
সুলতান শাহাজান, শ্যামনগর: ‘আগে পূজার সময় পদ্মফুল সংগ্রহ করতে খুব বেশি দূরে যেতে হতো না। এলাকার বিল, পুকুর ও জলাশয়েই পাওয়া যেত। এখন সেসব জায়গায় পদ্মফুল দেখা যায় না। দূর থেকে ফুল কিনে আনতে হয়, অনেক সময় চাহিদামতো পাওয়াও যায় না। মায়ের (দেবী) পূজায় যে ফুল ছাড়া চলে না, সেটির জন্য এভাবে হন্যে হয়ে ঘুরতে হবে, কখনো ভাবিনি।’
কথাগুলো বলছিলেন সাতক্ষীরার শ্যামনগরের ঈশ্বরীপুর যশোরেশ্বরী কালী মন্দিরের পূজারী দিলীপ চক্রবর্তী। কণ্ঠে হতাশা।
শুক্রবার থেকে শুরু হয়েছে দুর্গাপূজা। উৎসবের আমেজ যখন উপকূলজুড়ে, তখন পদ্ম জোগাড়ের চিন্তায় বিভোর পূজারী ও আয়োজকরা।
তাঁর ভাষায়, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শুধু প্রকৃতি বা মানুষের জীবিকা নয়, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণও হারিয়ে যেতে বসেছে।
সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকায় একসময় বর্ষা মৌসুমে বিভিন্ন বিল, পুকুর ও জলাশয়ে প্রচুর পদ্ম ফুটতো। দুর্গাপূজার সময় স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ সেসব জলাশয় থেকেই পদ্ম সংগ্রহ করতেন। এখন উপকূলের অনেক এলাকায় পদ্ম ফুলের দেখা মেলে না। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততার বিস্তার ও জলাশয়ের পরিবেশ বদলে যাওয়ায় পদ্মের স্বাভাবিক বিস্তার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
দিলীপ চক্রবর্তী বলেন, ‘পদ্ম আমাদের কাছে শুধু একটি ফুল নয়। পূজার বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানে এর প্রয়োজন হয়। আগে স্থানীয়ভাবেই পাওয়া যেত বলে বিষয়টি নিয়ে কখনো চিন্তা করতে হয়নি। এখন পদ্মের জন্য অন্য এলাকার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘একসময় বর্ষাকালে গ্রামের জলাশয়ে তাকালেই পদ্ম দেখা যেত। এখন অনেক জলাশয়ে পানি থাকলেও পদ্ম নেই। পরিবেশের এই পরিবর্তন আমাদের ধর্মীয় আচারেও প্রভাব ফেলছে।’
দুর্গাপূজার নানা আচারে ফুলের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে পদ্ম ফুলের বিশেষ ধর্মীয় তাৎপর্য আছে। পূজামণ্ডপে সন্ধিপূজায় ১০৮টি পদ্ম নিবেদনের প্রচলন রয়েছে। পদ্ম পবিত্রতা ও সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হয়।
শ্যামনগরের আরেক পূজারী খগেণ চক্রবর্তী বলেন, ‘একটি ধর্মীয় আচার পালনের জন্য প্রয়োজনীয় ফুল যদি নিজের এলাকার প্রকৃতি থেকে আর পাওয়া না যায়, তাহলে বিষয়টি ভাবনার। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম হয়তো বই বা ছবি দেখে জানবে যে এ এলাকায় একসময় প্রচুর পদ্ম ফুটত।’
সংকটের গভীরতা বোঝাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম হয়তো দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাবে।’ তাঁর আশঙ্কা, একসময় এ এলাকায় আর কেউ পদ্মফুল দিয়ে পূজা করতে পারবেন না। পদ্মের জায়গায় হয়তো অন্য কোনো ফুলই হয়ে উঠবে এ অঞ্চলের পূজার অনুষঙ্গ।
খগেণ চক্রবর্তীর মতে, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু ঘরবাড়ি, কৃষিজমি বা মানুষের জীবিকায় সীমাবদ্ধ নেই। আমাদের সংস্কৃতি ও ধর্মীয় জীবনেও এর প্রভাব পড়ছে।’
সংকট এতটাই প্রকট যে কোনো কোনো মণ্ডপকে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে সীমান্তের ওপার থেকে ফুল আনতে হচ্ছে। মানিকখালী সার্বজনীন পূজা মণ্ডপের আয়োজক কমিটির সদস্য প্রসেনজিৎ কুমার মণ্ডল বলেন, ‘গত বছর আমাদের পূজায় ব্যবহারের জন্য ভারত থেকে পদ্মফুল সংগ্রহ করতে হয়েছিল। এ বছরও পদ্মফুলের জন্য দেশের বিভিন্ন এলাকায় খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে বা দেশের অন্য কোথাও পর্যাপ্ত পদ্মফুল পাওয়া না গেলে এবারও ভারত থেকে পদ্মফুল এনে পূজার আয়োজন করতে প্রস্তুতিও নেয়া রয়েছে। কয়েক বছর আগেও আমাদের এলাকায় সহজেই পদ্মফুল পাওয়া যেত। এখন সেই পরিস্থিতি আর নেই।’
