
ফরহাদ হোসেন, কয়রা (খুলনা): সুন্দরবন ঘেঁষা খুলনার কয়রা উপজেলায় পর্যটনের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে নেওয়া হয়েছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প।
প্রায় ১ কোটি ৬ লাখ টাকার ব্যয়ে নির্মাণের কথা ছিল চারতলা বিশিষ্ট একটি ওয়াচ টাওয়ার। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে প্রায় দেড় বছর আগে। অথচ এখনো নির্মাণকাজ শেষ হয়নি। নির্মাণস্থলে দৃশ্যমান হয়েছে মাত্র চারটি পিলার ও সিঁড়ির একটি ধাপ।
অর্থ ছাড় না হওয়ায় কাজ বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে সরকারি অর্থে নেওয়া প্রকল্পটি কবে নাগাদ আলোর মুখ দেখবে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কয়রা সদর ইউনিয়নের ৬ নম্বর কয়রা গ্রামের শাকবাড়িয়া নদীর বেড়িবাঁধসংলগ্ন এলাকায় প্রায় ২০ একর জায়গায় কেওড়াকাটা পর্যটনকেন্দ্রের জন্য এলাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নদীর পূর্ব পাশে বিস্তৃত সুন্দরবন। নদী, বন ও জীববৈচিত্র্যের প্রাকৃতিক দৃশ্য পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে এখানে নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয় চারতলা ওয়াচ টাওয়ারের।
তবে নির্মাণস্থলে গিয়ে দেখা যায়, চারিদিকে জোয়ারের পানিতে থৈ থৈ করছে, এর মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে ৪টি পিলার ও একটি শিড়ির ধাপ। এরপর আর কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
প্রকল্পের সময় শেষ, কাজ বাকি
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) কয়রা উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়ের নথি অনুযায়ী, ‘কয়রা সদর ইউনিয়নে কেওড়াকাটা পর্যটন কেন্দ্রে ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ’ প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ১ কোটি ৬ লাখ ৪০ হাজার ১৯১ টাকা। দরপত্রের মাধ্যমে ১ কোটি ৬ লাখ ২২ হাজার ১৫৯ টাকায় কাজটি পায় মেসার্স সৈয়দ জিয়াউল হক নামের একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান।
২০২৪ সালের ২২ আগস্ট ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী ৩০ আগস্ট ২০২৪ নির্মাণকাজ শুরু করে ২০২৫ সালের ২৯ মে’র মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়সীমা পার হয়ে গেলেও প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি। বরং সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও নির্মাণকাজ পড়ে রয়েছে অসম্পূর্ণ অবস্থায়।
এখানেই প্রশ্ন উঠছে—প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কেন কাজ শেষ হলো না? নির্মাণকাজ বন্ধ হওয়ার কারণ যদি অর্থ ছাড়ের জটিলতা হয়ে থাকে, তাহলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ ছাড় নিশ্চিত করা গেল না কেন? আর প্রকল্পটি অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়ে থাকায় এর দায়ই বা কার?
প্রায় ৪৯ লাখ টাকা খরচের দাবি ঠিকাদারের
ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের সত্ত্বাধিকারী সৈয়দ জিয়াউল হক বলেন, পর্যটন কেন্দ্র নির্মাণে প্রায় ৪৯ লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে। খুলনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে অর্থ ছাড়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেওয়ায় এই মুহূর্তে কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। অর্থ ছাড় হলে পুনরায় কাজ শুরু করব।
তিনি বলেন, পর্যটন কেন্দ্রটির নির্মাণকাজ শেষ হলে স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
অর্থ ছাড়ের অপেক্ষায় প্রকল্প
কয়রা উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকৌশলী মো. শাফিন শোয়েব বলেন, প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ ও ছাড়ের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু করা সম্ভব হবে।
তবে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে অর্থ ছাড়ের বিষয়টি সামনে এলেও প্রকল্পের অর্থায়ন ও ছাড়ের প্রক্রিয়া কোথায় আটকে আছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে একটি সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প কেন থমকে আছে, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।
কয়রার স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আইসিডির প্রতিষ্ঠতা আশিকুজ্জামান বলেন, দ্রুত প্রয়োজনীয় অর্থ ছাড়ের ব্যবস্থা করে কাজ পুনরায় শুরু এবং নির্মাণকাজের গুণগত মান নিশ্চিত করে প্রকল্পটি দ্রুত শেষ করা দরকার।
সম্ভাবনা আছে, নেই অবকাঠামো
সুন্দরবনের কোলঘেঁষা কেওড়াকাটায় নদী, বন ও জীববৈচিত্র্যের সমন্বিত প্রাকৃতিক পরিবেশ রয়েছে। পরিকল্পিত অবকাঠামো তৈরি হলে এ স্থানটি স্থানীয় ও বাইরের পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণের অন্যতম উদ্দেশ্যও ছিল পর্যটকদের জন্য সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ তৈরি করা।
স্থানীয় মোঃ শফিকুল ইসলাম বলেন , পর্যটন সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে এলাকাটি এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে বিকশিত হয়নি। একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণ শুরু হয়ে দীর্ঘদিন অসম্পূর্ণ পড়ে থাকলে সরকারি অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়।

মন্তব্য করুন