণা। “অমুকের ছেলে রেফার্ড”, এই বাক্য একটি পরিবারের ওপর যে ছায়া ফেলে, তা শিক্ষার্থী ভালো করেই জানে। ফলে সে ব্যর্থতাকে শেখার সুযোগ হিসেবে নিতে পারে না, নিতে শেখেও না।
অথচ আমার পেশার ক্ষেত্র আতিথেয়তা শিল্পে ভুল আর অভিযোজনই শেখার প্রধান উপায়। একজন নতুন শেফ প্রথমবার সস পুড়িয়ে ফেলে, একজন ফ্রন্ট ডেস্ক কর্মী প্রথমবার অতিথির অভিযোগ সামলাতে গিয়ে হোঁচট খায়। ভালো হোটেলগুলো এসব ভুলকে প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে ধরে। কিন্তু আমাদের পরীক্ষাপদ্ধতি ভুল করার সুযোগই দেয় না। তিন ঘণ্টার এক পরীক্ষায় শিক্ষার্থীর সারা সেমিস্টারের পরিশ্রমের বিচার হয়ে যায়।
শিক্ষক: একা এবং ক্লান্ত
এ লেখায় শুধু শিক্ষার্থীর কথা বললে অসম্পূর্ণ থেকে যায়, কারণ শিক্ষকও এই ব্যবস্থার ভেতরেই আছেন। একজন শিক্ষক পাঠদান, খাতা দেখা, প্রশাসনিক কাগজপত্র, প্রশিক্ষণ, পরিদর্শন, সব সামলান। সময় আর শক্তি কোনোটা প্রায়ই অবশিষ্ট থাকে না। এর মধ্যে শিক্ষার্থীর মনের খবর রাখার দায়িত্বটা তাঁর ওপর অলিখিতভাবে চেপে যায়, অথচ সে জন্য তাঁকে প্রস্তুত করা হয়নি।
আমি নিজে স্বীকার করি, অতীতে আমি অনেকবার ভুল করেছি। অনুপস্থিত শিক্ষার্থীকে কারণ জিজ্ঞেস না করে সরাসরি সতর্কবার্তা দিয়েছি। একবার একজন শিক্ষার্থী পরে জানিয়েছিল, সেই সময় তার বাবা হাসপাতালে ছিলেন। আমি জানতে চাইনি, সে-ও বলতে পারেনি। এই ঘটনা আমাকে শিখিয়েছে, শৃঙ্খলা আর সহমর্মিতা পরস্পরের বিপরীত নয়। বরং একটি ছাড়া অন্যটি অসম্পূর্ণ।
ছোট পরিবর্তন, বড় প্রভাব
বড় নীতিগত পরিবর্তনের দাবি জরুরি, তবে আমি বিশ্বাস করি, প্রতিটি প্রতিষ্ঠান আজই কিছু ছোট কাজ শুরু করতে পারে।
প্রথমত, প্রতিটি সেমিস্টারের শুরুতে একটি অনানুষ্ঠানিক “মন খুলে কথা বলার” আসর, যেখানে নম্বর নেই, মূল্যায়ন নেই, শুধু শোনা আছে।
দ্বিতীয়ত, প্রতিটি বিভাগে একজন করে “শিক্ষার্থী পরামর্শক শিক্ষক” নির্ধারণ, যাঁকে সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে এবং যাঁর কক্ষের দরজা শিক্ষার্থীদের জন্য সবসময় খোলা থাকবে।
তৃতীয়ত, পরীক্ষার সময়সূচিতে যুক্তিসংগত ব্যবধান রাখা এবং ফলাফলের পর অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলাদা আলোচনা, তাদের দোষ খোঁজার জন্য নয়, পরবর্তী পথ খুঁজে দেওয়ার জন্য।
চতুর্থত, হোস্টেল ও মেসে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত খোঁজখবর, বিশেষ করে পরীক্ষার মৌসুমে।
পঞ্চমত, খেলাধুলা, গান, আবৃত্তি, বৃক্ষরোপণ বা স্বেচ্ছাসেবার মতো কার্যক্রমকে পাঠ্যক্রমের “বাড়তি” নয়, “অপরিহার্য” অংশ হিসেবে দেখা।
এসব কাজে বিশাল বাজেট লাগে না, লাগে মনোযোগ। আর মনোযোগই সম্ভবত আজকের দিনে সবচেয়ে দুষ্প্রাপ্য উপহার।
সাহায্য চাওয়াকে সহজ করা
আমরা যত দিন সাহায্য চাওয়াকে দুর্বলতা ভাবব, তত দিন কোনো ব্যবস্থাই কাজ করবে না। একজন শিক্ষার্থী যখন বলে, “স্যার, আমি আর পারছি না,” তখন সেটা হার মানা নয়, সাহস। এই সাহসকে সম্মান জানানোর সংস্কৃতি আমাদের গড়তে হবে। সহপাঠীরা যেন এ কথা শুনে হাসাহাসি না করে, শিক্ষকেরা যেন উপদেশের ঝুড়ি না খোলেন, অভিভাবকেরা যেন একে অজুহাত না ভাবেন।
আর যদি কেউ এতটাই কষ্টে থাকে যে নিজের জীবন নিয়েই ভাবছে, তখন দেরি না করে একজন বিশ্বস্ত মানুষ ও পেশাদার সহায়তার কাছে পৌঁছানোই একমাত্র পথ। নীরবতা নয়, কথা বলাই সেখানে প্রথম চিকিৎসা।
শেষ কথা
প্রথম দিনের সেই প্রশ্নে ফিরে যাই। “আজ সকালে কী খেয়ে এসেছ?” প্রশ্নটা আসলে খাবারের নয়। এটি একটি দরজা, যার ওপাশে একজন শিক্ষার্থী আছে, যে কেবল অপেক্ষা করছে কেউ জিজ্ঞেস করুক। আমরা যদি সেই দরজায় একটু কড়া নাড়ার সাহস দেখাই, তাহলে হয়তো অনেক নীরব লড়াইয়ের সামনে একজন সঙ্গী খুঁজে দিতে পারব। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তখনই সত্যিকারের প্রস্তুত, যখন তার প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে নম্বরের হিসাবের পাশাপাশি একটি প্রশ্ন বেঁচে থাকে: “তুমি ভালো আছ তো?”
লেখক: বিভাগীয় প্রধান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, সাতক্ষীরা সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট
মন্তব্য করুন