প্রসেনজিৎ কুমার মণ্ডলের দাবি, ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার পর থেকে তাঁদের এলাকার জলাশায়গুলোতে পদ্মফুল আর দেখা যাচ্ছে না।
সংকট শুধু একটি মণ্ডপের নয়। জেলেখালি, শ্যামনগর পৌর সদরের কাঁচড়াহাটি, নকিপুর হরিসভা মন্দির, নকিপুর ব্রাহ্মণপাড়া মন্দিরসহ উপজেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে গিয়ে আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলেও সংকটের একই চিত্র পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ হিন্দু পরিষদ শ্যামনগর উপজেলার সদস্যসচিব উৎপল মণ্ডল জানান, আগে এলাকার মানুষ নিজেরাই বিভিন্ন ফুল সংগ্রহ করতেন, এখন অনেক ফুল বাজার থেকে কিনতে হয়। পদ্মের সমস্যা আরও বেশি। তিনি বলেন, ‘স্থানীয়ভাবে না পাওয়ায় দূর থেকে সংগ্রহ করতে হয়। এতে খরচও বাড়ে, আবার সব সময় প্রয়োজনীয় ফুল পাওয়া যায় না।’
পদ্মকে ধর্মীয় অনুষঙ্গ হিসেবে টিকিয়ে রাখতে জনসচেতনতা ও স্থানীয় উদ্যোগের ওপর জোর দিয়েছেন উৎপল মণ্ডল। তাঁর মতে, এ ক্ষেত্রে হিন্দু সম্প্রদায়ের সব সংগঠনকে উদ্যোগী হয়ে এগিয়ে আসা প্রয়োজন।
শ্যামনগর দেশের সবচেয়ে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় এলাকাগুলোর একটি। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও নদীভাঙনের পাশাপাশি এ অঞ্চলের অন্যতম বড় সমস্যা লবণাক্ততা। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সময় লবণাক্ত পানি লোকালয়ে ঢুকে অনেক জলাশয়ের পানির বৈশিষ্ট্য বদলে দিয়েছে। এতে মিঠাপানির উদ্ভিদ ও জলজ জীববৈচিত্র্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
পদ্ম জলজ উদ্ভিদ, মিঠাপানির জলাশয়ে এর বিস্তার বেশি। পানির গুণগত পরিবর্তন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও উপযোগী আবাসস্থল কমে যাওয়ায় এর বিস্তার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে স্থানীয়রা মনে করেন।
শ্যামনগরের কাঁচড়াহাটি এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা নিতাই মণ্ডল বলেন, ‘ছোটবেলায় বর্ষা এলেই গ্রামের অনেক পুকুর ও বিলে পদ্ম ফুটতে দেখেছি। পূজার সময় বাড়ির লোকজন নিজেরাই পদ্ম তুলে আনত। এখন সেই দৃশ্য আর দেখা যায় না। আগের মতো মিষ্টি পানির অনেক জলাশয় নেই। এজন্য পদ্ম ফুলও আর নেই।’
এ বিষয়ে শ্যামনগর মহসিন ডিগ্রি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. প্রতাপ কুমার রায় বলেন, ‘উপকূলীয় এলাকায় জলাশয়ের প্রকৃতি ও পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে জলজ উদ্ভিদের বিস্তারেরও সম্পর্ক রয়েছে। লবণাক্ততা বৃদ্ধি, জলাশয় ভরাট ও দখল, পানির স্বাভাবিক প্রবাহের পরিবর্তন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পদ্মের মতো জলজ উদ্ভিদের উপযোগী আবাসস্থল কমে যেতে পারে। এর ফলে কোনো এলাকায় পদ্মের বিস্তার ধীরে ধীরে কমে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়।’
প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি এ সংকটের পেছনে মানুষের কর্মকাণ্ডও দায়ী বলে মনে করেন এই শিক্ষক। তাঁর ভাষ্য, অপরিকল্পিতভাবে লোনা পানিতে মাছ চাষ এবং জমিতে অতিমাত্রায় কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মিঠাপানির জলাশয়ের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। এ ছাড়া মিঠাপানির অনেক আধার প্রভাবশালীদের দখলে চলে গেছে, আর সেসব জলাশয়ে জলজ উদ্ভিদ ধ্বংস করা হচ্ছে।
