
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত বাঙালি মুসলমানের যে বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ ঘটেছিল, তার পেছনে নিভৃতে কাজ করে গেছেন এমন কিছু দূরদর্শী চিন্তাবিদ, যাদের জীবন ও সাধনা আমাদের জাতীয় ইতিহাসে অনন্য গুরুত্ব বহন করে। এই ক্ষণজন্মা পুরুষদের অন্যতম হলেন সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও সমাজচিন্তক মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী। ১৮৯৬ সালের এই দিনে (৮ নভেম্বর, ১৯৫৪) প্রয়াত হওয়া এই মনীষী তাঁর স্বচ্ছ চিন্তা, যুক্তিনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গি এবং সহজ-সরল গদ্যশৈলীর মাধ্যমে সমকালীন সমাজে এক অবিস্মরণীয় বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।
ওয়াজেদ আলীর কাছে সাহিত্য কখনোই কেবল বিনোদন বা অলংকার ছিল না; বরং তা ছিল সমাজকে চেনার ও জাগিয়ে তোলার আয়না। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, একটি সমাজকে এগিয়ে নিতে হলে তাকে নিজের ইতিহাস, আদর্শ ও আত্মপরিচয়ের শেকড়সন্ধানী হতে হবে। বাংলা ভাষায় মুসলমানদের চিন্তা ও সাহিত্যচর্চার পরিসর বিস্তৃত করায় এবং নবপ্রজন্মকে নিজেদের ঐতিহ্য ও ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত করায় তাঁর ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য।
সাতক্ষীরার বাঁশদহ গ্রামের এক পল্লী চিকিৎসক পরিবারে জন্ম নেওয়া ওয়াজেদ আলীর জীবন গড়ে উঠেছিল মুক্তবুদ্ধি ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। বাবার চিকিৎসালয়টি কেবল চিকিৎসার স্থান ছিল না; সেটি ছিল সমকালীন সমাজ ও রাজনীতির আলোচনা-বিতর্কের এক ঊর্বর ক্ষেত্র। পরবর্তীকালে কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজে অধ্যয়নকালে ব্রিটিশবিরোধী অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়ে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাট চুকিয়ে দেন। কিন্তু সেই বর্জন তাঁর জ্ঞানচর্চাকে থামিয়ে দিতে পারেনি; বরং রাজনৈতিক আন্দোলন ও সমাজবাস্তবতার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তাঁর সাহিত্য ও চিন্তাকে আরও শাণিত ও গভীর করে তুলেছিল।
কর্মজীবনে সাংবাদিকতাকে প্রধান মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়ে তিনি ‘মোহাম্মদী’, ‘নবযুগ’, ‘সওগাত’, ‘খাদেম’, ‘দি মুসলমান’ এবং ‘দৈনিক সেবক’-এর মতো প্রভাবশালী পত্রপত্রিকায় যুক্ত ছিলেন। তাঁর সাংবাদিকতার মূল বৈশিষ্ট্য ছিল খবরের গভীরে প্রবেশ করা—ঘটনার পেছনের সামাজিক বাস্তবতা ও মানসিকতাকে উন্মোচন করা। মুসলিম সমাজের দুর্বলতা ও সংকটগুলোকে তিনি যেমন সাহসিকতার সঙ্গে চিহ্নিত করেছেন, তেমনি উত্তরণের পথও দেখিয়েছেন। তাঁর হাত ধরে সাংবাদিকতা নিছক সংবাদ পরিবেশন ছাড়িয়ে হয়ে উঠেছিল সমাজসচেতনতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের হাতিয়ার।
সাহিত্যের আঙিনায় তাঁর অবদান সমানভাবে ভাস্বর। ‘মরুভাস্কর’, ‘মহামানুষ মুহসিন’, ‘ছোটদের হজরত মুহাম্মদ’, ‘সৈয়দ আহমদ’ ও ‘মোহাম্মদ আলী’-র মতো গ্রন্থগুলোর মাধ্যমে তিনি বাংলা সীরাত সাহিত্য ও ইতিহাসচর্চায় অনন্য মাত্রা যোগ করেন। বিশেষ করে ‘মরুভাস্কর’ গ্রন্থে মহানবী (স.)-এর জীবন ও আদর্শকে সাবলীল বাংলায় তুলে ধরে তিনি বাংলা সাহিত্যকে ঋদ্ধ করেছেন। ধর্মীয় অনুরাগের সঙ্গে ইতিহাসচেতনা এবং আধুনিক যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গির অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিল তাঁর লেখায়। পাশাপাশি, বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে বাঙালি পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দিতে তিনি ‘স্মার্ণানন্দিনী’ ও ‘ডন কুইজসোটের গল্প’ অনুবাদ করেন।
তাঁর জীবনের সবচেয়ে দূরদর্শী দিকটি ছিল বাংলা ভাষাকে বাঙালি মুসলমানের জ্ঞানচর্চার প্রধান মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রত্যয়। তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে, নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতির ভিত শক্ত না করলে কোনো জাতি বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। জীবনের শেষভাগে কলকাতা ছেড়ে জন্মভূমি বাঁশদহে ফিরে এলেও তাঁর মননশীল চর্চায় কখনো ভাটা পড়েনি।
আজকের দিনে যখন আমরা বাঙালি মুসলমানের নিজস্ব ইতিহাস, বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য এবং আত্মপরিচয়ের সংকট ও সম্ভাবনার কথা বলি, তখন মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীর জীবন ও সাহিত্য আমাদের সামনে এক পথপ্রদর্শক হিসেবে হাজির হয়। তাঁর স্বচ্ছ চিন্তা এবং সমাজসচেতন সাহিত্যসাধনা আমাদের জাতীয় ইতিহাসে কেবল একটি অধ্যায় নয়, বরং এক চিরকালীন অনুপ্রেরণা।
লেখক : সভাপতি, সাতক্ষীরা বোটানিক্যাল সোসাইটি

মন্তব্য করুন