
শুরুতেই উপকূলের গ্রামীণ নারী বাঘবিধবা হালিমা খাতুনের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প বলি। হালিমার বয়স যখন ১২ বছর ৩ মাস, তখন তাঁর বিয়ে হয়। বিয়ের ৭ মাসের মাথায় স্বামী বনজীবী আলমগীর সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে নিহত হন। ৩ মাসের অন্তঃসত্ত্বা হালিমা তখন নিজেই শিশু। গর্ভে সন্তান, স্বামীর মৃত্যু। অবর্ণনীয় এক কষ্টের পাহাড় যখন তার উপর চেপে বসল, ঠাঁই হলো না শ্বশুর বাড়িতেও। হালিমা জীবন ও জীবিকার তাগিদে গ্রাম থেকে খুলনা শহরে আশ্রয় নিলেও মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে আবার গ্রামে ফিরতে হয় তাকে। উপজেলা সদরে ছোট্ট একটি ঘর ভাড়া করে হালিমা অন্যের বাসাবাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে আহার জুগিয়ে মেয়েকে বড় করার স্বপ্ন দেখে। কিছুদিনের মধ্যে হার্টের সমস্যা ধরা পড়লে ঝিয়ের কাজও ছুটে যায়। পুরো আকাশ ভেঙে পড়ে তাঁর মাথার উপর। দুনিয়া অন্ধকার হয়ে ওঠে তাঁর কাছে । নিজে কোনো উদ্যোগ বা ছোটাখোটো ব্যবসা করে স্বাবলম্বী হবার জন্য ছুটতে থাকে।
কিন্তু কে বা কোন প্রতিষ্ঠান এই হালিমা খাতুনদের ঋণ দেবে, কে তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে দিক নির্দেশনা দিয়ে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করবে?
এমন মুহূর্তে তার পাশে দাড়িয়েছে ইনিশিয়েটিভ ফর কোস্টাল ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (আইসিডি)। দুঃখ ঘুচেছে হালিমা খাতুনের, ঘুরেছে ভাগ্যের চাকা। সামাজিক অবহেলা ও বঞ্চনাকে পায়ে মাড়িয়ে ফিরে পেয়েছে সামাজিক মর্যাদা। সমাজের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁর কদর বেড়েছে। খুলনার কয়রা উপজেলার বাঘবিধবা হালিমা খাতুন এখন উপকূলের নারীদের রোল মডেল। ঝিয়ের কাজের বিনিময়ে যারা পঁচাবাসী খাবার দিত, তাঁরাও এখন হালিমার চায়ের দোকানের নিয়মিত ক্রেতা।
কিন্তু এখনো অসংখ্য হালিমা অবহেলিত, সুবিধাবঞ্চিত।
আজ ১৫ অক্টোবর, আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের অসংখ্য সংগ্রামী নারী নিরন্তর মোকাবেলা করছেন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, হারাচ্ছেন ঘরবাড়ি।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা ১৯৮০ সালের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেড়েছে। ফলে লবণাক্ততার প্রভাবে নারী স্বাস্থ্য ও নিরাপদ মাতৃত্ব চরম ঝুঁকিতে রয়েছে ।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, দক্ষিণ-পশ্চিম সমুদ্রসীমান্ত অঞ্চলে ৩ শতাংশের বেশি নারী ইউটিআই (urinary tract infection) ও গাইনোকলজিকেল সমস্যায় ভুগছেন।
উপকূলের নারী স্বাস্থ্য নিয়ে ব্যাপক ভাবনার সময় এসেছে। তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার সাথে কর্মের সংস্থান নিয়েও ভাবতে হবে। হালিমা খাতুনদের মতো ঘুরে দাঁড়ানোর প্রবল স্পৃহা থাকা নারীদের খুঁজে বের করে পাশে দাঁড়াতে হবে। শুধু দিবস উপলক্ষে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়, বরং গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তাহলে নারীর অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত হবে।
লেখক: প্রতিষ্ঠাতা, আইসিডি
asikuzzaman174@gmail.com
মন্তব্য করুন