
সুলতান শাহাজান, শ্যামনগর: সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করার দাবিতে উপকূলে চলমান আন্দোলনের মধ্যেই অন্তত ১১ জেলেকে অপহরণের খবর পাওয়া গেছে।
পশ্চিম সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের বিভিন্ন নদী-খাল থেকে মুক্তিপণের দাবিতে তাদের অপহরণ করা হয়।
স্বজন ও ফিরে আসা জেলেদের ভাষ্য, শ্যামনগরের গাবুরা ইউনিয়নের আমির আলী ও দাতিনাখালী গ্রামের আলম সানার নেতৃত্বাধীন দুটি বাহিনীর পরিচয়ে তাদের অপহরণ করা হয়।
শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে রোববার বিকাল পর্যন্ত সুন্দরবনের নোটাবেঁকী, আগুনজ্বালা, জলঢাকা, চালতেবেড়ে ও রায়মঙ্গল নদীর বিভিন্ন এলাকা থেকে এসব জেলেকে তুলে নেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
অপহরণকারীদের কবল থেকে ফিরে আসা জেলেরা বলছেন, আরও বেশ কয়েকজন জেলে অপহৃত হয়েছেন। তবে তাৎক্ষণিক এখন পর্যন্ত ১১ জনের নাম-পরিচয় পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে আটজন শ্যামনগরের বাসিন্দা। তাঁরা হলেন গাবুরার ডুমুরিয়া গ্রামের রুবেল, ইমরান ও খোরশেদ, মুন্সিগঞ্জের চুনকুড়ি গ্রামের আবু তাহের, সিংহড়তলীর সুরোত আলী, মথুরাপুর গ্রামের লিয়াকত আলী এবং কালিঞ্চি গ্রামের সিদ্দিক গাজী ও জহুর আলী।
বাকি তিনজন কয়রা উপজেলার গোবরা গ্রামের মোমিন মোড়ল, দিদারুল ও ইমরান।
তবে ফিরে আসা জেলেরা জানিয়েছেন, অপহৃতের সংখ্যা আরও বেশি। বাকিদের নাম-পরিচয় ও সঠিক সংখ্যা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অপহৃত জেলেদের স্বজন ও ফিরে আসা কয়েকজন জেলে জানান, প্রতিটি নৌকায় তিন থেকে চারজন করে জেলে ছিলেন। সেখান থেকে প্রতি নৌকার একজন করে তুলে নেওয়া হয়। খোরশেদ, দিদারুল ও ইমরানসহ দশজনের মুক্তির জন্য এক লাখ টাকা করে মুক্তিপণ চাওয়া হয়েছে। নৌকা নিয়ে বনের ভেতরে একা থাকা সুরোত আলীর জন্য তুলনামূলক কম মুক্তিপণ চাওয়া হলেও টাকার পরিমাণ জানা যায়নি।
অপহরণের এই খবর এমন সময়ে এল, যখন দস্যু দমনের দাবিতে শ্যামনগরের বনজীবীরা কয়েক দিন ধরে টানা আন্দোলন করছেন। গাবুরা, মুন্সিগঞ্জ ও রমজাননগর ইউনিয়নসহ সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার নাগরিক সমাজ, জেলে-বাওয়ালী ও উপকূলের বাসিন্দারা মানববন্ধন, বিক্ষোভ সমাবেশ ও স্মারকলিপি প্রদানসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছেন।
সেখানে বক্তারা অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায় বন্ধ এবং জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান। তাঁরা দস্যুদের ‘আত্মসমর্পণের নামে নাটক’ বন্ধ এবং সহযোগীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনারও দাবি তোলেন।
আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি আগামীকাল সোমবার সকালে। সুন্দরবনের বনজীবীরা নিজেদের ব্যবহৃত নৌকা নিয়ে গাবুরার দৃষ্টিনন্দন এলাকা থেকে বুড়িগোয়ালিনীর নীলডুমুর খেয়াঘাট পর্যন্ত ‘নৌকা বন্ধন’ করবেন।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বনে ঢুকতে নৌকাপ্রতি ৪০ হাজার থেকে এক লাখ টাকার বেশি অগ্রিম চাঁদা দিতে হচ্ছে। তাঁদের হিসাবে সুন্দরবনে ১২ থেকে ১৪টি দস্যু দল সক্রিয়। কোস্টগার্ড বলছে, চাঁদা নিয়ে বনজীবীদের কাছ থেকে তারা সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ পায়নি। তবে গণমাধ্যমের খবর নজরে এসেছে এবং সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সংস্থাটির মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন লিখিত জবাবে জানান, তাদের হিসাবে সক্রিয় বাহিনী ১১টি, সদস্য শতাধিক।
কোস্টগার্ডের তথ্য অনুযায়ী, ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ৫৭ জন জেলে, দুজন পর্যটক ও একজন রিসোর্ট মালিক জিম্মিদশা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। ৪১ জন দস্যু আটক হয়েছে, ৫১ জন আত্মসমর্পণ করেছে।
কোস্টগার্ডের ভাষ্য, ধারাবাহিক অভিযানে বাহিনীগুলো অনেকটা দুর্বল ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
আন্দোলনে অংশ নেওয়া বনজীবীদের পরিবার অবশ্য আশঙ্কা করছে, বনে গেলে তাঁরা প্রতিশোধের শিকার হতে পারেন।
এ বিষয়ে কোস্টগার্ড জানায়, প্রবেশপথ, নদী ও খালে নজরদারি ও টহল জোরদার করা হয়েছে। বিপদে পড়লে জরুরি নম্বর ১৬১১১-এ যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
এর মধ্যেই সুন্দরবনের আলোচিত বনদস্যু জোনাব বাহিনীর প্রধান জোনাব আলী গত শুক্রবার রাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন। তারপরও অপহরণ থামছে না। এতে সুন্দরবননির্ভর হাজারো বনজীবী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দস্যু আতঙ্ক যেন কাটছেই না।
সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক শাহিনুর ইসলাম বলেন, কয়েকজন জেলেকে অপহরণের বিষয়টি তাঁরা জেলেদের মাধ্যমে জানতে পেরেছেন। বন বিভাগের টহল দল সুন্দরবনের ভেতরে অভিযান চালাচ্ছে। তবে বিশাল বনাঞ্চলে জলদস্যুদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা বন বিভাগের একার পক্ষে কঠিন।
শ্যামনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাফিউল ইসলাম পাটোয়ারী বলেন, জলদস্যুদের হাতে জিম্মি হলে সাধারণত জেলেদের পরিবার গোপনে তাদের সঙ্গে সমঝোতা করে। এ কারণে মুক্তি পেয়ে ফিরে আসা জেলেরা অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তথ্য দিতে চান না। তবে মুক্তিপণের টাকা আদায়ে ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বরের মালিককে শনাক্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের আটকের চেষ্টা করছে পুলিশ।
বনদস্যু নির্মূল কমিটির ব্যানারে আন্দোলনে থাকা আব্দুল হালিম বলেন, সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করার দাবিতে উপকূলের মানুষের আন্দোলনের মধ্যেই নতুন করে জেলে অপহরণের খবর বনজীবীদের নিরাপত্তা নিয়ে আবারও প্রশ্ন তুলেছে। জীবিকার প্রয়োজনে বনে যাওয়া জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে তাঁদের জীবন-জীবিকা আরও অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।

মন্তব্য করুন