ড. প্রতাপ কুমার রায় বলেন, ‘শুধু ধর্মীয় আচার নয়, পদ্মের মতো দেশীয় জলজ উদ্ভিদের অস্তিত্ব রক্ষায় প্রাকৃতিক জলাশয় সংরক্ষণ এবং স্থানীয়ভাবে এর আবাসস্থল পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।’
পদ্মের এই সংকট উপকূলে জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমুখী প্রভাবের একটি অংশ মাত্র।
উপকূলবাসী জানান, তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় খাল-বিল শুকিয়ে যাচ্ছে, ধ্বংস হচ্ছে জীবিকার উৎস। লবণাক্ততার আগ্রাসনে খাবারের সংকটে গরু-ছাগল-মহিষ পালনও কমে আসছে। পেশা হারিয়ে এলাকার মানুষ শহরমুখী হচ্ছেন। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত নানা অনুষঙ্গের হারিয়ে যাওয়া।
উপকূলবাসীর অভিযোগ, এত কিছুর পরও সংশ্লিষ্ট কারও কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই।
পরিবেশবিদদের মতে, একটি জলজ উদ্ভিদ কমে যাওয়াকে শুধু একটি ফুলের সংকট হিসেবে দেখলে বিষয়টির ব্যাপ্তি বোঝা যাবে না। জলাশয়ের পরিবেশ বদলালে অন্যান্য জলজ উদ্ভিদ, মাছ, পোকামাকড় ও জলচর প্রাণীর ওপরও প্রভাব পড়ে।
এ প্রসঙ্গে লেখক গবেষক ও পরিবেশকর্মী পীযূষ বাউলিয়া পিন্টু মনে করেন, পদ্ম হারিয়ে যাওয়াকে শুধু একটি ফুলের সংকট হিসেবে দেখলে বিষয়টির ব্যাপ্তি বোঝা যাবে না। তাঁর মতে, জলবায়ু পরিবর্তনে উপকূলে মিঠাপানির জলাশয়ের ওপর চাপ বাড়ছে। লবণাক্ত পানি ঢোকা ছাড়াও জলাশয় ভরাট, মাছের ঘের সম্প্রসারণ ও জলাভূমির ব্যবহার বদলে যাওয়া স্থানীয় জলজ উদ্ভিদের জন্য প্রতিকূল পরিবেশ তৈরি করছে।
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে আলোচনায় সাধারণত কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা, জীবিকা, স্বাস্থ্য বা বসতভিটা হারানোর কথা আসে। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনে এর প্রভাব তুলনামূলক কম আলোচিত। দুর্যোগে শুধু অবকাঠামো বা ধনসম্পদ নয়, হারিয়ে যায় লোকায়ত জ্ঞান, গান, রীতি, কৃত্য, বিশ্বাস ও প্রথা, এমনকি বিরল প্রাণসম্পদও। পিন্টুর প্রশ্ন, ‘মানুষ কি এমন জ্ঞানসম্পদ ছাড়া বাঁচতে পারে?’ তাঁর মতে, জলবায়ু-দেনদরবারে এই নন-ইকোনমিক লস অ্যান্ড ড্যামেজকে পূর্ণ স্বীকৃতিসহ যুক্ত করা জরুরি।
পদ্মের মতো স্থানীয় জলজ উদ্ভিদ টিকিয়ে রাখতে মিঠাপানির জলাশয়কে লবণাক্ততা থেকে রক্ষা, জলাশয় ভরাট বন্ধ, প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ বজায় রাখা এবং স্থানীয় প্রজাতি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছেন তিনি। কোথায় আগে পদ্ম পাওয়া যেত আর এখন কোথায় কমেছে, তার একটি স্থানীয় তালিকা করা যেতে পারে বলেও তিনি মনে করেন। পাশাপাশি পদ্মের বিস্তার কমার সঙ্গে লবণাক্ততা ও জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন বলে জানান তিনি।
উল্লেখ্য, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও প্রাকৃতিক জলাশয় কমে যাওয়ায় উপকূলীয় এলাকা থেকে হারিয়ে যেতে বসা পদ্ম কন্দজাতীয় জলজ উদ্ভিদ। পুরোনো পুকুর, বিল, হ্রদ, হাওর ও জলাভূমির কাদাময় মাটিতে জন্মে। মূল বা কন্দ থাকে জলের নিচে মাটিতে, পাতা ও ফুল ভাসে ওপরে। পানির উচ্চতা বাড়লে গাছও বাড়ে। পাতা বেশ বড়, পুরু ও গোলাকার। ফুল সাধারণত সাদা ও গোলাপি রঙের। বর্ষা ও শরতে ফোটে। শরতেই বেশি ফোটে, থাকে হেমন্ত পর্যন্ত।
মন্তব্য করুন