
ডেস্ক রিপোর্ট: চারিদিকে অগণিত জলরাশি থাকলেও পানের উপযোগী এক ফোঁটা পানির জন্য হাহাকার—উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরার সুন্দরবনসংলগ্ন শ্যামনগর উপজেলার নিত্যদিনের বাস্তবতা এটি।
দীর্ঘকাল ধরে মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ত পানি পান করার ফলে এই অঞ্চলের অধিবাসীরা পেটের পীড়া, চর্মরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনি জটিলতার মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ভােগেন।
মাইলের পর মাইল হেঁটে সুপেয় পানি বয়ে আনতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হতো স্থানীয় নারী ও কোমলমতি শিশুদের।
বিশেষ করে ২০০৭ সালের সিডর এবং ২০০৯ সালের প্রলয়ঙ্করী আইলার পর থেকে এলাকার মাটি ও ভূগর্ভস্থ পানি পানের একবারেই অযোগ্য হয়ে পড়ে।
এমনই পরিস্থিতিতে উপকূলীয় মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান আবুল খায়ের গ্রুপের অর্থায়নে শ্যামনগরের খাগড়াঘাট ও কৈখালী গ্রামে স্থাপন করা হয়েছে দুটি আধুনিক রিভার্স অসমোসিস (RO) পানি শোধনাগার।
শনিবার দুপুরে শ্যামনগরের খাগড়াঘাট ও কৈখালী এলাকায় উপস্থিত থেকে নবনির্মিত এই সুপেয় পানি প্ল্যান্ট দুটির উদ্বোধন করেন আবুল খায়ের গ্রুপের সিইও শাবাব আহমেদ।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে শাবাব আহমেদ
বলেন, উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর সুপেয় পানির সংকট ও মানবিক বিপর্যয় তাদের গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল। ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর লক্ষ্যেই তারা এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। করোনা মহামারীর সময় বিনামূল্যে অক্সিজেন সরবরাহের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তীব্র সংকটে পড়া উপকূলীয় এই জনপদে মানুষকে স্বাস্থ্যকর জীবন উপহার দিতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন আবুল খায়ের গ্রুপের সিআর প্রধান ফেরদৌস ফয়সাল, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বারসিক-এর আঞ্চলিক সমন্বয়কারী শাহিন ইসলাম, শ্যামনগর উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি সামিউল আজম মনির, স্থানীয় সমাজসেবক মহিউদ্দীন সরদার, তাজ উদ্দীন আহমেদ এবং সুপেয় পানি প্রকল্পের সভাপতি জমিদাতা নূর উদ্দীন সরদার।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন যুব সংগঠন ‘শরুব ইয়ুথ টিম’এর সভাপতি জান্নাতুন নাইম।
বাস্তবায়িত এই প্রকল্পে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির পাশাপাশি যুক্ত করা হয়েছে অত্যন্ত আধুনিক ও অপচয়হীন স্মার্ট ব্যবস্থাপনা। ঢাকা ওয়াসার স্মার্ট প্রযুক্তির মতো প্রতিটি গ্রাহককে দেয়া হয়েছে বিশেষ ডিজিটাল কার্ড, যা পাম্পের সামনে স্পর্শ করলেই পানি পড়ে এবং সরিয়ে নিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায়। অসচ্ছল মানুষের সাধ্যের কথা বিবেচনা করে ব্যবস্থাটি সম্পূর্ণ ক্যাশলেস রাখা হয়েছে এবং প্রতি লিটার পানির পরিচালন খরচ ধরা হয়েছে মাত্র ৫০ পয়সা, যা স্থানীয় বাজারের চেয়ে অনেক কম। পল্লী বিদ্যুতের চাপ ও লোডশেডিং থেকে মুক্ত থেকে নিরবচ্ছিন্ন সচলতা নিশ্চিতে প্রতিটি প্ল্যান্টে ১০টি করে সোলার প্যানেল বসানো হয়েছে।
পুরো প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে ‘খান ট্রেডার্স’ এবং স্থানীয় তরুণদের সামাজিক সংগঠন ‘শরুব ইয়ুথ ক্লাব’-এর সদস্যরা। যা স্থানীয়ভাবে তরুণদের কর্মসংস্থানেও নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।
নিজের জমি দান করে এই সংকট নিরসনে এগিয়ে আসা প্রকল্প সভাপতি নূর উদ্দীন সরদার জানান, লালচে আয়রন ও বিষাক্ত লোনা পানির বদলে এখন মানুষ তাদের ঘরের দুয়ারে নিরাপদ পানি পাচ্ছে। পানি সংগ্রহের দীর্ঘ দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেয়ে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন এলাকার সাধারণ মানুষও।
খাগড়াঘাটের রহিমা বেগম ও কৈখালীর আমেনা খাতুন আবেগে উচ্ছ্বসিত হয়ে জানান, আগে শুধু বছরের দু-তিন মাস বৃষ্টির পানি পাওয়া যেত এবং বাকি সময় বহুদূর হেঁটে লোনা পানি এনে পান করতে হতো। এখন থেকে কলের নলেই তাজা মিষ্টি পানি মেলায় জীবনমানের চরম পরিবর্তন ঘটবে।
মন্তব্য করুন