
ফরহাদ হোসেন, কয়রা: সুন্দরবনে চোরা শিকারী ও বনজ সম্পদ লুটেরাদের তৎপরতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। বনবিভাগের তৎপরতা থাকলেও থামছে না তাদের দৌরাত্ম্য। নানামুখী সংকট আর বনদস্যুদের চাপে হিমসিম খাচ্ছে বন বিভাগ।
বনবিভাগ জানায়, পশ্চিম সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জে এক বছরে ৩৯৬ জন বন অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ সময় উদ্ধার করা হয়েছে ৫৭১২ মিটার হরিণ ধরার ফাঁদ, ৪৮৭ কেজি হরিণের মাংস এবং বিপুল পরিমাণ অবৈধ মৎস্য ও কাঁকড়া আহরণের সরঞ্জাম।
একই সঙ্গে বন্যপ্রাণী শিকার বন্ধ করতে এর সাথে জড়িত ১৩৫ জনের একটি বিশেষ তালিকা তৈরি করে তাদেরকে নজরদারিকে রাখা হয়েছে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় বনরক্ষীরা বনের গহীনে পায়ে হেঁটে ও জলপথে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। এই ১ বছরে বন অপরাধের দায়ে খুলনা রেঞ্জে মোট ২৯৪টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় মোট ৩৯৬ জনকে হাতেনাতে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া পলাতক আসামি রয়েছে ৬৩ জন। এর মধ্যে অভয়ারণ্যে মাছ ও কাঁকড়া ধরার অপরাধে মামলা দায়ের করা হয়েছে ১০৬টি। বিষ সংক্রান্ত মামলা হয়েছে ৩৩টি।
গত ১ বছরে জব্দকৃত সামগ্রীর তালিকায় রয়েছে ২২টি ট্রলার, ৩৪৯টি নৌকা, ৬ হাজার ৯৮৬টি অবৈধ কাঁকড়া ধরার (আটন) ফাঁদ, ৯৮৩৩ মিটার দৌনদড়ি, ২৬১২ কেজি মাছ এবং ১ হাজার ৯৮১ কেজি অবৈধভাবে আহরিত কাঁকড়া।
এছাড়া সুন্দরবনের নদী ও খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারি চক্রের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ সময় দস্যু ও অসাধু চক্রের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ৮৭ বোতল মাছ ধরার অবৈধ কীটনাশক। জব্দ করা হয়েছে ২০৩ কেজি মধু। হরিণ সংক্রান্ত মামলা হয়েছে ৩৩টি। অভিযানে জব্দ করা হয় ৪৮৭ কেজি হরিণের মাংস ও ৫ হাজার ৭১২ মিটার হরিণ ধরার ফাঁদ।
কয়রার কপোতাক্ষ কলেজের সাবেক অধ্যাপক আ ব ম আঃ মালেক বলেন, জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে সুন্দরবনের অপরাধ কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব।
সুন্দরবন খুলনা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক ও রেঞ্জ কর্মকর্তা মোঃ শরিফুল ইসলাম বলেন, স্মার্ট টহল টিম ও বিশেষ টহল টিম মোতায়ন, ফুট প্রেট্রোলিং করে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, অপরাধ উদঘাটন করতে গিয়ে জেলেদের আগ্রাসী আচরণ লক্ষ করা যাচ্ছে যা বন অপরাধ দমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সুন্দরবনের হরিণ শিকার ও বিষ দিয়ে মাছ শিকার বন্ধ করতে প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন। জনবল সংকট ও আধুনিক জলযানের অভাবে বিশাল এই সম্পদ পাহারা দিতে এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে বনকর্মীদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। সেই সাথে বন নির্ভর জনগোষ্ঠীর বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় বনের উপর চাপ কমছে না। ফলে বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দিন রাত টহল কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে।
সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ( ডিএফও) এজেডএম হাছানুর রহমান বলেন, বনরক্ষীরা চরম ঝুঁকি ও কষ্ট মাথায় নিয়ে দুর্গম বনে পায়ে হেঁটে, নদীতে নৌযান চালিয়ে নিয়মিত টহল দেওয়ায় বন অপরাধ অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। এ ছাড়া ফুট পেট্রোলিং, ড্রোন উড়িয়ে অপরাধি সনাক্ত, সচেতনতামূলক কার্যক্রমে বন অপরাধে সফলতা এসেছে।
তবে পরিবেশবাদীদের মতে, শুধু অভিযান চালিয়ে বন রক্ষা সম্ভব নয়। বননির্ভর মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় জনগণকে বন সংরক্ষণে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে বনজ সম্পদ পাচারকারী চক্রের মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
মন্তব্য করুন