বাংলাদেশ, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
১৫ কার্তিক ১৪৩৩ | সময়:
The Editors
৩০ অক্টোবর ২০২৬, ৮:৩৪ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

‘ডাকাতির ভয়ে আব্বা বাদায় যেতে পারে না, আমাগো বাঁচাও’

oplus_2097154

শ্যামনগর প্রতিনিধি: ‘ডাকাতির জন্য আব্বা বাদায় (সুন্দরবনে) যেতে পারে না, আমাগো (আমাদের) বাঁচাও।’ কথাগুলো বলছিল সুন্দরবনসংলগ্ন দ্বীপ ইউনিয়ন গাবুরার দৃষ্টিনন্দনের এবতেদায়ী মাদ্রাসার দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী ফাহাদ হোসেন। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের ৯নং সোরা গ্রাম থেকে এসেছে সে। তার ছোট্ট কণ্ঠে ছিল বাবার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, সংসারের অভাব আর অনিশ্চয়তা!

ফাহাদের বাবা সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। তাঁর উপার্জনেই চলে দাদাসহ ছয়জনের সংসার। ফাহাদের দাবি, বনদস্যুদের ভয়ে এখন তিনি বনে যেতে পারছেন না। আয় বন্ধ থাকায় সংসার কীভাবে চলবে, সেই দুশ্চিন্তা শিশুটির মনেও জায়গা করে নিয়েছে।

শুধু ফাহাদ নয়, তার সহপাঠী আরাফাত হোসেন, পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী সাইদুল ইসলাম ও তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী সাব্বির হোসেনেরও উদ্বেগ একই। তাদের সবার বাবাই সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। বনদস্যুদের হুমকি ও অপহরণের ভয়ে তাঁরা বনে যেতে পারছেন না। তাই বাবাদের নিরাপত্তা ও পরিবারের জীবিকার নিশ্চয়তার দাবিতে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করার আন্দোলনে দেখা গেল শিশুদেরও।

শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে চারটায় শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের নীলডুমুর বাজারে উপকূলীয় প্রেসক্লাব চত্বরে সুন্দরবনকে বনদস্যুমুক্ত করার দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতীকী অবস্থান কর্মসূচি পালন করে তারা।

এতে গাবুরা, বুড়িগোয়ালিনীসহ সুন্দরবনসংলগ্ন বিভিন্ন এলাকার জেলে, বাওয়ালী, শিশু, জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ অংশ নেন।

সেখানে ফাহাদের পাশে দাঁড়িয়ে আরাফাত জানায়, তার বাবা শহিদুল শেখ প্রায় তিন মাস ধরে সুন্দরবনে মাছ ধরতে যেতে পারছেন না। বনদস্যুরা তাঁকে হুমকি দিয়েছে, চাঁদা না দিয়ে বনে গেলে আর বাড়ি ফিরতে দেওয়া হবে না। তাই পরিবারের সদস্যরাও নিরাপত্তার কথা ভেবে তাঁকে বনে যেতে নিষেধ করেছেন। বাবার আয় বন্ধ থাকায় তাদের সংসারে আর্থিক সংকট দেখা দিয়েছে।

একই অবস্থা সাইদুল ও সাব্বিরের পরিবারেরও। তারা জানায়, তাদের পরিবারের উপার্জনকারীরা প্রায় এক মাস আগে সুন্দরবনে যাওয়ার পাস-পারমিট করিয়েছেন। কিন্তু বনদস্যুদের ভয়ে বনে যেতে সাহস পাচ্ছেন না। মাছ ও কাঁকড়া আহরণ করে যাঁদের সংসার চলত, তাঁদের এখন ঘরে বসে থাকতে হচ্ছে।

শিশুদের দাবি, সুন্দরবনকে বনদস্যুমুক্ত করতে হবে এবং তাদের বাবা-চাচাদের নিরাপদে বনে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ঢাকায় গিয়ে সরকারের কাছে দাবি জানাতেও প্রস্তুত তারা।

শিশুদের এই অংশগ্রহণ কর্মসূচিতে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে বলে মন্তব্য করেছেন সুন্দরবননির্ভর বনজীবীদের বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন-সংগ্রাম ও কথা বলে আসা নাগরিক নেতারা। তারা বলেন, বড়দের কথায় যেখানে বনদস্যুদের দৌরাত্ম্য, অপহরণ ও মুক্তিপণের কথা উঠে এসেছে, সেখানে শিশুদের কথায় ফুটে উঠেছে এর পারিবারিক ও মানবিক প্রভাব। তাদের কাছে বনদস্যুর আতঙ্ক মানে বাবার কর্মস্থলে যেতে না পারা, সংসারে অভাব আর বাবাকে হারানোর ভয়। উপকূলের এই শিশু ও তাদের পরিবারের কথা চিন্তা করে হলেও সুন্দরবনকে বনদস্যুমুক্ত করতে সরকারকে সর্বোচ্চ উদ্যোগ নিতে হবে।

উপকূলীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি আব্দুল হালিমের উদ্বোধনী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শুরু হয়। পরে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতীকী অবস্থান কর্মসূচি পালিত হয়।

কর্মসূচিতে বন বিভাগের ড্রোন নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন আন্দোলনের সমন্বয়ক সালাউদ্দিন লিটন। তিনি বলেন, ‘যে ড্রোনে নিরীহ জেলেদের দেখা যায়, সেই ড্রোনে কি বনদস্যুদের দেখা যায় না?’

বক্তারা সরকারের সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, সুন্দরবন উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকার অন্যতম অবলম্বন। কিন্তু বনদস্যুদের ভয়ে জেলে-বাওয়ালীরা বনে যেতে পারছেন না। অপহরণ ও মুক্তিপণের আতঙ্কে তাঁদের পরিবারও উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বনদস্যুদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া ও বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান তাঁরা।

কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন বিএনপির সদস্যসচিব জি এম রুস্তম আলী, গাবুরা ইউনিয়ন বিএনপির সদস্যসচিব খায়রুল ইসলাম মিলন, যুবনেতা খালিদ হোসেন, বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য এম এম রবিউল ইসলাম, ইউনিয়ন বিএনপির নেতা হেলাল উদ্দিন, ওহিদুল ইসলাম ও আবু হোছাইন, গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আবিয়ার রহমান, সংরক্ষিত নারী সদস্য ফরিদা খাতুন, গাবুরা ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য মাস্টার আব্দুর রহিম ও সিরাজুল ইসলাম, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের নেতা আশিকুর রহমান আশিক ও ইয়াছিন আরাফাত। এ ছাড়া বনদস্যু নির্মূল কমিটির নেতৃবৃন্দ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন মো. রবিউল ইসলাম।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মৌসুমের শুরুতেই দুর্যোগের ধাক্কা, দুবলার চরে শুঁটকি উৎপাদন ব্যাহত

১

কালিগঞ্জের কৃষ্ণনগরে মৎস্যজীবী দলের কমিটি গঠন

২

শ্যামনগরে কোস্টগার্ডের অভিযানে ফেনসিডিল ও ভারতীয় ঔষধ জব্দ

৩

আসন্ন সাতক্ষীরা পৌর নির্বাচনে অংশ নিতে চান মৌমি কুইন সাথী, মতবিনিময়

৪

দেবহাটায় পুলিশের অভিযানে গ্রেপ্তার ৫

৫

উদীচীর ৫৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সাতক্ষীরায় ৬ গুণী ব্যক্তিকে সংবর্ধনা

৬

থমকে আছে কেওড়াকাটা পর্যটন কেন্দ্রের ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণের কাজ

৭

‘ডাকাতির ভয়ে আব্বা বাদায় যেতে পারে না, আমাগো বাঁচাও’

৮

বিশ্বমঞ্চে সাতক্ষীরার উপকূলীয় জলবায়ু সংকট তুলে ধরবেন জান্নাতুল নাঈম

৯

জলবায়ু শিক্ষা ও আদিবাসী অধিকার নিয়ে শ্যামনগরে কুইজ

১০

সরকারি-বেসরকারি সেবাদাতাদের মানবাধিকার সুরক্ষায় ভূমিকা বিষয়ক মতবিনিময়

১১

তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে দু’পক্ষের গোলাগুলি, নিহত ২

১২

একদিনে ডেঙ্গুতে আরও ৬ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১৮৮৬

১৩

যান্ত্রিক ত্রুটি কাটিয়ে দেশের উদ্দেশে রওনা দিলেন প্রধানমন্ত্রী

১৪

শিল্পী কল্যাণ ট্রাস্টের এমডি হলেন শিবা শানু

১৫

নভেম্বরের জ্বালানি তেলের নতুন দাম নির্ধারণ

১৬

শ্যামনগরে দখল হওয়া স্কুলের জায়গা ফেরত পেতে রাস্তায় শিশু শিক্ষার্থীরা

১৭

বিজয়ের পথে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমিন

১৮

মোটরসাইকেল চালকদের জন্য বড় সুখবর

১৯

তালা বাজারের অবৈধ ৫টি দোকান উচ্ছেদ

২০