
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি, আমদানিনির্ভরতা এবং গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব এখন আমাদের জীবনযাত্রায় স্পষ্ট। বিশেষ করে রান্নার কাজে ব্যবহৃত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় চাপে পড়েছে নিম্নবিত্ত মানুষ।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) ঘোষণা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের নভেম্বর মাসে ১২ কেজির বেসরকারি এলপিজি সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ২ হাজার ৬০ টাকা। মাত্র দুই মাসে এই সিলিন্ডারের দাম বেড়েছে ৪৭৫ টাকা। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, রান্নার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর বিকল্প কী?
এই প্রশ্নের একটি বাস্তবসম্মত উত্তর হতে পারে বায়োগ্যাস।
বাংলাদেশের গ্রাম ও উপশহরগুলোতে অসংখ্য পরিবার গবাদিপশু পালন করে। কোথাও পারিবারিকভাবে, আবার কোথাও বাণিজ্যিকভাবে গড়ে উঠেছে গরু ও হাঁস-মুরগির খামার। এসব খামার থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ গোবর ও জৈব বর্জ্য উৎপন্ন হয়। কিন্তু পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা ও সচেতনতার অভাবে এসব সম্পদের একটি বড় অংশ যথাযথভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না। অথচ গোবর ও অন্যান্য জৈব বর্জ্য থেকে উৎপাদিত বায়োগ্যাস দিয়ে পরিবারের রান্নার প্রয়োজন মেটানো সম্ভব। শুধু তা-ই নয়, বায়োগ্যাস উৎপাদনের পর অবশিষ্ট জৈব উপাদান উন্নতমানের জৈব সার হিসেবে কৃষিজমিতে ব্যবহার করা যায়। অর্থাৎ একটি বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের মাধ্যমে একই সঙ্গে বহুমুখী চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।
বাংলাদেশে বায়োগ্যাসের সম্ভাবনা কেবল ধারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (আইডিসিওএল) তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সাল থেকে বাস্তবায়িত বায়োগ্যাস ও জৈব সার কর্মসূচির আওতায় ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে ৬৮ হাজারের বেশি বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপনে অর্থায়ন করা হয়েছে। এসব প্ল্যান্ট থেকে রান্নার জ্বালানি সরবরাহের পাশাপাশি প্রতিবছর প্রায় চার লাখ টন জৈব সার উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। আইডিসিওএলের তথ্যে আরও বলা হয়েছে, দেশে পাঁচ বা তার বেশি গবাদিপশু রয়েছে এমন প্রায় ৯ লাখ ৫২ হাজার পরিবার রয়েছে। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, বায়োগ্যাস সম্প্রসারণের জন্য দেশে একটি বড় সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র রয়েছে।
সাতক্ষীরার তালা উপজেলার জেয়ালা গ্রাম এ ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ২০২১ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় গ্রামটির গোবর ব্যবস্থাপনা, বায়োগ্যাস উৎপাদন এবং উৎপাদিত জৈব অবশিষ্টাংশ সার হিসেবে ব্যবহারের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এটি প্রমাণ করে, স্থানীয় সম্পদের পরিকল্পিত ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে জ্বালানি ও কৃষি—দুই ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
সাতক্ষীরায় বায়োগ্যাস উদ্যোক্তা তৈরিতে বেসরকারি সংস্থা উন্নয়ন প্রচেষ্টার উদ্যোগও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এবং পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) সহযোগিতায় বাস্তবায়িত এসইপি (SEP) ও স্মার্ট (SMART) প্রকল্পের মাধ্যমে উন্নয়ন প্রচেষ্টা স্থানীয় পর্যায়ে বায়োগ্যাস উদ্যোক্তা তৈরিতে কাজ করছে। এ উদ্যোগের মাধ্যমে গবাদিপশুর খামার থেকে উৎপাদিত গোবরকে জ্বালানিতে রূপান্তর, পরিবেশসম্মত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে। এ ধরনের উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত করা গেলে সাতক্ষীরা হতে পারে গ্রামীণ বায়োগ্যাসভিত্তিক জ্বালানি ব্যবস্থার একটি সম্ভাবনাময় মডেল।
এ ক্ষেত্রে পিকেএসএফ, আইডিসিওএলসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর উদ্যোগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন। বিশেষ করে উপকূলীয় ও কৃষিনির্ভর অঞ্চলে পারিবারিক বায়োগ্যাসের পাশাপাশি কমিউনিটি বায়োগ্যাস ব্যবস্থা সম্প্রসারণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। যেসব পরিবারের নিজস্ব খামার নেই, তারাও সমবায় বা স্থানীয় উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে এ সুবিধার আওতায় আসতে পারে। কয়েকটি খামারের গোবর একত্র করে একটি কমিউনিটি প্ল্যান্ট স্থাপন করা গেলে একাধিক পরিবারের রান্নার জ্বালানির চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।
তবে বায়োগ্যাসকে জনপ্রিয় করতে শুধু প্ল্যান্ট স্থাপন করলেই হবে না। প্রয়োজন সহজ অর্থায়ন, কারিগরি সহায়তা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, জনসচেতনতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে দক্ষ উদ্যোক্তা তৈরি। পাশাপাশি প্রতিটি এলাকার গোবর ও জৈব বর্জ্যের প্রাপ্যতা বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। প্ল্যান্ট স্থাপনের পরও যেন তা সচল থাকে, সে জন্য প্রশিক্ষিত জনবল ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারি প্রণোদনা, সহজ শর্তে ঋণ এবং বায়োগ্যাস উদ্যোক্তাদের জন্য বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলাও সময়ের দাবি।
জ্বালানি সংকটের সমাধান শুধু নতুন উৎস খোঁজার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; আমাদের চারপাশে থাকা অব্যবহৃত সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এলপিজির একমাত্র বিকল্প বায়োগ্যাস নয়, তবে গ্রামীণ ও উপশহরাঞ্চলে এটি হতে পারে একটি কার্যকর ব্যবস্থা। রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা, উন্নয়ন সংস্থার সহযোগিতা এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে গোবর আর অবহেলিত বর্জ্য থাকবে না; হয়ে উঠবে পরিবারের রান্নার জ্বালানি, কৃষকের জৈব সার এবং গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনা।
আমাদের মনে রাখতে হবে, জ্বালানি স্বনির্ভরতা কেবল বড় বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র কিংবা আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভর করে অর্জন করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন স্থানীয় সম্পদ ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো। আজ যে গোবরকে আমরা বর্জ্য হিসেবে দেখছি, সঠিক পরিকল্পনা ও প্রযুক্তির ব্যবহারে সেটিই হতে পারে আগামী দিনের পরিচ্ছন্ন জ্বালানির উৎস। এখনই সময় বায়োগ্যাসকে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ থেকে জাতীয় জ্বালানি পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করার।
লেখক: উন্নয়ন কর্মী

মন্তব্য করুন