
মৃত্যুঞ্জয় রায় অপূর্ব: পুরো শরীরে কাপুনি। ব্যানার হাতে কাপছিলেন বীর মুুক্তিযোদ্ধা আব্দুল গফ্ফার। তাও থেমে থাকেননি। যে বয়সে মানুষের ঘরে বসে বিশ্রাম নেওয়ার কথা, সেই বয়সে ব্যানার হাতে অন্যদের সঙ্গে রাস্তায় দাঁড়ান তিনি।
সোমবার (২ নভেম্বর) সকাল ১১টায় সাতক্ষীরা শহরের পাকাপোলের ওপরে পিরোজপুরে প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর জানাজা ও দাফনে বাধা দেওয়ার ঘটনার তীব্র নিন্দা এবং এর সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে ব্যানার হাতে দেখা যায় তাকে।
শুধু আব্দুল গফ্ফার নন তার মতো শত শত মুক্তিযোদ্ধা জড়ো হন সেখানে। রাস্তার দুই পাশে ব্যানার হাতে দাড়ান তারা।
আব্দুল গফ্ফার বলেন, বয়স হয়েছে বলে আমাদের অধিকার ছেড়ে দিবো? তা হবে না। আমরা এই দেশ স্বাধীন করেছি। আমাদের রক্তের বিনিময়ে আপনারা এ দেশ পেয়েছেন। কিন্তু বিনিময়ে আপনারা আমাদের শেষ সময়ে এক মুঠো মাটি দেওয়ার জায়গা টুকুও দিচ্ছেন না। এই অসম্মান আমরা মেনে নিবো না। এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানায়। যদি এই ঘটনার কারণে আমাদের আবার মুক্তিযুদ্ধ করতে হয় তাও আমরা পিছু হাটবো না। আমরা অস্ত্র জমা দিলেও যুদ্ধ করার অভিজ্ঞতা হারিয়ে ফেলি নি। শেষ বয়সে এসেও যদি আন্দোলনে নামতে হয় নামবো। তাও এটার সঠিক বিচার চাই।
আব্দুল গফ্ফারে মতো প্রতিবাদ জানাতে এসেছিলেন আকরাম গাজী। তিনি আসেন কালিগঞ্জ থেকে। তিনি বলেন, আমি স্বাধীনতার অপশক্তিদেরকে স্মরণ করে দিতে চাই- যারা বাংলার স্বাধীনতা সূর্যকে ছিনিয়ে এনেছেন তাদের অন্তিম মুহূর্তে মৃত্যুর পরে মাটি দিতে বাধা দিও না। তোমরা কি মুসলিম, না হিন্দু, না বৌদ্ধ, না খ্রিস্টান কোন জাতিতে বসবাস করো। যে একজন মুসলমান হয়ে মুসলমান মুক্তিযোদ্ধাকে মাটি দিতে দেওনি। মুসলমান হয়ে এর থেকে খারাপ কাজ হয় না। আমি ধিক্কার জানাই তাদের।
সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ও সাবেক পিপি অ্যাডভোকেট সৈয়দ ইফতেখার আলী বলেন, ১৯৭১ সালে পরাজিত শক্তি আজও তাদের হায়নার রূপ নিয়ে বাংলাদেশের মাটিতে নতুন করে চক্রান্ত শুরু করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় তারা পিরোজপুরের বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর জানাজা ও দাফনে বাধা সৃষ্টি করেছে।
তিনি আরও বলেন, একজন মুসলমান কীভাবে আরেকজন মুসলমানের দাফন ও জানাজায় বাধা দিতে পারে? ৭১-এর এই পরাজিত শক্তি শুধু এখানেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা ইতিপূর্বে দেশের শতাধিক মাজার ভেঙে চুরমার করেছে। এমনকি দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর কবর থেকে লাশ উত্তোলন করে পুড়িয়ে দেওয়ার মতো জঘন্য ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে।
এ দেশ রাজাকারের নয় মন্তব্য করে তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সকলকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সাতক্ষীরা জেলা ইউনিটের আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. শহিদুল ইসলামের সভাপতিত্বে প্রতিবাদ সভাটি সঞ্চালনা করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট মোস্তফা নুরুল আলম।
বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সাতক্ষীরা জেলা ইউনিট কমান্ডের আয়োজনে এই মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়। এতে তিন শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা ছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ অংশগ্রহণ করেন।
বক্তারা অবিলম্বে এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তপূর্বক জড়িতদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির দাবি জানান, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন ধৃষ্টতা দেখানোর সাহস না পায়।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সাতক্ষীরা প্রেস ক্লাবের সভাপতি আবুল কাশেম, সিনিয়র সাংবাদিক কল্যাণ ব্যানার্জি, বীর মুক্তিযোদ্ধা জাহাঙ্গীর হোসেন, আব্দুর রউফ, আব্দুল হামিদ, আব্দুস সোবহান, শফিক আহমেদ, রফিকুল ইসলাম, গণফোরাম নেতা আলিনুর খান বাবুল, জাসদ নেতা হেলালুর রহমান, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের অধ্যক্ষ আশেক ই এলাহী, সিপিবি নেতা আবুল হোসেন, ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা স্বপন কুমার শীল প্রমুখ।

মন্তব্য করুন